বৃষ্টিবনের নির্জনে

মিনামারা ফরেস্টে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে এমন দৃশ্যের
মিনামারা ফরেস্টে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে এমন দৃশ্যেরছবি: লেখক
বিজ্ঞাপন

করোনার প্রাদুর্ভাবে পৃথিবীব্যাপী স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত। অস্ট্রেলিয়াতেও তার ধাক্কা এসে লেগেছে। ভালো ব্যাপার ছিল, অস্ট্রেলিয়া করোনার প্রথম ধাক্কাটা খুবই সুন্দরভাবে মোকাবিলা করেছিল। কিন্তু যখন বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকেরা ফিরে আসতে শুরু করলেন, তখন এসে লাগল দ্বিতীয় ধাক্কা। বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা অস্ট্রেলিয়ানরা এসে শুরুতে ভিক্টোরিয়া রাজ্যের রাজধানী মেলবোর্নে ১৪ দিন কাটিয়েছেন কোয়ারেন্টিনে। তারপর নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে গেছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই এসেছিলেন করোনা পজিটিভের লক্ষণ নিয়ে। এ ছাড়া অনেক দিন নিয়মকানুন মেনে চলার ফলেই হয়তোবা মেলবোর্নের মানুষ একটু বেপরোয়া হয়ে উঠছিলেন। পথঘাটে, দোকানপাটে কোনো প্রকার সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলায় একসময় এক দিনে করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। এর ফলশ্রুতিতে নিউ সাউথ ওয়েলসেও বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে বর্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এভাবেই এখন পর্যন্ত চলছে অস্ট্রেলিয়ার জনজীবন এবং সাম্প্রতিক খবরে বলা হচ্ছে, অনেক দিন পর অস্ট্রেলিয়া আবার আর্থিক মন্দার শিকার হতে যাচ্ছে।

default-image

যা–ই হোক, তবুও ‘জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মেই’। দেখতে দেখতে অস্ট্রেলিয়ায় বাবা দিবস চলে এল। বাবা দিবস বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দিনে পালন করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় এবার পালন করা হলো ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ রোববার। সেদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল। কারণ, আগের রাতে ঘুমাতে যেতে দেরি হয়েছিল। ঘুম ভাঙল রায়ানের ডাকাডাকিতে। সে দেখে ফেলেছে, তার মা ও বোন মিলে কিছু একটা আয়োজন করছে। কিন্তু আমি পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছি, তাই ডেকে তোলা। আমি টেবিলে গিয়ে দেখি, আমার জন্য নাশতা ও উপহার প্রস্তুত! ওদের উপহারগুলো খুলে খুলে দেখলাম। তারপর সবাই মিলে একসঙ্গে নাশতা করলাম। নাশতা করতে করতে ভাবছিলাম, বাচ্চাদেরও একটা সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়। বাবা দিবসের এই অছিলায় কোথাও থেকে ঘুরে আসলে কেমন হয়!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফেসবুক এখন যেমন শো-অফের জায়গা, তেমনি অনেক কাজেরও জায়গা। ফেসবুক এখন নাগরিক সমাজের দর্পণ। আগের দিন পিউ আপু সপরিবার ‘মিনামারা রেইন ফরেস্টে’ বেড়াতে গিয়ে ছবি পোস্ট করেছিলেন। দেখে খুবই মনে ধরেছিল। একেবারে নির্জন জায়গা, ঝুলন্ত সেতু, টলটলে পরিষ্কার পানির ঝরনা। বেড়ানোর জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা।

পিউ আপুর সঙ্গে পরিচয় অস্ট্রেলিয়া আসার পর বেশ একটা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই। সে গল্প অন্য কোনো সময় বলা যাবে। তিনি প্রকৃতিপ্রেমী। ফেসবুকে তাঁর সে ছবিগুলো দেখে মনে মনে পরিকল্পনা করে ফেললাম, পরের দিন বাবা দিবসে বাচ্চাদের নিয়ে ওখানে বেড়াতে যাব। আমাদের বাসা মিন্টো থেকে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। হুট করেই পরিকল্পনা করা। তাই একটা ব্যাকপ্যাকে এক প্যাকেট ড্রাই কেক আর এক বোতল কোক নিয়ে নিলাম। এরপর যাত্রা শুরু করলাম। রায়ান আর তাহিয়া পথেই ঘুমিয়ে পড়ল।

default-image

আমি দুই পাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যেতে শুরু করলাম। এর আগে যখন এদিক দিয়ে গেছি, তখন দাবানল হচ্ছিল চারদিকে। তাই আশপাশের স্থলভাগ ছিল একেবারে বাদামি বর্ণের বিরানভূমি। কিন্তু এবার সেসব খোলা জায়গা গাঢ় সবুজে ঢাকা। তার মধ্যেই কোথাও গরু, কোথাও ভেড়া, কোথাও ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর শুরু হয় পাহাড়ি রাস্তা। রাস্তাটা কখনো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে, কখনো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যাওয়ার সময় অন্য পাশে তাকালে, সত্যি বলতে, কিছুটা ভয়ই লাগে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এভাবে চলতে চলতে একটা সময় আমরা রাস্তা থেকে সমুদ্র দেখতে পেলাম। ততক্ষণে তাহিয়া ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। তাহিয়াকে বললম, দেখো, সামনের জায়গাটা নিচু। কিন্তু সমুদ্রের পানি আমাদের উচ্চতায় আছে, তবুও স্থলভাগে এসে পড়ছে না। কী অদ্ভুত ভূগোল, তাই না? সে খুবই অবাক হলো।

এরপর একসময় পৌঁছে গেলাম মিনামারা রেইন ফরেস্টের প্রবেশদ্বারে। আমাদের সামনে আরও তিনটা গাড়ি অপেক্ষা করছিল। ভেতর থেকে একটা একটা করে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিল আর সেটা হিসাব করে একটা একটা গাড়ি প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল। কারণ, পার্কিং তখন পুরোপুরি ভর্তি।

default-image

আমাদের সময় এলে দায়িত্বরত মহিলা বললেন, ‘তোমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, পার্কিং ফুল। ভেতরে গেলে দেখবে পার্কিংয়ের পাশেই টিকিট কাউন্টার। সেখান থেকে সারা দিনের জন্য একটা ১২ ডলারের টিকিট কিনে নিয়ো, ব্যস, হয়ে গেল। এরপর তোমরা রেইন ফরেস্ট বা ঝরনাতে হাঁটাহাঁটি করতে পারবে। আর আমরা খুবই দুঃখিত যে আমাদের রেস্তোরাঁটা কোভিডের জন্য আপাতত বন্ধ রয়েছে।’ তাকে পার করে আরও একটু এগিয়ে যেতেই আরও একজন মহিলা আমাদের তিন বাপ–বেটা-বেটিকে দেখে বললেন, হ্যাপি ফাদারস ডে। তোমরা খুবই ভালো দিনে এসেছ। এখানে একটু অপেক্ষা করো, ভেতর থেকে একটা গাড়ি বের হলেই তোমাদের ঢুকতে দেব। একটু পরই পরপর তিনটা গাড়ি বেরিয়ে এলে তিনি আমাদের ঢুকতে দিলেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গাড়ি পার্ক করে একটা টিকিট নিয়ে এসে বনেটে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমার কাঁধে ব্যাকপ্যাক আর সবার আগে রায়ান, তারপর আমি আর তাহিয়া। রায়ানকে সব সময়ই সবার আগে যেতে দিতে হবে, না হলে চিৎকার করে আমাদের যাওয়া পণ্ড করে দেবে। প্রবেশপথের বাঁ পাশেই রেস্তোরাঁ আর তার নিচের তলায় প্রসাধনকক্ষ। আর বাঁ দিকে আরও একটু নেমে গেলে গাছে ঢাকা ছায়া সুনিবিড় পিকনিক স্পট।

default-image

এখন যেহেতু রেস্তোরাঁ বন্ধ, তাই অনেকেই খাবার নিয়ে এসে পিকনিক স্পটে বসে খাওয়াদাওয়া সেরে নিচ্ছেন। আমরা রেস্তোরাঁকে পাশ কাটিয়ে বনে প্রবেশ করলাম। বনে প্রবেশের মুখে তির চিহ্ন দিয়ে দেখানো আছে, কোন দিকে যেতে হবে। তাহিয়া ভুল করে শেষ থেকে শুরু করল। অবশ্য এতে আমাদের তেমন কোনো সমস্যা হলো না। কারণ, পুরো ওয়াক একটা লুপ। আপনি যেদিক দিয়েই যান না কেন, আবার শুরুতেই ফিরে আসবেন।

মূল রেইন ফরেস্ট ওয়াকের লুপটা ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার আর মূল লুপ থেকে একটা শাখা বেরিয়ে গেছে ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, যেটা শেষ হয়েছে একটা সুন্দর ঝরনায় গিয়ে। তার মানে আপনাকে পুরো ওয়াক শেষ করতে হলে মোট ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার হাঁটতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মূল লুপটার গ্রেড হলো তিন আর ঝরনায় যাওয়ার ওয়াকটার গ্রেড হলো চার। এখানে বলে রাখা ভালো, গ্রেড যত বেশি হবে, হাঁটাটা তত কঠিন হবে। গ্রেড আসলে রাস্তার স্লোপের সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রেড বেশি মানে আপনাকে বেশ উঁচু স্লোপ দিয়ে হাঁটতে হবে। আমরা যেহেতু উল্টো দিক দিয়ে এসেছি, তাই আমাদের সামনে আগে পড়ল ঝরনায় যাওয়ার শাখা রাস্তাটা। আমরা সেদিকে হাঁটা শুরু করলাম।

default-image

কিছুদূর যাওয়ার পর তাহিয়া ক্লান্ত হয়ে গেল খাড়া রাস্তায় হাঁটার কারণে। কিন্তু রায়ানের কোনো ক্লান্তি নেই। সে দৌড়ে দৌড়ে একটা করে বাঁক পার হচ্ছিল। প্রতিটা বাঁকের শেষে একটা করে বেঞ্চ রাখা আছে বসে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। আমি তারই একটাতে বসিয়ে দুজনকে ব্যাকপ্যাক থেকে কেক আর কোক বের করে খাইয়ে দিলাম। বললাম, বেশি খেয়ো না। তাহলে হাঁটতে বেশি কষ্ট হবে। একটা বেঞ্চে দেখলাম তাহিয়ার বয়সী একটি মেয়ে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে আর পাশে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের দেখে আমরা বললাম, আর কতদূর? মেয়েটা বলল, তোমরা সবে অর্ধেক এসেছ। আর বাবাটা বললেন, তুমি যাওয়ার সময় বাঁ পাশে পায়ের কাছে খেয়াল করে দেখো, খুবই ছোট স্কয়ার আকারের বাক্সে মাইলেজ দেওয়া আছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটার রাস্তাটা থেকে গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে অন্য পাশের পাহাড়ের গায়ের সবুজ দেখা যাচ্ছে। আর দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ঝরনা। সেটা অনেক নিচে অবস্থিত বলে আমরা তখনো ঝরনার টিকিটার দেখা পাইনি। আমি তাহিয়াকে বললাম, এখানে পুরো পাহাড় সবুজে ঢাকা। শুনে তাহিয়া বলল, রেইন ফরেস্ট তো, তাই সব সময়ই কোনো না কোনো গাছপালা জন্মাতে থাকে মনে হয়। আমি কান পেতে একধরনের শব্দ শুনতে পেয়ে বললাম, বৃষ্টি শুরু হলো নাকি? তাহিয়া বলল, না। আসলে এখানে সব সময় এমন শব্দ হয় বলেই হয়তো এই বনের এমন নামকরণ।

default-image

রেইন ফরেস্টের গাছগুলো যেমন বয়স্ক, তেমনি অনেক উঁচু। আর সেসব উঁচু গাছের গায়ে আবার বাসা বেঁধেছে অনেক পরগাছার ঝাড়। এই পরগাছাগুলোর বিশেষত্ব হলো, এগুলো অনেকটা আঠার মতো গাছের গায়ে লেগে আছে আর সেখান থেকে গাঢ় সবুজ পাতা বেরিয়ে ছোট ঝাড়ে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া অনেক লতা গাছের মাথা অবধি চলে গেছে। লতাগুলো এতই বয়স্ক যে দেখে আলাদা গাছ বলে ভ্রম হয়। অনেকগুলো লতা আমাদের হাঁটার রাস্তায় ঝুলে ছিল। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে লতা ধরে ঝুলে টারজানের মতো ভঙ্গি করে ছবি তুলে নিলাম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এভাবে চলতে চলতে একসময় আমরা ঝরনার কাছে পৌঁছে গেলাম। হাঁটার সময় ভাবছিলাম, এত কষ্ট করে হাঁটছি কিন্তু ঝরনাটা যদি সুন্দর না হয়, তাহলে সব পরিশ্রমই মাটি হয়ে যাবে। কিন্তু ঝরনার কাছে যাওয়ার পর আমাদের প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। একে তো ঝরনার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, অন্যদিকে ঝরনার পানির কারণে সেখানকার শীতল পরিবেশ। তাহিয়া মুখ দিয়ে নিশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, বাবা দেখো, শীতকালের মতো সাদা ধোঁয়া বের হচ্ছে মুখ থেকে। তাহিয়ার দেখাদেখি রায়ানও ধোঁয়া বের করে আমাকে দেখাল। ঝরনাটা অনেক উঁচু থেকে নেমে এসেছে। ঝরনাটার দুই পাশে আবার উঁচু গাছ। সেই গাছের মাথায় তাকাতে হলে আপনাকে পুরোপুরি ঘাড় কাত করতে হবে।

default-image

এতক্ষণ হাঁটার সময় আমরা কোনো আকাশ দেখিনি। ঝরনার ওখানে একচিলতে আকাশের দেখা পেলাম। ঝরনার পানিতে নামা নিষেধ বলে আমরা সামনে দাঁড়িয়ে একজনকে দিয়ে ছবি তুলে নিলাম। ঝরনার ঠিক বাঁ পাশেই একটা লুকআউট। সেখানে দাঁড়ালে নিচের প্রবাহটা দেখা যায়। ঝরনাটা পাহাড়ের ফাঁক গলে ঘুরে ঘুরে অনেক নিচে নেমে গেছে। সেদিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়।

ঝরনাটা এতটাই সুন্দর যে আমরা আর ফিরতে চাইছিলাম না। কিন্তু আমাদের ফিরতে হবে। ঝরনার ওয়াকের মাঝপথে এসে লুৎফা ভাবিদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। তাঁরাও সেদিন গেছেন সপরিবার। লুৎফা ভাবি বললেন, ভাই আর কতদূর? আমি বললাম, আপনারা কঠিন রাস্তাটা পার করে এসেছেন, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করেন। তাঁদের একটু পেছনেই ভাইয়াকে দেখলাম ছোট বাচ্চাটাকে স্টেলারে নিয়ে এগিয়ে আসছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভাইয়াকে দেখেই বললাম, হ্যাপি ফাদারস ডে। শুনেই উনি হেসে কুটি কুটি। মানুষটাকে আমি কখনো গম্ভীর মুখে দেখিনি। এই সময়ে এমন মানুষ পাওয়া বিরল ঘটনা। আমরা ঝরনার লুপ থেকে বেরিয়ে মূল লুপে প্রবেশ করলাম। মূল লুপটা আরও বেশি সুন্দর। এখানে খাড়া রাস্তা নেই। উপরন্তু প্রায় পুরো রাস্তাই পাটাতনের, তাই হাঁটা সহজ। আর বাড়তি আনন্দের উপকরণ হিসেবে আছে দুটো ঝুলন্ত সেতু। পায়ের নিচ দিয়ে কাকচক্ষু জলের ঝরনা বয়ে চলেছে কুলকুল শব্দে আর মাথার ওপর সবুজের বেষ্টনী। সে এক অতিপ্রাকৃতিক অনুভূতি!

আগেই বলেছিলাম, এখানে পাহাড়ের গায়ের পাথরগুলো পর্যন্ত সবুজ। পাথরের গায়েও একধরনের সবুজ শ্যাওলা জন্মে সেগুলোকে সবুজ করে ফেলেছে। তাহিয়াকে সেতুগুলোর ওপর দাঁড় করিয়ে ছবি তুললাম। রায়ান তো দৌড়ে দৌড়ে সেতুগুলো পার হচ্ছিল। একটা সেতুর ওপর এসে দোল দিয়ে আবার আমাদের ভয়ও দেখানোর চেষ্টা করল। সেতুর ওপর থেকে নিচে ঝরনার কাকচক্ষু জল দেখে তাহিয়া বলল, বাবা, আমি এত পরিষ্কার পানি এর আগে দেখিনি। সেদিকে তাকিয়ে আমাকেও স্বীকার করতে হলো, আসলেই পানি অনেক পরিষ্কার। একেবারে তলা পর্যন্ত দেখা যায়।

default-image

এভাবেই একসময় আমাদের হাঁটা শেষ হলো। ফিরে এসে প্রসাধনকক্ষে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আমরা একটু খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। এবার ফেরার পালা। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, আরও কিছুক্ষণ থাকতে পারলে ভালো হতো। আসলে এসব জায়গায় হাঁটার চেয়ে দৃশ্য উপভোগ করাটাই জরুরি। আর আপনি যত বেশি দৃশ্য উপভোগ করবেন, তত বেশি এ জায়গার প্রেমে পড়ে যাবেন।

এখানে কিছু কথা বলে রাখা জরুরি। এ জায়গাতে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক নেই। তাই সেটা পরিবার–পরিজনকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখা ভালো। শীত ছাড়া বছরের যেকোনো সময় এখানে এলে পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। আপনিও চাইলে নাগরিক কোলাহল থেকে একেবারে প্রকৃতির সুনিবিড় কোলে একটা দিন পার করে আসতে পারবেন। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, আপনি প্রকৃতিপ্রেমী না হলেও সবুজের এই স্পর্শ আপনার ভালো লাগবেই। একটা দিনের জন্য হলেও আপনি নাগরিক ক্লান্তি থেকে অনেক দূরে চলে যাবেন। আপনার বারবারই মনে হবে, জীবনটা এমন সহজ হলেও পারত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন