পুলাউ উবিন দ্বীপ
পুলাউ উবিন দ্বীপছবি: লেখক

সে অনেক দিন আগের কথা। সিঙ্গাপুরের মূলভূমি থেকে একটি হাতি, একটি শূকরছানা আর ব্যাঙ যাত্রা শুরু করে। একজন আরেকজনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। কে সাঁতরে আগে পৌঁছাতে পারবে মালয়েশিয়ার সাগরঘেঁষা শহর জোহরবারু। সাঁতরে সাঁতরে এগোতে থাকে তারা। একসময় খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে হাতি ও শূকরছানা। ডুবে যেতে থাকে অথই সাগরে। এত দীর্ঘ লোনা পানির পথ সাঁতরে পার হওয়ার প্রতিযোগিতার বুদ্ধিটা তাদের ভালো ছিল না, বুঝতে পারে। তবে উভচর বন্ধু ব্যাঙ এগিয়ে এল। নিজের জীবন বিসর্জন দিল। রূপান্তরিত হলো একটি সবুজ সুন্দর দ্বীপে। আর এই দ্বীপটিতেই অবস্থান করতে থাকে বন্ধু হাতি এবং শূকরছানা। তবে তারা কখনোই ভুলতে পারে না বন্ধুর আত্মবিসর্জনের স্মৃতি। ধীরে ধীরে এই দ্বীপে বাসা বাঁধে কিছু মানুষ। তারাও তাদের মতো সাঁতরে আর পৌঁছাতে পারেনি জোহরবারু।

বিজ্ঞাপন

এ সবই রূপকথা। সিঙ্গাপুরের দক্ষিণ–পূর্বের সৌন্দর্যের এক অপরূপ ভূমি পুলাউ উবিন দ্বীপ। সেখানে আমাদের বহুজাতিক সাংবাদিক দলে রয়েছেন ভারতের মুম্বাইয়ের চৈতন্য মারপোকোয়ার, থাইল্যান্ডের কানালাওয়াই ওয়াক্লেয়াহং, চীনের সোফিয়া হুয়াং ও ইন্দোনেশিয়ার দামার হারসানতো।

default-image

প্রকৃতিকে বন্ধু করে কীভাবে আধুনিক ইট–পাথরের শহর গড়ে তোলায় যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সিঙ্গাপুর। যেখানে সরকার এখন প্রতিটি বাড়িকেই একটি বাগান হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে ভূমির বৈচিত্র্য খুব বেশি চোখে পড়বে না। তবে যেটুকু আছে, তার যে ষোলো আনা উশুল করছে দেশটি, তা বোঝা যায় পুলাউ উবিন বা উবিন দ্বীপে গেলেই।

গন্তব্য পুলাউ উবিন

চাঙ্গি এয়ারপোর্টের পেছনেই চাঙ্গি পয়েন্ট ফেরিঘাট। এখান থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যেতে হয় উবিন দ্বীপে। ১২ জন হলেই শুধু একটি নৌকা ছাড়ে আর মানুষপ্রতি গুনতে হয় তিন ডলার বা ২১০ টাকা করে। আর মূল ভূখণ্ড থেকে সাইকেল নিয়ে যেতে হলে গুনতে হয় আরও ২ ডলার বাড়তি।

default-image

পুলাউ উবিন দ্বীপে হইহুল্লোড়ের সুযোগ নেই। বরং যারা নিরিবিলি প্রকৃতিকে উপভোগ করে একটি শান্ত দিন কাটাতে চায়, তাদের জন্যই এই দ্বীপ ভ্রমণ। সিঙ্গাপুরে এখন আর কাম্পুং বা গ্রাম নেই। যে দুটি কাম্পুং রয়েছে, সেগুলোতে রয়েছে অল্প কিছু ঘর। যেখানে বিদেশিরা গত শতাব্দীর ষাটের দশকের সিঙ্গাপুর দেখতে কেমন ছিল, সেটা দেখতে যায়। মূল ভূখণ্ডের বাইরে এই দ্বীপে এখনো একটি কাম্পুং রয়েছে। আর দশ বর্গকিলোমিটারের পুরো দ্বীপের জনসংখ্যা এক শর বেশি নয়।

বিজ্ঞাপন

কর্মদিবস হওয়ায় আমাদের নৌকাটিতে পারাপারের যাত্রীসংখ্যা ১২ হতে কিছুটা সময় লেগে গেল। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকি আমরা। বেশ রোদ পড়েছে আজ। তবে সিঙ্গাপুরের আবহাওয়াকে বিশ্বাস নেই! এই রোদ, তো এই মেঘ আর বৃষ্টি।

ইঞ্জিনচালিত নৌকায় বেশি সময় লাগল না। চাঙ্গি ফেরি টার্মিনাল থেকেই গ্রানাইটের দ্বীপটি দেখা যায়। থাইল্যান্ডের কানালাউই এবং চীনের সোফিয়া লাইফ জ্যাকেট পরে শক্ত হয়ে বসে আছেন। পানিভীতি রয়েছে তাঁদের। নৌকায় পর্যটক ছাড়াও তিনজন স্থানীয় রয়েছেন। তাঁদের হাতে দৈনন্দিন জিনিসপত্রের বাজারের ব্যাগ দেখে বোঝা গেল হয়তো সদাই করতে বাতিতে গিয়েছিলেন।

সাগরে ঢেউ আছড়ে মিনিট পনেরোর মধ্যেই উবিন ঘাটে ভিড়ে ইঞ্জিনের আধুনিক নৌকাটি। ছোট ফেরিঘাট। স্তূপীকৃত কিছু গ্রানাইটের ওপরে তৈরি করা হয়েছে ঘাট। সেখানে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন চাঙ্গি পারে পৌঁছানোর জন্য। কাঠের পাটাতন পাড়িয়ে মূল দ্বীপে প্রবেশ করলাম আমরা। একটি কাঠের ফটক বানিয়ে সেখানে বড় করে লেখা রয়েছে, ‘ওয়েলকাম টু পুলাউ উবিন আইল্যান্ড’।

উবিন দ্বীপের সাতকাহন

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এই সাগরপারের দেশগুলোতে সব সময় গরম আবহাওয়া। তবে এই দ্বীপে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে যেন শীতল এক পরশ বইয়ে দিয়ে গেল সাগরের হাওয়া। মনে হলো সাগরের গরম হাওয়া এই দ্বীপের লতাপাতা–গুল্মের ছোঁয়ায় ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। আমাদের পাঁচজনের দলটি অনেক দিন পর এই ঠান্ডা পরিবেশ খুঁজে পেলাম। সিঙ্গাপুর শহরের যান্ত্রিকতা যেন আমাদের বিষিয়ে তুলেছিল!

default-image

ঘাটের গেট পেরিয়ে হাতের বাঁয়ে মোড় ঘুরতেই কয়েকটি দোকান। তবে সাইকেল ভাড়া নেওয়ার দোকানটি ছাড়া আর সব কটিই বন্ধ রয়েছে। তিন ডলারেই ভাড়া পাওয়া যায় সাইকেল তিন ঘণ্টার জন্য। এই সময়টাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। সাইক্লিং করে জেটি ধরে এগিয়ে যাব পূর্বে। সেখানেই জেজাউই অবজারভেশন টাওয়ার। সেখান থেকে পুরো দ্বীপ এবং সিঙ্গাপুরের মূল ভূখণ্ড দেখা যায়।

সাইকেলের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে আমরা প্যাডেলে পা চালালাম। ঠিক হলো সবার সামনে থাকবে চৈতন্য এবং সবার শেষে আমি। যেন কেউ দলছাড়া না হয়ে পড়েন। সবুজে ঘেরা দ্বীপটিতে সাগরপাড়ে গ্রানাইট পাথরের ওপর যেন আছড়ে পড়ে সবুজ ঢেউ। সাগরের পাড় ধরে, আবার কখনো পাখির কলকাকলিতে জঙ্গলের মাঝের সরু পথ ধরে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যাই আমরা।

রংবেরঙের পাখি ছাড়াও এই দ্বীপটি গ্রানাইটের জন্য বিখ্যাত। একসময় এই দ্বীপ থেকে গ্রানাইট উত্তোলন করা হতো। ১৯০১ সালে এই দ্বীপটি আবিষ্কৃত হয়। তবে মানুষের বসবাস ১৯৬০ থেকে। এখন আর গ্রানাইট উত্তোলন হয় না। পথে চোখে পড়ে কয়েকটি দোকান। অবশ্য সেগুলোতে ডাব, পানি বা কিছু স্ন্যাকস ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। এখানকার স্থানীয় লোকজন ঘরের বারান্দাকে দোকান বা রেস্টুরেন্ট বানিয়েছেন। বারান্দায় এই অল্প কিছু পণ্য নিয়েই অলস সময় কাটাচ্ছেন এখানকার মানুষগুলো। এভাবেই এখানকার পর্যটনকে গোছানো হয়েছে। বাড়তি কোনো রেস্টুরেন্ট বসানো হয়নি। আমাদের দেখে হাত নাড়িয়ে সাইকেল থামাতে বললেন একজন বৃদ্ধা। বয়সের ভারে চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে নিয়াং সাইর।

default-image

আমাদের থামিয়ে জানতে চাইলেন, সঙ্গে পানি এনেছি কি না? উত্তরে না বলাতে অবশ্যই যেন এখানকার ট্যাপের পানি পরিহার করি এবং দোকান থেকে পানি কিনি, সেই উপদেশ দিলেন। দামারও সঙ্গে সঙ্গে সায় জানালেন। বলল, ‘আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। কারণ, এই দ্বীপের পানি বিশুদ্ধ নয় ইন্টারনেটের রিভিউতে পড়েছিলাম। তাই সঙ্গে করে পানি আনাটা প্রয়োজন ছিল। যেহেতু আনিনি, তাই এই বৃদ্ধার দোকান থেকে কিনতে কোনো আপত্তি নেই।’

নিয়াং সাই জানালেন, অর্ডার দিলে তিনি দুপুরের খাবারও বানিয়ে রাখবেন আমাদের জন্য। আমরা ট্র্যাকিং শেষে উপভোগ করতে পারি তার খাবার। তবে সোফিয়া ছাড়া পুরোপুরি চায়নিজ খাবারে আমরা কেউই অভ্যস্ত নই। তাই বিনয়ের সঙ্গে না জানিয়ে আবার প্যাডেল চাপলাম।

বিজ্ঞাপন

প্রায় আধ ঘণ্টা টানা সাইক্লিং শেষে দেখি সামনে আর পথ নেই। যেন পথ হারিয়ে ফেললাম। গুগলের ম্যাপে তাকিয়ে এবার ‘হায়!’ বলে উঠল চৈতন্য। জানাল, আমরা ভুল পথে চলে এসেছি। এই পথ দিয়ে টাওয়ারে যাওয়া যাবে না। কিছুটা ক্লান্ত হয়ে উঠেছি আমরা। প্রতি কিলোমিটার পরপর দ্বীপের একটি মানচিত্র টানিয়ে রাখা হয়েছে পর্যটকদের সুবিধার জন্য। যেন তাঁরা বুঝতে পারেন কোথায় রয়েছেন।

default-image

আমরা যখন ম্যাপ দেখে পরবর্তী করণীয় স্থির করতে ব্যস্ত, বিন্দুমাত্র আভাস না দিয়েই শুরু হয়ে গেল ঝুম বৃষ্টি। যারপরনাই দ্রুত সাইকেল নিয়ে ছুটলাম আমরা। আমাদের সঙ্গে ছুটে চলল এখানকার দুটি কুকুরও। প্রায় ১০০ মিটার দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটি মন্দির চোখে পড়ল। ভেতর থেকে ধূপকাঠির সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টিতে আশ্রয় নিলাম আমরা মন্দিরের ছাউনিতে। এই দ্বীপ অনেকেই দল বেঁধে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। এমন একটি দল আমাদের পাশে এসে আশ্রয় নিল। তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং গুগল ম্যাপ ঘেঁটে আমরা আবিষ্কার করলাম, প্রথম থেকেই আমরা ভুল পথে রয়েছি। দ্বীপের পূর্ব প্রান্তের বদলে পশ্চিম প্রান্তের দিকে রওনা করেছিলাম।

default-image

বৃষ্টি থামার যেন কোনো লক্ষণ নেই। এ ধরনের বৃষ্টিতে মুম্বাইয়ের মানুষ যেমন ভিজতে পছন্দ করেন, তেমনি ঢাকার বাসিন্দারাও। আমি এবং চৈতন্য ঠিক করলাম বৃষ্টিতেই দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করব। কিন্তু পকেটের মোবাইল এবং মানিব্যাগ কীভাবে রক্ষা করব বৃষ্টি থেকে! মন্দিরের বাইরের ছাউনি থেকে ভেতরে তাকাতেই বিভ্রমে পড়লাম আমরা। আমরা ভেবেছিলাম, যদি এখানে কিছু পলিথিন–জাতীয় ব্যাগ পাওয়া যায়, তবে মোবাইলগুলো রক্ষা করা যাবে। তবে এটা তো মন্দির নয়, বরং মাজার। তা–ও এক জার্মান কন্যার! একটি বোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘জার্মান গার্ল স্রাইন।’

ঠিক যেভাবে বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে বুদ্ধের মূর্তি রাখা হয়, সেভাবে এখানে রয়েছে পশ্চিমা এক কন্যার মূর্তি। যেখানে পুণ্যার্থীরা নেলপলিশ, লিপস্টিক, পুতুল দিয়ে যাচ্ছে আর তাদের ইচ্ছেগুলো মানত করে যাচ্ছে!

দেয়ালে লেখা তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান একটি পরিবার এই দ্বীপে লুকিয়ে আশ্রয় নেয়। ব্রিটিশ সৈনিকেরা প্রথমে পরিবারটিকে খুঁজে পেলেও কন্যাটি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে দ্বীপের তীরে এসে ধরা পড়ে সে এবং ব্রিটিশ সৈনিকেরা তাকে পুড়িয়ে মারে।

default-image

সেই ফুটফুটে জার্মান কন্যার একটি মুখ যেন ভেসে আসছে মনে। এখানে রাখা পুতুলগুলোর মতোই গোলাপি রঙের স্কার্ট পরে বনের মাঝে খেলে বেড়াত। নিরাপদ ভেবেছিল এই উবিন দ্বীপকে। কেমন যেন হু হু করে ওঠে ভেতরটা। এখান থেকে একটি পলিথিন ব্যাগে মোবাইল আর মানিব্যাগ নিয়ে আমি আর চৈতন্য বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাঁটতে থাকলাম। ভিজতে থাকি আমরা।

মাজারের পেছনের ঝোপগুলো সরাতেই চোখে পড়ল বিস্তৃত সমুদ্র। আমরা দ্বীপের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। তবে ফান তুয়াং মন্দির বা ওয়াচ টাওয়ারের জন্য আমাদের পূর্ব প্রান্তে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।

বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ছে সাগরে। এখানে কোনো তীর নেই। ঝোপের পরেই পুকুরপাড়ের মতোই শুরু হয়ে গেছে সাগর। একটি বেতগাছের পাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে বুলবুলি পাখি আর পানির ওপরে একটি গাছের ডালে শিকারি দৃষ্টি রঙিন একটি মাছরাঙার। সাগরের পানিতে বৃষ্টির রুপালি ফোঁটা নৃত্যের তাল তোলে ঝরে চলেছে। বৃষ্টি থামলে রওনা করি ফেরি টার্মিনালের দিকে। আজ খুব ক্লান্ত লাগছে। পূর্ব প্রান্তে যেতে আবারও আসতে হবে এই রহস্যঘেরা পুলাউ উবিন দ্বীপে— যেখানে আরও রয়েছে ম্যানগ্রোভ জলাভূমি।

লেখক: সাংবাদিক

মন্তব্য করুন