default-image
বিজ্ঞাপন

সুন্দরবনের মধু! সেরা মধুর কথা বলতে গেলে সুন্দরবনের মধু প্রথমেই থাকবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। প্রতিবার সুন্দরবন গেলে ফেরার সময় বাসার জন্য সুন্দরবনের খাঁটি মধু নিয়ে আসা যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুবার সুন্দরবনে যাওয়া হলেও তা ছিল মূলত সুন্দরবনের প্রকৃতি ও বন্য জীবন দেখা। তাই এবার ঠিক করলাম, সুন্দরবনের মধু কীভাবে সংগ্রহ করা হয়, সেটা দেখতে যেতে হবে।

সুন্দরবনে এপ্রিল-জুন পর্যন্ত সাধারণত মধু সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সুন্দরবনের কাছের গ্রামের মৌয়ালেরা এ সময়ে মধু সংগ্রহ করতে বনে ঢুকে থাকেন। আমরা ঠিক করলাম, যেদিন মধু সংগ্রহ শুরু হবে, সেদিনই আমরা মৌয়ালদের সঙ্গে বনে ঢুকব।

আমাদের যাত্রা শুরু হয় গত ৩০ মার্চ সকালে। সকাল ১০টার ফ্লাইটে আমরা ঢাকা থেকে যশোর পৌঁছাই। এরপর যশোর থেকে বাসে করে খুলনায়। খুলনার জেলখানা ঘাটে আমাদের জন্য ট্রলার অপেক্ষা করছিল। ট্রলারে করে আমরা পৌঁছাই আগামী কয়েক দিনের জন্য আমাদের আবাস এমভি বাওয়ালিতে। সুন্দরবনে যেসব পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করে, তার মধ্যে এমভি বাওয়ালি অন্যতম।

default-image

দুপুরের খাবার শেষে আমাদের যাত্রা শুরু হয় সাতক্ষীরা জেলার বুড়িগোয়ালিনীর উদ্দেশে। রূপসা, পশুর, চুনকুড়ি নদী পার হয়ে আমরা যখন শিবসা নদীতে পৌঁছাই, তখন রাত প্রায় ১০টা। রাতে সেখানেই নোঙর করে পরদিন ভোরে আবার বুড়িগোয়ালিনীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। পথে ভাটার কারণে সাতক্ষীরা জেলার গাবুড়া ইউনিয়নে আমাদের জাহাজ আটকে যাওয়ায় আমরা পাশের একটি জেলেপল্লি ঘুরে দেখি। লবণাক্ততার কারণে গ্রামটিতে খাওয়ার পানির তীব্র সংকট। শুষ্ক মৌসুমে তাদের বহুদূর থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়।

বিজ্ঞাপন

জোয়ারে পানি বাড়তে শুরু করলে আমরা আবার যাত্রা শুরু করে দুপুর ১২টায় বুড়িগোয়ালিনী পৌঁছাই। বিকেলে আমরা মৌয়ালদের গ্রামে যাই মধু সংগ্রহের প্রস্তুতি দেখতে। মৌয়ালেরা একবারে ১৫ দিনের জন্য জঙ্গলে প্রবেশ করে, তাই এ প্রবেশের আগের দিন তারা বেশ ব্যস্ত থাকে প্রস্তুতি নিয়ে। নৌকা মেরামত করে রং করা, ১৫ দিন জঙ্গলে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা—এসব নিয়ে চারদিকে বেশ ব্যস্ততা লক্ষ করা যায়।

default-image

আমরা যে মৌয়াল দলের সঙ্গে বনে ঢুকব, তাঁদের সঙ্গে দেখা করলাম। সন্ধ্যার আগে তাঁরা মিলাদের আয়োজন করলেন। মিলাদে মৌয়ালদের নিরাপদ যাত্রা ও সাফল্যের জন্য দোয়া করা হলো। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ বেশ কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’ এখানকার বাস্তবতা। প্রতিবছরই বাঘের আক্রমণে অনেক মৌয়াল প্রাণ হারান, এ ছাড়া বিষধর সাপের ভয় তো আছেই।

বাদাবনের কাদা, শ্বাসমূল আর ঝোপ পেড়িয়ে মধু সংগ্রহ করতে বহু বছরের অভিজ্ঞতা আর দক্ষতাই মৌয়ালদের একমাত্র ভরসা। তাই যাত্রার আগের দিন তাঁরা পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নেন, পাওনাদারদের পাওনা পরিশোধ করে দেন; এ যেন জেনেশুনে স্বেচ্ছায় নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। তবুও কিছু বাড়তি আয় করার আশায় জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর হাজার হাজার মৌয়াল পাড়ি জমান সুন্দরবনের গহিনে।

মৌয়ালদের প্রস্তুতি দেখে আমরা ফিরে এলাম জাহাজে। ১ এপ্রিল ভোর হতেই নৌকায় মৌয়ালেরা জড়ো হতে শুরু করেন বুড়িগোয়ালিনী সাতক্ষীরা রেঞ্জ ফরেস্ট অফিসের কাছের খালে। প্রতিটি ডিঙি নৌকায় সাত-আটজন করে মৌয়াল। তাঁদের একজন নেতা থাকেন, যাকে ‘বহরদার’ বলা হয়। আমরা সকাল ১০টার দিকে ফরেস্ট স্টেশনে যাই, সেখানে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের পাস দেওয়া হয়। এবার প্রায় ২০০টি নৌকা পাসের জন্য আবেদন করেছিল। পাস সংগ্রহের পরই মৌয়ালেরা বাইচ করে পাল্লা দিয়ে সুন্দরবনের দিকে এগোতে শুরু করেন। সবার আগে সব থেকে ভালো জায়গা খুঁজে বেশি মধু সংগ্রহ করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।

default-image

ফরেস্ট অফিস থেকে দুজন গার্ড নিয়ে আমরাও আমাদের মৌয়ালদের সঙ্গে রওনা দিলাম মধু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। খোলপটুয়া নদী ধরে এগিয়ে দুই ঘণ্টা যাত্রা করার পর ছোট কলাগাছিয়া নামের এক জায়গায় এসে আমাদের মৌয়ালেরা মৌচাক থাকার সম্ভাবনা বেশি, এমন একটা জায়গা পছন্দ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রস্তুত হয়ে গেলাম মধু সংগ্রহের জন্য। আমরা সবাই যতটা সম্ভব নিজেদের আবৃত করে নিলাম, যাতে মৌমাছির আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়।

পায়ে বুট পরে নিলাম কাদায় হাঁটার জন্য। যদিও মৌয়ালেরা এসবের বালাই করলেন না। তীব্র গরমে ফুলহাতা শার্ট–প্যান্ট আর জাল দিয়ে মুখ ঢেকে জঙ্গলে ঢোকার আগেই আমাদের বেশ করুন অবস্থা হয়ে গেল। জঙ্গলে নেমেই কাদায় পা দেবে গিয়ে আমাদের চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। মৌয়ালেরা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মৌচাক খুঁজতে খুঁজতে চলার সময় পটকা ফাটিয়ে ‘আল্লা আল্লা বলরে’সহ নানা ধরনের কথা বলে চিৎকার করছিলেন, যাতে বাঘ ভয় পেয়ে কাছে না আসে।

মৌচাকের খোঁজে এ যাত্রাকে মৌয়ালদের ভাষায় ‘ছাটা’ দেওয়া বলে। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মৌয়ালদের অনুসরণ করে হাঁটা বেশ কঠিন। কারণ, শ্বাসমূল, আঠালো কাদা, কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও বুকসমান পানি। এক হাতে ক্যামেরা উঁচিয়ে ধরে এর মধ্যেই এগিয়ে চলছিলাম। হঠাৎই জঙ্গলের ভেতর থেকে কিসের যেন হাঁটার শব্দ শুনতে পেলাম, কয়েক মুহূর্তের জন্য বাঘের ভয়ে থমকে গেলাম সবাই। এই বুঝি বাঘের পাল্লায় পড়লাম!

default-image

এই ঘন জঙ্গলে বাঘের সামনে পড়লে দৌড়ে পালানোর কোনো পথ নেই। তবে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম, আমাদের গার্ড সাহস করে এগিয়ে গিয়ে এক কাঁকড়াশিকারির দেখা পেলেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক এভাবে ঝোপ-জঙ্গল আর কাদা–পানি পেড়িয়ে হাঁটার পর মৌয়ালেরা একটি চাক খুঁজে পেলেন। তবে চাকটিতে মধু কম থাকায় সিদ্ধান্ত হলো আমরা এটা না কেটেই এগিয়ে যাব। এভাবে আর কিছুক্ষণ এগোতে থাকার পর জোয়ারের পানি বাড়তে শুরু করলে কিছু জায়গায় গলাসমান পানি হয়ে গেল। তাই আমরা আর সামনে না এগিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।

বিজ্ঞাপন

বিকেলে মৌয়ালেরা খবর দিলেন, তাঁরা আর দুটি চাক খুঁজে পেয়েছেন। ট্রলারে উঠে আমরা জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দিয়ে ট্রলারে বসেই নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনো সবার প্রস্তুতি নেওয়া শেষ হয়নি। এমন মুহূর্তে কোত্থেকে একঝাঁক মৌমাছি এসে আমাদের আক্রমণ করল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌমাছির হুলে নাজেহাল অবস্থা। আমাদের একজন গার্ড হুল ফোটানো থেকে বাঁচতে পানিতে লাফ দিলেও মৌমাছির হাত থেকে রক্ষা পাননি। ট্রলার চালু করে পালানোর চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছিল না, মৌমাছি তাড়া করছিল। পরে বহু কষ্টে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়াতে সক্ষম হলাম আমরা। ততক্ষণে আমাদের মাঝির ৫৬টি হুল ফুটে বেশ খারাপ অবস্থা। দু–তিনজন বাদে সবারই ছয়–সাতটি করে হুল ফুটেছিল, কারও আরও বেশি। এরপর ব্যর্থ হয়ে আমরা জাহাজে ফিরে এলাম। ঠিক হলো, পরদিন ভোর হতেই যতগুলো সম্ভব ছাটা দেওয়া হবে।

default-image

পরদিন ভোরে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের উদ্দেশে। কিন্তু ট্রলার থেকে নামতেই বিপত্তি! বেশ খানিকটা রাস্তা হাঁটুসমান কাদা। পা গেঁথে গিয়ে জুতা খুলে আসে, এতটাই আঠালো কাদা। বহু কষ্টে কাদা পার হয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ১৫ মিনিট হাঁটার পর আমরা মৌচাকের দেখা পেলাম। চাকের কাছে আসতেই মৌয়ালেরা আমাদের সতর্ক করে দিলেন, যাতে কেউ উচ্চ শব্দে কথা না বলি, তাতে মৌমাছির আক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

default-image

আমরা সবাই প্রস্তুত হয়ে গেলাম চাক কাটার জন্য। মৌয়ালেরা শুকনা পাতা জোগাড় করে একত্র করতে লাগলেন আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করার জন্য। একে তাঁরা ‘কারু’ বলে থাকেন। কারু তৈরি হয়ে গেলে তাতে আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে চাকের নিচে ধরতেই মৌমাছিরা সরতে শুরু করল। এ ফাঁকে একজন দ্রুত গাছে উঠে অল্প সময়েই চাক কেটে ফেললেন। কাটা টুকরাগুলো বাঁশ দিয়ে বিশেষভাবে বানানো একটি ঝুড়িতে রাখা হলো। এরপর দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে ট্রলারে ফিরে এলাম আমরা।

ট্রলারে বসে চাক থেকে তাজা মধু চেখে দেখলাম সবাই, এ যেন অমৃত! জাহাজে ফিরে আমরা আর ট্রলার থেকে নামলাম না, গরম-গরম খিচুড়ি আর ডিম দিয়ে ট্রলারে বসেই সকালের নাশতা খেলাম। নাশতা করার সময় পাশ দিয়ে জেলেনৌকা যেতে দেখে ডাক দেওয়া হলো। তাদের কাছ থেকে তাজা কাইন মাগুর আর অন্যান্য মাছ কিনলাম আমরা। একফাঁকে তাঁদের জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চাচা, শেষ কবে বাঘ দেখেছেন?’ উত্তর ছিল, ‘আজ সকালেই!’ কোন জায়গায় জিজ্ঞেস করে যে উত্তর পেলাম, তাতে খাবার গলায় আটকে যাওয়ার জোগাড়!

default-image

আমরা যেদিকে সকালে ছাটা দিয়ে এলাম, সেই জঙ্গলেই সকালে তাঁরা বাঘ দেখেছেন! মামা আমাদের সামনে পড়েনি ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম সবাই। খাবার শেষ করে মৌয়ালদের সঙ্গে আবারও বনে ঢুকলাম আমরা চাকের খোঁজে। বেলা ১১টা পর্যন্ত আরও চারটি চাক খুঁজে পেলাম, এর মধ্যে একটা বেশ বড় ছিল।

default-image

সেদিন ছিল শুক্রবার, মৌয়ালেরা বললেন, দুপুরে ছাটা দিতে তাঁদের গুরুজনদের নিষেধ আছে। তাই তাঁদের কথা মেনে আমরা জাহাজে ফেরত এলাম। এবারের মতো আমাদের মধু সংগ্রহ অভিযান সেখানেই সমাপ্ত করে আমরা ফিরতি পথ ধরলাম। তবে মৌয়ালেরা রয়ে গেলেন। তাঁরা আরও ১৩ দিন জঙ্গলে কাটিয়ে বাড়ি ফিরবেন। ফেরার পথে কলাগাছিয়া ফরেস্ট স্টেশনের ট্রেইলে নেমে জানতে পারলাম, করোনা মহামারির কারণে সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আমরাই শেষ দল, যারা বনে গিয়েছিলাম।

সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের এই অভিজ্ঞতা আসলে লিখে প্রকাশ করা কঠিন। প্রতি মুহূর্তে গা ছমছম করা অনুভূতি হয়, এই বুঝি বাঘ এল। প্রতিকূল দুর্গম বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা কিংবা মৌমাছির আক্রমণ, এ এক অন্য রকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন