default-image
বিজ্ঞাপন

হয়তোবা আমাদের দেশের খুব বেশি মানুষ ‘বুখারেস্ট’ শহরটির সঙ্গে পরিচিত নয়। প্যারিস, লন্ডন, রোম, মিলানের মতো নামকরা শহর থাকতে খুব বেশি মানুষ বুখারেস্টের কথা বলবেও না। কিন্তু আমার চোখে ভালো লাগা অন্যতম দেশটির নাম রোমানিয়া আর সবচেয়ে ভালো লাগা শহরটি সে দেশেরই রাজধানী বুখারেস্ট।

default-image

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, পশ্চিম ইউরোপের এই দেশগুলোতে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের রোমানিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে খুব বেশি মানুষ দেশটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করবেন না। কিন্তু রোমানিয়াতে ঘুরতে গিয়ে আমার হয়েছে উল্টো অভিজ্ঞতা।

নিকোলেই চশেস্কু নামটির সঙ্গে আমরা হয় তো অনেকে পরিচিত। ইতিহাসে তিনি একজন স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে নিন্দিত। কিন্তু রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টের অনেক মানুষ এখনো তাঁকে ভালোবাসেন। এর মধ্যে যেমন অনেক বয়স্ক লোক রয়েছেন, ঠিক তেমনি অনেক অল্প বয়সের লোকজনও রয়েছেন। বুখারেস্টে তাঁর জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হচ্ছে, এ শহরটিকে তিনি ঢেলে সাজিয়েছিলেন।

কোনো মানুষ যখন ইউরোপে বেড়াতে আসেন, তাঁর প্রথম স্বপ্ন থাকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু ইউরোপ মহাদেশের অন্তর্গত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন রোমানিয়ার মানুষ সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত যেসব রাষ্ট্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল, কার্যত সেসব অঞ্চলের মানুষদের জন্য পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। পুরো পৃথিবী একদিকে, আর এ অঞ্চলের মানুষ অন্যদিকে। গোটা পৃথিবী থেকে তাঁরা ছিলেন কার্যত বিচ্ছিন্ন। হয়তোবা এ দিকটি বিবেচনা করেই নিকোলেই চশেস্কু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনি রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টকে এ অঞ্চলের প্যারিস হিসেবে গড়ে তুলবেন।

যেই ভাবা আর সেই কাজ, প্যারিসে যাঁরা ঘুরতে গিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই ‘লে সো এলিজে’ জায়গাটির সঙ্গে পরিচিত। এ জায়গাটিকে অনেকে প্যারিসের সেন্টার বলে থাকেন, এ জায়গাটি মূলত একটি স্ট্রিট বা চত্বর ভূমি, যেখানে কারুকার্যময় বিভিন্ন বিল্ডিং আপনার চোখে পড়বে। বুখারেস্টের সেন্টারে প্রবেশ করতে গিয়েও আমার একই রকম অভিজ্ঞতা হলো—যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই দেখি সুন্দর সুন্দর এবং কারুকার্যময় বিভিন্ন বিল্ডিং। কোন বিল্ডিং রেখে কোন বিল্ডিংয়ের ছবি তুলব, সেটা ঠিক করতে পারাটা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, প্রত্যেকটি বিল্ডিং চোখ জুড়ানো একেকটি অপরূপ স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় আপনার চোখে ধরা দেবে বিভিন্ন ভাস্কর্য কিংবা শিল্পকলার নিদর্শন। সেখানে অনেক সড়কের নামও করা হয়েছে বিভিন্ন চিত্রশিল্পী অথবা বিখ্যাত অনেক কবি, সাহিত্যিক কিংবা লেখকদের নাম অনুসারে। এমনকি কিছু দূর হাঁটতে না হাঁটতে আপনার চোখে ধরা দেবে বিভিন্ন জাদুঘর অথবা থিয়েটার কিংবা পার্ক।

বিজ্ঞাপন

প্যারিসের মতো বুখারেস্টের রাস্তাঘাট অনেক চওড়া হওয়া সত্ত্বেও বুখারেস্টের ট্রাফিক জ্যাম এক শিহরণের নাম। মূলত বুখারেস্টের স্থানীয় প্রশাসন যানবাহনের ওপর অনেক ভর্তুকি দিয়ে থাকে এবং এ কারণে শহরের বেশির ভাগ জায়গাতেই সে অর্থে গাড়ি পার্কিং করতে তেমন খরচ হয় না। আর এ কারণে সবাই যে যার মতো পারে যেখানে–সেখানে গাড়ি পার্ক করে রাখে। এ জন্যই শহরটিতে যানজট সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে গাড়ির হর্নের শব্দ তো আছেই।

default-image

বুখারেস্ট শহরে যারা বেড়াতে আসেন, সবার প্রথম আকর্ষণ থাকে রোমানিয়ার জাতীয় পার্লামেন্ট। এ পার্লামেন্টটি এত বিশাল যে এর চারদিকে চক্কর দিলেই অনায়াসে আপনার দেড় থেকে দুই কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যাবে। বুখারেস্টে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের কাছে এ পার্লামেন্টটি গর্বের বস্তু। তবে যাঁরা বুখারেস্টের বাইরে থাকেন, তাঁদের অনেকে আবার এত বড় নির্মাণের জন্য আফসোস করেন। তাঁদের দাবি, এ পার্লামেন্ট নির্মাণ করতে গিয়ে চশেস্কুকে আশপাশের জায়গা থেকে জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছিল। এ পার্লামেন্ট নির্মাণের খরচ জোগাড় করতে গিয়ে রোমানিয়ার সাধারণ মানুষের ওপর তিনি নানা ধরনের বিপর্যয় ঠেলে দিয়েছিলেন। পুরো পার্লামেন্ট ভালোমতো ঘুরে দেখতে তিন দিনের মতো সময় লেগে যাবে, পার্লামেন্টের ভেতরে ‘চশেস্কুর হাউস’ নামে একটি জায়গা রয়েছে, যেখানে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে এ জায়গাটি সাজানো হয়েছে চশেস্কুর বিভিন্ন ছবি এবং তাঁর ব্যবহার করা জিনিস দিয়ে।

রোমানিয়ার পার্লামেন্ট ঘোরার পর চলে গেলাম কার্টুরেস্টি কারুসেলে। রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্ট কারুকার্যময় বিভিন্ন বইয়ের দোকানের জন্য বিখ্যাত এবং এদের মধ্যে কার্টুরেস্টি কারুসেল সবচেয়ে বিখ্যাত। সমগ্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকানের মধ্যে এ কার্টুরেস্টি কারুসেল অন্যতম। এখানে ঢোকার পর আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। প্রতিদিন এখানে অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়, কেউ আসেন বই পড়তে, আবার কেউ আসেন শুধু কার্টুরেস্টি কারুসেলের চোখধাঁধানো স্থাপত্যকলার সাক্ষী হতে। কার্টুরেস্টি কারুসেলে কাজ করা এক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম যে এখানে নাকি কেবল বই আছে দশ হাজারের ওপরে এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো বিভিন্ন ডিভিডি কিংবা আলবামের সংগ্রহ রয়েছে।

default-image

বুখারেস্টের মেট্রো সার্ভিসও চশেস্কুর অবদান এবং আমার দেখামতে, ইউরোপের মধ্যে বুখারেস্টে সবচেয়ে সস্তায় আপনি মেট্রোতে ভ্রমণ করতে পারবেন। টিকিটের দাম মাত্র আড়াই লিঁও, যা আমাদের দেশে পঞ্চাশ টাকার সমতুল্য। রোমানিয়াতে ধাতব মুদ্রার তুলনায় নোটের ব্যবহার বেশি; তবে কাগজের পরিবর্তে রোমানিয়ান লিঁওর বেশির ভাগ নোট পলিমার দিয়ে তৈরি করা হয়। প্রতিটি নোট যেন আলাদাভাবে একেকটি শিল্প, এত সুন্দর নোট আমি এর আগে কখনো ব্যবহার করিনি।

default-image

বুখারেস্টের সিটি সেন্টারটি খুবই গোছালো। যে সারিতে খাবারের দোকান, সে সারিতে কেবল খাবারের দোকান ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়বে না। আবার যে সারিতে বাণিজ্যিক ভবন, সে সারিতে আপনি সেটা ছাড়া অন্য কোনো কিছু খুঁজে পাবেন না। ফরাসিদের মতো রোমানিয়ানরা চিত্রকলা ও শিল্প-সাহিত্যের সমঝদার। কাচ ও সিরামিকশিল্পের জন্য রোমানিয়ানদের কদর এখনো পুরো বিশ্বব্যাপী। প্যারিসের মতো বুখারেস্টের রাস্তাতেও বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য ও চিত্রকলার দেখা মেলে।

আমি একটা রেস্টুরেন্টে রেড টুনা স্টেক অর্ডার করি। বুখারেস্টের রেস্টুরেন্ট কিংবা কফি শপগুলোতে একটা অদ্ভুত রীতির প্রচলন আছে। আপনি যদি ট্যুরিস্ট হন, তাহলে খাবারের শেষে বিল পরিশোধ করার সময় আপনার কাছে খাবারের রিভিউ এবং সে রেস্টুরেন্ট কিংবা কফি বারের সেবার মান সম্পর্কে একটি রিভিউ লিখতে বলা হবে। বিলের পাশাপাশি আপনার কাছ থেকে টিপসও চাওয়া হতে পারে। যদি আপনি টিপস দিতে আগ্রহবোধ না করেন, তাহলে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ মনে করবে যে আপনি তাঁদের খাবার এবং সেবার মানে সন্তুষ্ট নন। তাই যাঁরা খেতে আসেন, এমনকি বুখারেস্টের স্থানীয় অনেক অধিবাসীকেও দেখেছি, খাবার গ্রহণের শেষে বিলের সঙ্গে টিপস প্রদান করতে। বুখারেস্টে এ বিষয়টি অত্যন্ত সাধারণ। খাওয়া শেষ করে আমি আবার হাঁটতে আরম্ভ করি।

default-image

কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমি সেক্টর ৫–এর কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায় পৌঁছাই। রোমানিয়ার সাবেক রাষ্ট্রনায়ক চশেস্কুকে এখানে গুলি করা হত্যা হয়েছিল। একটা বেঞ্চ খুঁজে বের করে সেখানে বসলাম, একজন লোক এ সময় আমাকে দেখে আমার দিকে এগোতে শুরু করলেন। তাঁর বয়স আনুমানিক ৬৫ থেকে ৭০ হবে। তিনি আমার কাছে এলেন এবং আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি আমার পাশে যদি বসতে চান, তাহলে আমার কোনো আপত্তি আছে কি না। আমি তাঁকে আমার পাশে বসাতে বললাম।

তিনি আমার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি। বললাম, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এরপর তিনি আমার ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বললাম, মুসলিম। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি নামাজে যেতে আগ্রহী কি না কিংবা হালাল খাবার পরিবেশন করে, এমন কোনো রেস্টুরেন্ট খুঁজছি কি না। ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাঁর একধরনের আগ্রহ লক্ষ করলাম। একই সঙ্গে ইসলাম ধর্মের ওপর তাঁর মধ্যে একধরনের অনুরাগ ফুটে উঠল।

বিজ্ঞাপন

তিনি তাঁর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন এবং আমাকে একটি ঠিকানা দিয়ে বললেন সেখানে তুর্কিদের একটি মসজিদ রয়েছে। অনেকক্ষণ কথা হলো তাঁর সঙ্গে। লোকটির নাম আইওয়ান রাম্বু। একসময় তিনি রোমানিয়ার সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করতেন, পেশায় তিনি একজন নিউরোলজিস্ট। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো। তিনি খুবই দুঃখ করে জানালেন, আজকের দিনে রোমানিয়াতে উল্লেখযোগ্য হারে জনসংখ্যা কমে আসছে। অর্থনৈতিকভাবে রোমানিয়া দুর্বল হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত আয়ের আশায় দেশটিতে বসবাস করা তরুণ প্রজন্মের অনেকে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, সুইডেন, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডসসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন।

default-image

চশেস্কু সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করলাম। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, চশেস্কুকে ইতিহাস স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে কিন্তু বাস্তবে চশেস্কু ঠিক ততটা খারাপ নন যতটা আমরা ধারণা করি। আইওয়ান রাম্বু বলেন, চশেস্কুর শাসনামলে বুখারেস্ট ছিল পরিপূর্ণভাবে প্যারিসকে টেক্কা দেওয়ার মতো একটি শহর। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বুখারেস্টকে গড়ে তুলেছিলেন এবং বুখারেস্টের আধুনিকায়নের জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

রাম্বুর মতে, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে রোমানিয়ার অগ্রযাত্রা দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না। অনেক রোমানিয়ান এ সময় বেকার হয়ে পড়েন, অনেকে দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। আইওয়ান রাম্বু বলেন, ধুঁকতে থাকা রোমানিয়ার অর্থনীতির মতো বুখারেস্টও ধীরে ধীরে জৌলুশ হারিয়ে ফেলছে। তবে বুখারেস্টের বাইরের মানুষের কাছে চশেস্কুর জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায়।

আইওয়ান রাম্বু বলেন, নব্বইয়ের দশকে যখন কমিউনিজমের পতন ঘটে, সে সময় চশেস্কু ছিলেন একমাত্র শাসক, যিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে কমিউনিজমের কার্যকারিতা তখনো ফুরোয়নি। তাই নব্বইয়ের দশকের পরবর্তী সময়ে যখন কমিউনিজমভিত্তিক শাসনব্যবস্থার দেশগুলোতে অর্থনীতির প্রবল সংকোচন সৃষ্টি হয় এবং ঋণের সমস্যায় যখন এসব দেশ জর্জরিত হয়ে পড়ে রোমানিয়ার অর্থনীতি সে রকম একটি ক্রান্তিকালীন সময় এসেও একটু আশার প্রদীপ দেখাচ্ছিল। চশেস্কু রোমানিয়াকে কোনো ঋণের বোঝায় পড়তে দেননি, বাইরের বিশ্বে দেশটির সব দেনা তিনি মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

default-image

পরিবার প্রথাকে বিকাশ করার জন্য তিনি অনেক কাজ করেছেন। সবাইকে সে সময় বাধ্যতামূলকভাবে কোনো না কোনো পেশাভিত্তিক কাজে অংশ নিতে হতো। প্রত্যেক পরিবারের জন্য একটি করে বাড়ি ও একটি গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সুবিধা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চশেস্কু ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধর্মে বিশ্বাস করতেন না, তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে চার্চগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তাঁর।

default-image

স্লোভেনিয়াতে থাকার সুবাদে এবং আমি যেহেতু এখানকার টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার, তাই রোমানিয়া যেতে আমার কোনো ভিসার প্রয়োজন হয়নি, শুধু বর্ডারে তারা পাসপোর্ট সিল করে। তবে রোমানিয়াতে আমার সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি ভালোও লেগেছে, সেটা হচ্ছে সেখানকার সাধারণ মানুষ। এটা ঠিক যে ইউরোপের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় রোমানিয়া অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা দুর্বল এবং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেশটির এ অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দায়ী। আয়ারল্যান্ড ছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত প্রায় সব দেশেই আমি গিয়েছি এবং যখন যে দেশে গিয়েছি, সব সময় আমি চেষ্টা করেছি স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথা বলার। আমার কাছে রোমানিয়ানদের সবচেয়ে আন্তরিক মনে হয়েছে।

ফেসবুকের বদৌলতে ২০১৪ সালে আমার সঙ্গে এক রোমানিয়ান মেয়ের পরিচয় হয়, তাঁর নাম ক্রিস্টিনা। বুখারেস্টে যাওয়ার পর তাঁকে মেসেজ করে বললাম যে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী। তিনি আমাকে আলেক্সান্ডার আওয়ান কুজা পার্ক নামে একটি জায়গায় যেতে বললেন। বুখারেস্টের একটা জিনিস আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে, সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য শহরের আনাচকানাচসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য পার্ক। আর সে দেশে দেখলাম স্ট্রিট ফুড ব্যাপক জনপ্রিয়, যেটা ইউরোপের অন্যান্য দেশে সেভাবে নেই। রাস্তাঘাট, ফুটপাত, পার্ক, বিভিন্ন স্টেশনসহ সব জায়গায় দেখা যায় কার্টে করে কিংবা ছোট দোকানে স্যান্ডউইচ, হটডগ, কফি, হাওয়াইমিঠাই, বাদাম, পিৎজা স্লাইস বিক্রি হতে।

default-image

ক্রিস্টিনা আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন এবং আমার গালে একটা চুমু আঁকলেন। সে এক অনাবিল প্রশান্তি! আমরা বেশ কিছুক্ষণ পার্কের ভেতর হাঁটাহাঁটি করলাম। অনেক বিষয় নিয়ে কথাও হলো। এরপর একসঙ্গে কফি খাওয়ার জন্য সামনের একটা কফিশপে গিয়ে বসলাম। এ কফিশপটা ছিল একটি শপিং মলের ছাদে, যেখান থেকে পুরো পার্কের ভিউ দেখা যায়। সারা দিন ঘোরার পর আমার তৃষ্ণাও লেগেছিল প্রচুর। আমি কোকাকোলা আর ক্রিস্টিনা কফি অর্ডার করল। কফিশপে বসেও অনেকক্ষণ গল্প করলাম একসঙ্গে।

ক্রিস্টিনা আমাদের সবার থেকে আলাদা, সে চায় জীবনটাকে উপভোগ করতে। নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর বেঁচে থাকতে, সমাজের সব প্রথাকে সে ভাঙতে চায়। আমরা অনেকেই যখন নির্দিষ্ট সময় পর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে পরি, সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রত্যাখ্যান করে চলে আসে এই বলে যে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বাস্তবিকভাবে কোনো জ্ঞান অর্জন এবং সেই সঙ্গে নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে সমাজের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাটাই প্রকৃত সার্থকতা। যতই তার সঙ্গে কথা বলতে থাকি, তার চিন্তাধারার প্রেমে ততই হাবুডুবু খেতে থাকি।

বয়সে ক্রিস্টিনা আমার চেয়ে দশ বছরের বড় অথচ বয়সও এখানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। কোনো এক অজানা কারণে ক্রিস্টিনার প্রতি আমার আলাদা এক ভালোবাসা কিংবা ভালো লাগার অনুভূতি জন্মাতে লাগল। একই সঙ্গে মনের মধ্যে একধরনের বেদনাও অনুভূত হতে থাকল। আমাদের সমাজব্যবস্থায় এ ধরনের অসম ভালোবাসা কিংবা ভালো লাগার কাহিনিগুলো চাপা পড়ে যায় সব সময়। ক্রিস্টিনার মতো আমি নির্ভীক নই, সমাজের কোনো প্রথাকে ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যে নেই আমার মধ্যে।

default-image

ততক্ষণে প্রায় বিকেল হয়ে গেছে। ক্রিস্টিনার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। ক্রিস্টিনা আমাকে মেট্রো পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। কিছুতেই তাঁকে বিদায় জানাতে ইচ্ছা করছিল না। মেট্রো স্টেশনে গিয়ে আমরা একসঙ্গে ছবি তুললাম। ক্রিস্টিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মেট্রোতে চেপে চলে এলাম মিলিটারি অটোগারাতে, যেখান থেকে পরবর্তী গন্তব্য হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট।

জেট ইঞ্জিন, ইনসুলিন কিংবা ফাউন্টেন পেন আবিষ্কৃত হয়েছিল যে দেশে কিংবা নাদিয়া এলেনা কমেনেসির মতো অলিম্পিক গেমসে পাঁচবার স্বর্ণপদক পাওয়া জিমন্যাস্ট অথবা সিমোনা হালেপের মতো টেনিস তারকার জন্ম হয়েছিল যে দেশে, সে দেশটি ছাড়তে বেশ কষ্টই হচ্ছিল। এরপর অনেক দেশে গিয়েছি, হয়তো যাব আরও সামনে। কিন্তু বুখারেস্ট! আমাকে যে প্রশান্তি দিয়েছিল, জানি না সেটা আর কোনো দিন ফিরে পাব কি না।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন