বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে একদিন

তামাবিল সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ডাউকিতে যখন পা রাখলাম আমি আর মা, ঘড়িতে বাংলাদেশ সময় তখন দুপুর ১২টা বাজে। আগে থেকে পরিচিত ড্রাইভার বাপ্পিদাকে বলা ছিল, তাই ঠিক সময়েই উপস্থিত ছিলেন তিনি। কাস্টমসের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় একটা। আজ অনেক মানুষ যাচ্ছে ভ্রমণে, তাই এত সময় লাগল। শিলং শহরে পৌঁছাতে আরও দুই–আড়াই ঘণ্টা লেগে যাবে।

default-image

বাপ্পিদা জানতে চাইলেন, এখানেই দুপুরে খাবার খেয়ে যাব কি না। বাপ্পিদার প্রস্তাবটা মন্দ না। রাজি হয়ে গেলাম। পেট পূজা শেষ করে বাপ্পিদার গাড়িতে করে ডাউকি বাজার থেকে ৮২ কিলোমিটার দূরের শিলংয়ের পথে যখন রওনা হলাম, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে তখন। শুরুতে ঘণ্টাখানেক রাস্তা বেশ কিছুটা খারাপ। বাপ্পিদা জানালেন, শিলং থেকে ডাউকি বর্ডার পর্যন্ত চার লেনের রাস্তার কাজ চলছে। দক্ষ হাতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে নিচ্ছেন বাপ্পিদা।

বিজ্ঞাপন

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগল। দেখলাম, মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়েছি আমরা। বৃষ্টির ধারা বেড়ে গেল। একরাশ মেঘ এসে পুরো ঢেকে দিয়েছে আমাদের। এক হাত দূরের জিনিসও তখন দেখা যাচ্ছে না। এভাবে বেশ খানিকটা পথ চলার পর মেঘ কেটে গেল, বৃষ্টিও থেমে গেল। পথের দুধারের পাহাড়ি উপত্যকা আর ঝরনার অবর্ণনীয় সৌন্দর্য দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম।

default-image

পাহাড়িকন্যার রূপ দেখতে দেখতে চলে এলাম শিলং শহরে। ঘড়ির কাঁটায় তখন পাঁচটা। পুলিশ বাজারে পৌঁছে উঠে পড়লাম হোটেলে। সেদিনের মতো বাপ্পিদাকে ছেড়ে দিলাম। কাল সকালবেলায় বের হয়ে পড়ব গুয়াহাটির পথে। শিলং শহরে রাত আটটা হতেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়, তাই রাতে হোটেলেই খাওয়াদাওয়ার কাজ শেষ করে নিদ্রা দেবীর কোলে ঢলে পড়লাম।

default-image

সকাল সাড়ে সাতটা হবে; বাপ্পিদার ফোনে ঘুম ভাঙল আমাদের। সকাল সকাল বের হতে হবে। কারণ, শিলং শহর থেকে গুয়াহাটি যেতে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। যাহোক, দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম, পথে সকালের নাশতা সেরে নেব ঠিক করলাম। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম আমরা। পথিমধ্যে নাশতা হলো। শিলং থেকে গুয়াহাটির এ প্রচণ্ড ব্যস্ত রাস্তাতেও দেখলাম চার লেনের কাজ চলছে। আস্তে আস্তে শিলংয়ের ঠান্ডা থেকে আসামের গরমের মধ্যে ঢুকলাম। নগরজীবনের ব্যস্ততার ছোঁয়া দেখলাম পথে–প্রান্তরে। শিলং শহরে তেমনটা চোখে পড়েনি।

আমরা সাতসকালে যাচ্ছি গুয়াহাটি শহরে, এক হিন্দু মুনি, যার নাম বশিষ্ঠ মুনি, তাঁর আশ্রমে। বলে রাখা ভালো, বশিষ্ঠ মুনি সপ্তর্ষি হিসেবে পরিচিত। তিনি ‘ঋগ্‌বেদে’র সপ্তম মণ্ডলের ও অন্যান্য বেদের ঋষি। বশিষ্ঠ মুনি স্ত্রীর নাম অরুন্ধতী। এ ছাড়া বশিষ্ঠ অক্ষমালা নামক শূদ্রকন্যার প্রতি আসক্ত হয়ে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। বশিষ্ঠের সংস্পর্শে এসে তিনি পরম গুণবতী নারী রূপ লাভ করেছিলেন। এই ঋষির নামে উত্তর-পূর্ব আকাশে একটি তারা আছে। এ সবই পুরাণের কথা।

default-image

আবার অন্য মতে, কোনো এক যজ্ঞকালে, অপ্সরা উর্বশীকে দেখে যজ্ঞ কুম্ভে আদিত্য ও বরুণের বীর্যপাত হয়। ফলে যজ্ঞ কুম্ভ থেকে বশিষ্ঠ ও অগস্ত্যের জন্ম হয়। বশিষ্ঠ মুনি ছিলেন আদিত্য, অর্থাৎ সূর্যের পুত্র এবং অগস্ত্য মুনি ছিলেন বরুণের পুত্র। সে হিসেবে উভয়কেই মিত্র (তেজময় সূর্য) ও বরুণের পুত্র বলা হয়।

বশিষ্ঠ আশ্রম গুয়াহাটি শহরের ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে সন্ধ্যা চল পাহাড়ে ছবির মতো আধুনিক স্থাপত্যসংবলিত একটি প্রাচীন আশ্রম। এখানে মুনির পায়ের ছাপ সংরক্ষিত রয়েছে এবং মূর্তিও তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যা, ললিতা আর কান্তা নামের তিনটি পাহাড়ি নদী বয়ে চলেছে আশ্রমের সবুজ ক্ষেত্রকে অতিক্রম করে। মিলেছে এরা আশ্রমের কাছেই—মিলিত ধারার নাম বশিষ্ঠ গঙ্গা। আশ্রম শিবমন্দির আর পথেই পড়ে গুরুদ্বার ও রাধাকৃষ্ণ মন্দির।

বিজ্ঞাপন

হিন্দুধর্মের মানুষ ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও আসেন বশিষ্ঠ মুনির আশ্রম। গুয়াহাটির কিংবদন্তি ও ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। যদিও নগরীটির উৎপত্তির সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি, তবে মহাকাব্য, পুরাণ এবং অন্যান্য পরম্পরাগত ইতিহাসে উল্লেখ করা কাহিনিগুলো থেকে এটাকে এশিয়ার একটি অন্যতম পুরোনো নগর হিসেবে অনুমান করা হয়।

default-image

ইতিহাস মতে, গুয়াহাটিতে কয়েকটি প্রাচীন রাজ্যের রাজধানী ছিল। ‘মহাভারত’ মতে, এটি নরকাসুর ও ভগ দত্ত রাজ্যের রাজধানী ছিল। অতীতে এই শহরের নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষপুর। শৈব, বৈষ্ণব, তন্ত্র, বৌদ্ধ, ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের সমন্বয় ঘটেছে এই সাংস্কৃতিক শহরে। শহরের প্রাণকেন্দ্র নেহরু পার্ককে কেন্দ্র করে শহরের বিস্তার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা চলে এলাম পল্টন বাজারে। রাস্তায় কাজ হচ্ছিল বিধায় পৌঁছাতে একটু বেশি সময়ই লাগল আমাদের। ঘড়ির কাঁটায় তখন কলকাতা সময় প্রায় একটা।

default-image

বাপ্পিদা বললেন, পল্টন বাজার থেকে লোকাল বাস সরাসরি বশিষ্ঠ মন্দির পর্যন্ত যাওয়া–আসা করে। রাস্তায় যেতে যেতে দুই পাশের পরিবেশ পরিস্থিতি দেখতে দেখতে কখন যে বশিষ্ঠাশ্রম পর্যন্ত চলে এসেছি, বুঝতেই পারেনি। গাড়ি থেকে নেমেই আমরা নগ্ন পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। আশ্রমে ঢুকতেই প্রথমে আমাদের অভিনন্দন জানাল বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে থাকা একদল বানর। কিছু সময় পরপর সারা আশ্রমে দৌড়ঝাঁপ করে বেড়ায় আশ্রমে থাকা বানরের দল। আমরা এগিয়ে গেলাম মন্দির পানে—আমাদের মতো শত শত মানুষ সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে চলছেন সেদিকেই।

মন্দিরে ঢুকে শেষ প্রান্তে এর নিচের দিকে নামার সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখা পেলাম বশিষ্ঠ মুনির ধ্যানকক্ষ। যে ঘরটিতে বশিষ্ঠ মুনি ধ্যান করতেন, সে ঘরটি সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন। একজন পুরোহিত ব্রাহ্মণ ওখানে পূজা দিচ্ছেন। এখানে পূজা দিয়ে এগিয়ে গেলাম আশ্রমের ঠিক পেছনের দিকে। শোঁ শোঁ শব্দ করে পাহাড় থেকে বয়ে আসা নদীর জল বয়ে চলছে। অসাধারণ তার রূপ। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। বাপ্পিদা বললেন, যত দর্শনার্থী বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে ঘুরতে আসেন, তাঁরা সবাই এই ঝরনার জলে স্নান করেন। বলা হয়ে থাকে এই জল স্পর্শ করলে এবং মাথায় ছোঁয়ালে মনের কালিমা দূর হয়।

default-image

আমরা এগিয়ে গেলাম জলধারার দিকে। চারপাশে আগরবাতির গন্ধে এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমি এগিয়ে গিয়ে স্রোতস্বিনী জলধারা স্পর্শ করলাম। মনের ভেতর এক অন্য রকম অনুভূতি তৈরি হলো। মা প্রদীপ আর আগরবাতি জ্বালিয়ে পূজা দিলেন। দেখতে পেলাম মন্দিরে আগত ভক্তরা মন্দিরের বাসিন্দা বানর পরিবারদের জন্য মন্দিরের সামনে অবস্থিত দোকান থেকে বাদাম, বিস্কুট কিনে এনে তাদের খেতে দিচ্ছে। মা–ও বানর পরিবারদের জন্য বাদাম আর বিস্কুট কিনে আনতে বললেন। আমি দোকান থেকে বাদাম আর বিস্কুট কিনলাম। আমার আসা দেখেই বানর পরিবারের সদস্যরা আমার পেছন পেছন আসতে লাগল। এর মধ্যে বানর দল এক–দুইবার খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করল। যাহোক, শেষ পর্যন্ত মায়ের হাতে এনে দিলাম বাদাম আর বিস্কুট। মা বানরগুলোকে খাবার দিলেন।

default-image

এদিকে ঘড়ির কাঁটায় তিনটা বাজতে চলল। পেটে চলছে রাম–রাবণের যুদ্ধ। সেই সকালে পেটে দানাপানি পড়েছে তারপর আর কিছুই পেটে পড়েনি। মনে মনে ভাবছিলাম, যদি একটু অন্ন–প্রসাদ (প্রসাদ বলতে ভগবান/সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্যসামগ্রী) মিলত, তাহলে মন্দ হতো না। আসার সময় মন্দিরের আশপাশে কোনো খাবারের দোকান চোখে পড়েনি। পেট পূজা করতে আবার সেই পল্টন বাজার যেতে হবে।

সৃষ্টিকর্তা মনে হয় আমার মনের কথা শুনলেন। বশিষ্ঠ মন্দিরের একজন পূজারি এসে আমাদের ভোগের প্রসাদ নিতে বললেন। বলতেই রাজি হয়ে গেলাম। আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো পাশের একটি ঘরে, সেখানে কলাপাতায় পরিবেশন করা হলো গরম গরম খিচুড়ি, আলুর দম আর পায়েস। প্রসাদ মুখে দেওয়ার পর অমৃত স্বাদ মনে হচ্ছিল। এদিকে আমাদের পেট পূজা শেষ হতেই বাপ্পিদা তাড়া দেওয়া শুরু করলেন।

default-image

এবার রওনা দিতে হবে, তা না হলে শিলং পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে—পথের কথা তো বলা যায় না। মনে মনে ভাবছিলাম, আরও কিছুটা সময় যদি থাকতে পারতাম। যদি সন্ধ্যা আরতিটা দেখে যেতে পারতাম! মনের ভেতর আক্ষেপ নিয়েই বিদায় নিতে হলো আমাদের। আমরা ফিরে চললাম শিলং শহরের দিকে। বশিষ্ঠাশ্রমের চারপাশে ঘন জঙ্গল আর আশ্রমের নিচের দিকে বাস ও অটোর স্ট্যান্ড। এক প্রান্তে ফুল, বেলপাতা এবং পূজাসামগ্রীর পসরা নিয়ে বসেন দোকানিরা। আপনি চাইলে ওখান থেকে ফুল, বেলপাতা বা আপনার পূজার যে সামগ্রীগুলো দরকার, সেগুলো নিয়ে পূজা দিতে পারেন।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে গুয়াহাটি বিভিন্নভাবে যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে কলকাতা, সেখান থেকে ট্রেন অথবা প্লেনে করে যেতে পারবেন গুয়াহাটি। তবে সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে, সিলেটের তামাবিল বর্ডার হয়ে শিলং থেকে গুয়াহাটি যাওয়া। গুয়াহাটি শহরে পল্টন বাজারে বাস, ট্যাক্সি পাওয়া যাবে বশিষ্ঠ মুনি আশ্রমে যাওয়ার জন্য। তবে এ ক্ষেত্রে পাসপোর্টে আপনাকে ডাউকি সীমান্ত উল্লেখ করে দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0