ম্যানেজারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রথম দিন রিলা মনাস্টারি পরিদর্শনে যাই। হোস্টেলের পক্ষ থেকে এ ট্যুরের আয়োজন করা হয় এবং সম্পূর্ণ ট্যুরের জন্য ৪০ বুলগেরিয়ান লেভ দিতে হয়।

default-image

বুলগেরিয়ার বেশির ভাগ মানুষই খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী। ধর্মীয় দিক থেকে নিজেদের তারা বুলগেরিয়ান অর্থোডক্স হিসেবে পরিচয় দিতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের হাত ধরে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো বুলগেরিয়াতেও অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটির বিস্তৃতি ঘটেছে। অর্থোডক্স চার্চে বিশ্বাসী খ্রিষ্টানদের কাছে বুলগেরিয়া পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। স্লাভিক ভাষাগুলোকে লিপিবদ্ধ করার জন্য ‘সিরিলিক’ নামক এক বিশেষ ধরনের বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়। মূলত স্লাভদের মধ্যে অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা দৈনন্দিন লেখাজোকার কাজে সিরিলিক বর্ণমালা ব্যবহার করেন। গ্রিক বর্ণমালার আদলে এই সিরিলিক অক্ষরগুলোকে সাজানো হয়েছে।

default-image

বিখ্যাত ধর্মযাজক সিরিল ও মেথোডিয়াসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এ বর্ণমালা উদ্ভবের কারিগর হিসেবে। সিরিল এবং মেথোডিয়াস উভয়েই আবার সহোদর। তাঁদের জন্ম হয়েছিল আনুমানিক নবম শতাব্দীতে থ্রেস নামক স্থানে। বর্তমানে থ্রেস গ্রিস, মেসিডোনিয়া ও বুলগেরিয়া—এ তিন দেশের মাঝে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি থ্রেসের একাংশ তুরস্কের মধ্যেও পড়েছে। বুলগেরিয়ানদের দাবি অনুযায়ী সিরিলিক বর্ণমালার উৎপত্তি ঘটেছিল বুলগেরিয়াতে এবং তাঁরা সিরিল এবং মেথোডিয়াস এই দুই ধর্মযাজকে বুলগেরিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

বিজ্ঞাপন

বুলগেরিয়ানদের মতে, আজকে পৃথিবীর মানচিত্রে মেসিডোনিয়া নামক যে দেশটি রয়েছে, সেটি একসময় বুলগেরিয়ার অংশ ছিল। বুলগেরিয়ানদের দাবি অনুযায়ী এখন থেকে ঠিক এক শ বছর আগেও বুলগেরিয়ান ও মেসিডোনিয়ান—এ দুটি ভাষার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মেসিডোনিয়া যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনে যোগ দেয় এবং সে সময় থেকে মেসিডোনিয়ার ভাষায় সার্বিয়ান বহু শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। এভাবে শত বছরের সার্বিয়ান ভাষার প্রভাব মেসিডোনিয়ার ভাষাকে আজকের এ পর্যায়ে দাঁড় করায়।

বুলগেরিয়ানদের অনেকে মেসিডোনিয়াকে আজও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্যবোধ করে এবং এ মেসিডোনিয়াকে ঘিরে সেই দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধের সময় থেকেই বুলগেরিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। মেসিডোনিয়ার অধিকার নিয়ে বুলগেরিয়া গ্রিস ও সার্বিয়ার সঙ্গে বিবাদেও জড়িয়েছে।

বলকান উপদ্বীপের দেশগুলো এমন কেন, সে প্রশ্নের উত্তর সব সময় খোঁজার চেষ্টা করি। রাজনৈতিক অঙ্গনে গ্রিস ও তুরস্ক একে অন্যের চিরশত্রু। ঠিক একইভাবে হাঙ্গেরি ও রোমানিয়া এবং স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া একে অন্যকে ঘৃণার চোখে দেখে। অনুরূপভাবে মেসিডোনিয়ানরা বিভিন্ন সময় আলবেনিয়ান ও গ্রিকদের নিয়ে প্রায়ই নেতিবাচক মন্তব্য করে। আলবেনিয়ানরা সার্বিয়ানদের ঘৃণার চোখে দেখে এবং সার্বিয়ানরা ক্রোয়েশিয়ানদের ভীষণভাবে অপছন্দ করে।

অন্যদিকে মন্টিনিগ্রোর অনেক সাধারণ মানুষের চোখেও সার্বিয়া নেতিবাচক ধারণার একটি দেশ। আর বসনিয়া-হার্জেগোভিনা নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে জর্জরিত। ১৯ হাজার ৭৪১ বর্গমাইলের এ দেশটি প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস অথচ দেশটি বসনিয়াক, সার্ব ও ক্রোয়াট—তিনটি ভিন্ন জাতিসত্তায় বিভক্ত। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরিতা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ। সাংস্কৃতিক দিক থেকে দুই দেশের মধ্যে তেমন বিভেদ নেই।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপের অনেক দেশে আমি দেখেছি, সব রাজনৈতিক বৈরিতাকে ভুলে ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের মানুষজন একসঙ্গে বসবাস করছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করছে এবং একে অপরের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছে। অথচ বলকান দেশগুলোর মানুষের মাঝে বৈরিতা এত বেশি যে অনেক সময় নিজেদের জাতিসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত সামান্য কোনো বিষয় নিয়েও এদের মাঝে মারামারি লেগে যায়। ইউরোপের মতো একটি মহাদেশে এ ধরনের কোনো বিষয় সত্যিই অবাক করে।

অন্যদিকে মেসিডোনিয়ানরা মনে করে, সিরিলিক বর্ণমালার উৎপত্তি ঘটেছিল মেসিডোনিয়াতে এবং তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সিরিল ও মেথোডিয়াস—এ দুই ধর্মযাজক ছিলেন মেসিডোনিয়ান।

default-image

ক্যাথলিক চার্চের মতো অর্থোডক্স চার্চগুলো পোপের ধারণাকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয় না, তারপরেও অঘোষিতভাবে বিখ্যাত বুলগেরিয়ান ধর্মযাজক সেন্ট ইভানকে বুলগেরিয়ান অর্থোডক্স চার্চের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেন্ট ইভানকে জন অব রিলা নামেও অভিহিত করা হয়। আনুমানিক ৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রিলা মনাস্টারি প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থোডক্স চার্চে বিশ্বাসী খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে রিলা মনাস্টারি এক পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত হয়। ধর্মচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে এবং বুলগেরিয়ার সংস্কৃতিতেও রিলা মনাস্টারি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি স্থান। সোফিয়া থেকে ৭৩ মাইল দক্ষিণে রিলস্কা নদীর সঙ্গমস্থলে রিলা মনাস্টারির অবস্থান।

রিলা মনাস্টারির পাশাপাশি কেভ অব জন অব রিলাতে যাওয়ারও সৌভাগ্য হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এ গুহায় প্রায়ই সেন্ট ইভান আসতেন ধ্যান করার জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে সেখানে সমাহিত করা হয়েছে। বর্তমানে এ গুহাকে অর্থোডক্স চার্চে রূপ দেওয়া হয়েছে এবং সেইন্ট ইভানের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে এ স্থানকে সাজানো হয়েছে।

default-image

রিলা মনাস্টারি পরিদর্শন শেষে সোফিয়াতে ফিরে আসি। ট্যুর গাইড আমাদের সবাইকে সোফিয়ার সিটি সেন্টারে নামিয়ে দেয়। সোফিয়ার বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থানই এ সিটি সেন্টারের আশপাশে অবস্থিত। সিটি সেন্টারে পা রাখতেই আচমকা আমার চোখে পড়ে একটি মসজিদ। মসজিদটি দেখে যে কেউই বলে দিতে পারবেন, এটি ওসমানীয় স্থাপত্যকলার অনুকরণে নির্মিত।

দীর্ঘ প্রায় পাঁচ শ বছর বুলগেরিয়াতে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। দেশটির বিভিন্ন অংশে আজও তাই ওসমানীয় শাসনামলে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা খুঁজে পাওয়া যায়। বুলগেরিয়ার সংস্কৃতি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যাভ্যাসেও অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব লক্ষণীয়। এমনকি বুলগেরিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের মানুষ আজও তুর্কি ভাষায় কথা বলেন। বুলগেরিয়া নামটি এসেছে ‘বুলগার’ শব্দ থেকে; বুলগাররা হচ্ছেন প্রোটো-তার্কিক বংশোদ্ভূত লুপ্তপ্রায় এক উপজাতি জনগোষ্ঠী।

অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের পর বুলগেরিয়ার সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের ধর্ম ইসলাম। ২০১৮ সালের জনগণনা অনুযায়ী বুলগেরিয়াতে বসবাসরত মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশই মুসলমান।

default-image

বুলগেরিয়াতে দুই ধরনের মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছেন। প্রথমত টার্কিশ বুলগেরিয়ান যারা তুর্কি ভাষায় কথা বলে। এদের অনেকে সরাসরিভাবে অটোমানদের বংশধর। আর আছে পোমাক মুসলিম; যারা জাতিগতভাবে বুলগেরিয়ান কিংবা মেসিডোনিয়ান। সংখ্যায় এরা একে অন্যের কাছাকাছি। ১৯২৩ সালে লুজার্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে টার্কিশ বুলগেরিয়ান ও পোমাকদের একটি বড় অংশ তুরস্কে চলে আসে। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে উগ্র বুলগেরিয়ান জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে মসজিদসহ ওসমানীয় শাসনামলে নির্মিত অনেক স্থাপনা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বুলগেরিয়াতে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনেককে জোর করে ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করা হয়। কমিউনিস্ট শাসনামলে বুলগেরিয়ায় ধর্মচর্চা নিষিদ্ধ ছিল। অনেক ধর্মীয় স্থাপনা এ সময় ভেঙে ফেলা হয়।

বিজ্ঞাপন

সোফিয়ার সিটি সেন্টারে অবস্থিত এই মসজিদের নাম বানিয়া বাশি চামি। ১৫৬৬ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। বানিয়া বাশি শব্দের ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ‘মেনি বাথ’। ভূগর্ভস্থ পানির উৎস হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাথ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ধারণা করা হয়, বাথের পানিতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ লবণের প্রাচুর্য থাকে। এ ছাড়া সাধারণ পানীয় জলের তুলনায় বাথের পানি তুলনামূলকভাবে অধিক উষ্ণ, তাই স্পা থেকে শুরু করে বিভিন্ন থেরাপির কাজে বাথের পানি ব্যবহার করা হয়।

default-image

বানিয়া বাশি মসজিদটি সোফিয়ার যে স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে, সে জায়গায় একসময় থার্মাল বাথ ছিল। সোফিয়া সেন্ট্রাল মিনারেল বাথেরও অবস্থান বানিয়া বাশি মসজিদের কাছেই। সোফিয়ার স্থানীয় জনসাধারণের পানির চাহিদার বড় অংশের জোগান সেখান থেকে আসে।

মসজিদের বাইরে এক বুলগেরিয়ানের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর নাম স্ভেতোস্লাভ ইয়োর্দানভ। তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। ইয়োর্দানভ আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন, আমি ভারত থেকে এসেছি কি না।
-বললাম না, বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন