default-image
বিজ্ঞাপন

এয়ারপোর্ট থেকে বের হয় ট্যাক্সির ওপর নির্ভর না করে সরাসরি পাবলিক বাসে ওঠার চেষ্টা করলাম। পাবলিক বাসে এয়ারপোর্ট থেকে সিটি সেন্টারে যেতে ১.৫০ বুলগেরিয়ান লেভের প্রয়োজন হয়। বুলগেরিয়ার জাতীয় মুদ্রার নাম লেভ। বুলগেরিয়ান ভাষায় লেভ শব্দের অর্থ সিংহ। তবে দেশটিতে ইউরোর ব্যবহার সর্বত্র, দুই বুলগেরিয়ান লেভা সমান এক ইউরো। দেশটির প্রায় সব মানি এক্সচেঞ্জে এই রেটে ইউরোর বিপরীতে বুলগেরিয়ান লেভের বিনিময় করা যায়।

default-image

ইউরোপের অন্যান্য দেশে কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্ট ছাড়াও অনেক সময় রাস্তার দুই ধারের দোকান কিংবা স্টপগুলোর বুথ থেকেও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে টিকিট কেনা যায়। কিন্তু বুলগেরিয়াতে এ ধরনের সিস্টেম নেই তেমন একটা, বাসে ওঠার সময় বাসের ড্রাইভারের কাছ থেকেই টিকিট কিনতে হয়। এ বিষয়ও আমি আগে জানতাম না, বাসে ওঠার সময় ড্রাইভার এবং টিকিট ইন্সপেক্টরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কোথা থেকে টিকিট কিনতে হবে। প্রথমত, তাঁদের দুজনই ছিলেন বয়স্ক, তাই তাঁরা যে ইংরেজি বুঝবেন এবং ইংরেজিতে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন, সেটা আশা করা যায় না। বুলগেরিয়ান কিংবা রাশিয়ান ভাষার ওপর আমার দক্ষতা নেই, তাই তাঁদের নির্দেশনা আমি বুঝব না, সেটা স্বাভাবিক।

ইউরোপে আসার পর কপালদোষে ওই একবার আমাকে জরিমানা গুনতে হয়, বিনা টিকিটে বাসে ওঠার অপরাধে ৪০ লেভ জরিমানা পরিশোধ করতে হয়। টিকিট ইন্সপেক্টর ছিলেন একজন নারী, তাঁকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে আমি বুলগেরিয়ায় প্রথমবার এসেছি এবং আমি জানতামও না সেখানে সবকিছু কোন নিয়মে চলে। আমি আমার স্টুডেন্ট কার্ড দেখিয়েও অনুরোধ করেছিলাম যাতে আমার জন্য জরিমানা নির্ধারণ না করা হয়, কিন্তু কিছুতেই তাঁর মন গলল না।

default-image

যদিও বর্তমানে বুলগেরিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি দেশ, তবে আমাদের চোখে যদি ইউরোপের সংজ্ঞা হয়ে থাকে জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নরওয়ে কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত কোনো দেশ, তাহলে বুলগেরিয়ায় আসার পর আপনাকে হতাশ হতে হবে। অবকাঠামোগত দিক থেকে বুলগেরিয়া এখনো অনেক পিছিয়ে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি বিভিন্ন সূচকে বেশ অগ্রগতি লাভ করেছে। সাধারণভাবে বলতে গেলে, বুলগেরিয়া এখনো বলকান পেনিনসুলার অন্যান্য দেশের মতোই। জাতিগতভাবে বুলগেরিয়ানরা অত্যন্ত রক্ষণশীল।

বিজ্ঞাপন

ধীরে ধীরে যতই সোফিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকি, ততই হতাশ হতে হয়। গ্রিক পুরাণে সোফিয়া হচ্ছেন জ্ঞানের দেবী। প্রথমবার যদি কেউ সোফিয়াতে বেড়াতে আসেন, তাঁর কাছে সোফিয়াকে ধ্বংসস্তূপ বৈ অন্য কিছু মনে হবে না। সোফিয়াতে প্রবেশের পর আমার কাছে মনে হচ্ছিল কোনো এক দুঃখিনী রাজকন্যার রাজ্যে বুঝি পা রাখলাম। দালানকোঠা থেকে শুরু করে সোফিয়ার বেশির ভাগ অবকাঠামো কমিউনিস্ট শাসনামলে নির্মিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব স্থাপনা আজ বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে।

default-image

একসময় বুলগেরিয়া ছিল ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিপত্তিশালী দেশগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় দেশটিতে কমিউনিজমভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশটিতে কমিউনিস্ট শাসনের প্রভাব ছিল। আজকের দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে আমরা কানাডাকে যেভাবে মূল্যায়ন করি, সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে সে সময় বুলগেরিয়াকে একইভাবে মূল্যায়ন করা হতো। উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী পাড়ি জমাতেন দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এ দেশে।

ডেমোক্রেটিক এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে রূপান্তর বুলগেরিয়ার জন্য প্রথম দিকে সুখপ্রদ হয়নি। কমিউনিস্ট সরকারের পতন এবং সোভিয়েত বাজারে বুলগেরিয়ান পণ্যের বিলোপ ঘটায় দেশটির অর্থনীতির প্রবল সংকোচন ঘটে। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের ঊর্ধ্বগতি, অবারিত দুর্নীতি এবং সমাজকল্যাণ ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটায় জীবনযাত্রার মানের চরম পতন ঘটে। অনেক বুলগেরিয়ান দেশ ছেড়ে চলে যান। তবে দেশটির সরকার কর্তৃক নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে গৃহীত সংস্কারগুলোর ব্যাপারে অটল থাকলে ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়।

default-image

২০০১ সাল থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক—সবদিক থেকে বুলগেরিয়া উন্নতি লাভ করতে শুরু করে। বর্তমানে তাই আন্তর্জাতিক মানব উন্নয়ন সূচকে বুলগেরিয়ার অবস্থান ৫৬তম। অনেক বুলগেরিয়ান আজও মনে করেন, বুলগেরিয়া আবারও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় ফিরে গেলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি লাভ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে। বুলগেরিয়ার সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ তাই কমিউনিস্ট শাসনাধীন বুলগেরিয়াকে তাঁদের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যা দেন।

প্রথম দিনের দুই তিক্ত অভিজ্ঞতা বুলগেরিয়ার প্রতি আমার যাবতীয় আকর্ষণকে সম্পূর্ণভাবে ম্লান করে দিয়েছিল। হোস্টেলে চেকইন করার পর তাই সেদিন আর কোথাও বের হতে ইচ্ছা করেনি। রাতে খাবারের জন্য ডোমিনোস থেকে পিৎজা অর্ডার করেছিলাম। এ সময় ভাবলাম, হাতে যদি কিছু বুলগেরিয়ান লেভ রাখা যায়। হোস্টেল থেকে তাই সরাসরি বের হয়ে পড়লাম সোফিয়ার সিটি সেন্টারের উদ্দেশ্যে। সোফিয়ার গণপরিবহন পরিষেবার মান খারাপ, এ কথা বলা যাবে না। পাবলিক বাসের পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস কিংবা ট্রামেরও ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে।

default-image

এ ছাড়া সোফিয়ার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পরিষেবায় সম্প্রতি যোগ হয়েছে মেট্রো সার্ভিস। রাতের সোফিয়া একেবারে নির্জন, মানুষের স্পন্দন খুব একটা দেখা যায় না বললেই চলে। রাত আটটাকে অনেক সময় সেখানে গভীর রাত মনে হয়। আমস্টারডাম, বার্লিন, মাদ্রিদ, বার্সেলোনা কিংবা লিসবনের মতো সোফিয়াতে তেমন একটা পানশালা কিংবা নাইট ক্লাব খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোয় ইউরোপের অনেক শহরে অধিবাসীরা সন্ধ্যা না গড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় একত্র হন কেবল পার্টি আয়োজনের উদ্দেশ্যে, সোফিয়াতে তেমনটিও দেখা গেল না। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো বিল্ডিং নিচের ফ্লোরে তরুণ-তরুণীর ঝাঁকের দেখা মেলে। বিভিন্ন ধরনের নাচগানের মাধ্যমে তারা আশপাশের পরিবেশকে মুখরিত করে রাখে, তবে সেটাকে হাউস পার্টি বলাই ভালো। সিটি সেন্টারের কাছের একটা মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ইউরোর বিনিময়ে কিছু বুলগেরিয়ান লেভ কিনে রাখলাম।

বিজ্ঞাপন

হোস্টেলে ফিরে গিয়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলাম, রাত আটটা বাজতে না বাজতে পুরো সোফিয়া কেন নিথর হয়ে পড়েছে?

default-image

ম্যানেজার বললেন, বুলগেরিয়ানরা এখনো জাতি হিসেবে রক্ষণশীল। এ কারণে নাইট লাইফ এখনো তাদের দেশের মানুষের কাছে তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বুলগেরিয়ার জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। নবদম্পতিরা সন্তান গ্রহণে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের অনেকে জীবন ধারণের জন্য বুলগেরিয়াকে পছন্দের তালিকায় রাখতে চান না। তাঁদের বেশির চলে যাচ্ছেন ইউরোপ, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার দেশগুলোয়। ফলে, দেশটিতে বর্তমান সময়ে বসবাস করা নাগরিকদের বড় অংশ ষাটোর্ধ্ব সিনিয়র সিটিজেন।

সোফিয়াতে বার কিংবা নাইট ক্লাব যে নেই তা নয়, তবে সেটা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মতো তেমন একটা সহজলভ্য নয়। ম্যানেজারের কথায় আমি অন্তত সেটাই বুঝলাম।

default-image

বুলগেরিয়ায় পাঁচ দিন থাকার পরিকল্পনা করেছিলাম। সোফিয়ার পাশাপাশি পিরিন ন্যাশনাল পার্ক, রিলা মাউন্টেন, গোলাপের গ্রাম কাজানলাক এবং সানি বিচ দেখার জন্য বুলগেরিয়াতে আসা। কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত রোজ ভ্যালিকে পৃথিবীর গোলাপের রাজধানী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। বলকান পর্বতমালার দক্ষিণাংশ থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলীয় স্রেদনা গোরা পর্যন্ত এই রোজ ভ্যালি বিস্তৃত।

তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এখানকার কৃষকেরা কাজালনুক গোলাপের চাষ করে আসছেন। এই গোলাপের তেল অত্যন্ত দুর্লভ এবং বুলগেরিয়ার অন্যতম রপ্তানি পণ্য। মার্চ কিংবা এপ্রিল মাসের দিকে গোলাপের চারা রোপণ করা হয়; মোটামুটি জুন কিংবা জুলাই মাসের দিকে এসব গাছ ফুল সংগ্রহের উপযোগী হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, রিলা মাউন্টেনের উপরিভাগ এবং পিরিন ন্যাশনাল পার্ক মার্চ ও এপ্রিল মাসেও পুরু বরফের স্তরে আচ্ছাদিত থাকে। মোটামুটিভাবে মে মাসের দিকে এসব বরফ গলতে আরম্ভ করে। হাইকিংয়ের জন্য রিলা মাউন্টেন একটি আদর্শ জায়গা, রিলা মাউন্টেন থেকে বুলগেরিয়ার প্রসিদ্ধ সাতটি হ্রদের উৎপত্তি ঘটেছে। রিলা মাউন্টেনের ঢালে যেতে পেরেছি, কিন্তু হাইকিংয়ের সুযোগ পাইনি। আসলে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বুলগেরিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা সঠিক ছিল না। বরং জুন কিংবা জুলাইয়ের দিকে এলে ভালো হতো। তাহলে হয়তো আক্ষেপ এড়ানো যেত।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন