গুয়াট দুর্গ, সান মেরিনো
গুয়াট দুর্গ, সান মেরিনোছবি: উইকিপিডিয়া

বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন পথটিতে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়াই। সেখানে বেশ কিছু সুভেনির শপ। বাইরের দিকে টাঙিয়ে রাখা ঝিনুকের মালার স্তূপের পেছনে দোকানের পেছনভাগ। সেই মালাগুলো সরিয়ে একটি দোকানে ঢুকতে গিয়ে দেখি, দরজার কাছটায় চেয়ার পেতে বসে আছেন একজন। চেহারা দেখেই আন্দাজ করা যায় দেশি ভাই। বাঁ হাতে প্লাস্টার। সেই হাত গলার সঙ্গে গজ–ব্যান্ডেজ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা। ভেতরে অন্যজন সকালের প্রারম্ভিক ঝাড়পোঁছে ব্যস্ত।

default-image

আমাকে দেখে বললেন, ‘আসুন, ভেতরে আসুন।’ ইনি নাকি এই দোকানের মালিক! ইতালিতে এসেছেন প্রায় ১৭ বছর আগে। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান হয়ে তুরস্কের দালালের মাধ্যমে চোরাই পথে উপস্থিত হয়েছিলেন এ দেশে। তাঁর কাছে জানলাম, গ্রীষ্মের সময়টায় এ শহরের নীল সাগরের টানে সারা ইতালি থেকে লোকেরা ছুটে আসেন। তখন ব্যবসা রমরমা। কিন্তু বাকি সময়টায় ব্যবসার গতি কিছুটা মন্থর।

আর কটা দিন পরই ট্যুরিস্ট সিজন শুরু হয়ে যাবে বলে দরজার কাছের লোকটিকে তিনি সাহায্যকারী হিসেবে ভিন্ন এক শহর থেকে ডেকে এনেছেন। তিনি ইতালিতে এসেছেন দুই বছর আগে। এখনো ভাসমান। যখন যেখানে কাজের ডাক পান, সেখানেই ছুটে যান। কে জানে, এভাবেই হয়তো তিনিও একদিন এমন একটি দোকানের মালিক হয়ে বসবেন। কিংবা হয়তো ভাসতেই থাকবেন।

বিজ্ঞাপন

ইতালিতে গত দু–তিন বছরে এমন বহু মানুষ ঢুকে পড়েছে। ২০১৫-১৬ সালের দিকে সিরিয়ান শরণার্থী সংকট শুরু হলে সেই স্রোতে এঁরাও ডিঙিতে চড়ে ইতালিতে এসে পৌঁছান, যদিও বাংলাদেশিরা মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের মতো যুদ্ধতাড়িত নন। রোমে এখন গিজগিজে বাংলাদেশি। সেন্ট্রাল রেলস্টেশনের আশপাশে হাঁটলে কয়েক গজ অন্তর অন্তর একজন বাংলাদেশি হকারের দেখা মেলে। অনেকটাই যেন ঢাকার গুলিস্তানের মতো অবস্থা। সিগারেট লাইটার, ছাতা, মোবাইল চার্জার, মিনারেল ওয়াটারের বোতল, সেলফিস্টিক—এমন কয়েকটি দ্রব্য এঁরা মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে এনে সারা দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে বিক্রির চেষ্টা করেন। একেবারেই মানবেতর জীবন।

২০১৫-১৬ সালের দিকে সিরিয়ান শরণার্থী সংকট শুরু হলে সেই স্রোতে এঁরাও ডিঙিতে চড়ে ইতালিতে এসে পৌঁছান, যদিও বাংলাদেশিরা মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের মতো যুদ্ধতাড়িত নন। রোমে এখন গিজগিজে বাংলাদেশি। সেন্ট্রাল রেলস্টেশনের আশপাশে হাঁটলে কয়েক গজ অন্তর অন্তর একজন বাংলাদেশি হকারের দেখা মেলে।

শুধু বাংলাদেশিরাই নন, ইতালিতে এসেছেন বিপুলসংখ্যক আফ্রিকানও। শুরুতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও এখন তারা বেশ দূরে সরে গেছে। ফলে ইতালিকে পুরো ব্যাপারটা একাই সামাল দিতে হচ্ছে। এতে ওদের দেশেও বাড়ছে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, বাড়ছে ডানপন্থী রাজনীতির শক্তি।

আমি সেই দোকানে আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার বাইরের রোদে এসে দাঁড়াই। ততক্ষণে বাস ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে।

নানা পাহাড়ি উপত্যকার মাঝ দিয়ে ছুটে চলে ধবধবে সাদা রঙের বাসটি। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গ্রাম, পাহাড়ের ঢালে দু–একটি বাড়ি। এই ছুটে চলার সময়ে খেয়াল করি, সমতল ছেড়ে বাসটি যখন পাহাড়ের পথ ধরতেই একগুচ্ছ কালো মেঘ যেন বাসটির অনুগামী হয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, ওদেরকে ফাঁকি দিয়ে বাসটি বুঝি ঠিকই পৌঁছে যাবে সান মেরিনোতে। ভুল ভেবেছি। সান মেরিনোর টিটন পাহাড়ের পাদদেশে যখন বাসটি থামে, তখন সেই কালো মেঘগুলোই এক পশলা বৃষ্টিকে স্বাগত জানিয়ে টেনে এনেছে।

default-image

মাত্র ৬১ বর্গ কিলোমিটারের দেশ সান মেরিনো। পুরাকথার মতে, এককালে মেরিনো নামে এক প্রস্তরশিল্পী ক্রোয়েশিয়া অঞ্চল থেকে এখানে এসে থিতু হন। এখানকার এই টিটন পাহাড়ে আস্তানা স্থাপন করে তিনি এমন সব খেল দেখানো শুরু করেন যে ভক্তিবাদী লোকেরা তাঁকে রীতিমতো সাধুর পদে আসীন করে দেন। সেই থেকে তিনিই এই গোটা অঞ্চলের ত্রাণকর্তা, পয়মন্ত যোগী পুরুষ। তিনি বিলীন হলেও তাঁর নামটি বিলীন হয়নি। লোকে বিলীন হতে দেননি। তাঁর প্রয়াণের পর লোকে ধীরে ধীরে এ অঞ্চলকে ডাকা শুরু করেন সাধু মেরিনোর নগর বলে। সেই থেকেই কালক্রমে এই সাধু মেরিনো বা সান মেরিনো নামের দেশটির উদ্ভব।

বিজ্ঞাপন

শুরুতে পোপের অদৃশ্য ছায়াতলে এর শাসনব্যবস্থা থাকলেও ক্রমেই রাজ কিংবা ধর্মীর প্রভাবের বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রমনা আর স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠে এই ছোট্ট দেশটির জনতা। এই যে গণতন্ত্র, এ ব্যাপারে একটি চমকপ্রদ ব্যাপার জড়িয়ে আছে দেশটিকে নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে। কোন কোন দেশ গণতন্ত্র আর কোন কোন দেশ সমাজতন্ত্রের পতাকাতলে আসবে, সেই নিয়ে মিত্রশক্তি আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে শুরু হয়ে গেছে স্নায়ুযুদ্ধ। রোমানিয়া, পোল্যান্ডের মতো পুবের দেশগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নানাভাবে অন্যায় প্রভাব আর জুলুম খাটিয়ে নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দিয়েছে। গ্রিস আর ইতালিতেও তারা তেমনটাই চাইছিল। যদিও ইঙ্গ-মার্কিন প্রতিরোধের মুখে সে প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি।

এমনই একটা সময়ে অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেল এই সান মেরিনোতে। অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে এ দেশে ক্ষমতায় এল সমাজতান্ত্রিক দল। কোনো সামরিক অভ্যুত্থান নয়, সশস্ত্র বিপ্লব নয়, বহিঃশক্তির প্ররোচনায় নয়, বরং এখানকার ক্ষুদ্র জনপদ স্বেচ্ছায় ভোট দিয়ে স্বাগত জানাল বামপন্থীদের। বিশ্বে সেই প্রথম এভাবে কোনো দেশে গণতান্ত্রিক পন্থায় বামপন্থীদের ক্ষমতা গ্রহণ।

default-image

টুপটাপ বৃষ্টির মধ্যেই আমি পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠি। এই যে টিটন পাহাড়, একে চারদিকে মুড়ে নিয়েই কিন্তু দেশটির রাজধানী। আকারে হয়তো সেটি ঢাকা শহরের কোনো পাড়ার সমান হবে। গ্রানাইট পাথরের আস্তর দিয়ে পাহাড়ের গাত্রকে আচ্ছাদন করে সেখানে গড়া হয়েছে দুর্গ, বাসস্থান, সংসদ ভবন আর কিছু দরকারি সরকারি স্থাপনা। আর হ্যাঁ, সেসবের সঙ্গে অবশ্যই আছে অজস্র মনিহারি দোকান। সেখানে বিক্রি হচ্ছে পিস্তাচিও মেশানো লেমোনেড, নানা পদের বিয়ার, ম্যাগনেট, সান মেরিনোর মুদ্রা, ডাকটিকিট—এমনই আরও নানা রকম দ্রব্য।

যদিও বললাম সান মেরিনোর মুদ্রা, তার মানে কিন্তু এই নয় যে এদের নিজস্ব মুদ্রা আছে। বরং এরাও সেই অভিন্ন ইউরোরই অন্তর্ভুক্ত। ইউরোর মুদ্রার ওপর সাধারণত সদস্য দেশগুলোর কোনো না-কোনোটির নাম ঘুরেফিরে থাকে। তারপর সেগুলো সীমান্তহীন হয়ে ভাসতে থাকে। সে কারণেই দেখা যায়, স্পেনে গিয়ে হয়তো এক ইউরোর কয়েকটি কয়েন হাতে এল, যার একটির ওপর লেখা গ্রিস অন্যটির ওপর লেখা ইতালি। তবে ছোট দেশগুলোর নামাঙ্কিত ইউরোর মুদ্রা খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। এই যেমন, ভ্যাটিকান, সান মেরিনো কিংবা এনডরার নামে কোনো ইউরোর মুদ্রা চোখে পড়েই না বলা চলে। আর সে কারণেই এখানকার এই সুভেনিরের দোকানগুলো ‘সান মেরিনো’ লেখা এক ইউরোর কয়েন বিক্রি করছে আড়াই ইউরো দরে। লোকে অবশ্য সেটা মেনে নিয়েই তুমুলভাবে কিনছে। দোকানি বিক্রি করে কুলোতে পারছেন না।

default-image

বেচাবিক্রির এই তুমুল আলোড়নের মধ্যেই একদিকে নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে আছে এখানকার ট্যুরিস্ট বিভাগের অফিস। দেশটির আয়ের সিংহভাগই যেহেতু আসে পর্যটন খাত থেকে, তাই এ অফিসে শহরের ম্যাপ বেচেও পয়সা কামানোর সুব্যবস্থা। আমি অবশ্য সেখানে গেলাম ম্যাপ কিনতে নয়। মাত্র কয়েক কিলোমিটারের শহর, সেখানে তো চাইলেও নিজেকে হারানো সম্ভব নয়। সেখানে গেলাম বরং পাসপোর্টে একটি সিল লাগানোর জন্য। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হওয়ার পর সেই কবেই তো সীমান্তে পাসপোর্ট, ভিসা, সিল এসবের পাট চুকে গেছে। তবে আগ্রহী কোনো ট্যুরিস্ট যদি নেহাতই সান মেরিনোর স্মৃতি নিজের পাসপোর্টে বহন করতে চান, তাহলে এরা তার বন্দোবস্ত করে দেয়। যদিও ব্যাপারটিও মুফতে নয়, এর জন্য গুনতে হয় কড়কড়ে পাঁচ ইউরো।

ট্যুরিস্ট অফিসের পরেই একটি ছোট্ট বাঁধানো চত্বর। এক পাশে লম্বাটে একটি ভবন। ওটাই নাকি এদের সংসদ ভবন। নিরাপত্তার তেমন কোনো বালাই নেই। শুধু দুজন সবুজ রঙের উর্দি পরা সান্ত্রী অলস ভঙ্গিমায় নিচের সদর দরজায় প্রহরারত। তাঁদের অগ্রাহ্য করে ভেতরের হলঘরটিতে ঢুকে কয়েক ইউরো দিয়ে টিকিট কিনলেই ওপরের সভাস্থল ঘুরে আসা যায়। তবে অধিবেশন চলাকালে সেটি সম্ভব নয়। আজ অবশ্য সে বিড়ম্বনা নেই। সংসদ ভবন তাই অনেকটাই সুনসান।

default-image

মার্বেল পাথরে গড়া সিঁড়ি ভেঙে ওপরে পৌঁছে দেখি, পুরো তলে আমিই একমাত্র দর্শনার্থী। সভাস্থলটি মাঝারি মাপের একটি ঘর। মূল দরজার নিচ দিয়ে সেখানে ঢুকতে প্রথমেই দৃষ্টি কেড়ে নেয় উল্টো দিকের দেয়ালের পুরোটা জুড়ে আঁকা একটি ফ্রেসকো। একেবারে মাঝের স্থানটিতে সাধু মেরিনো ধরাধাম থেকে বিদায়ের মুহূর্তে ভক্তকুলকে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান। তাঁর ডান দিকে রাজন্যবর্গ। আর বাঁ দিকে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। আর পেছনটায় টিটন পাহাড়ের ধূপছায়া।

এই যে টিটন পাহাড়, যাকে নিয়ে এই রাজধানী শহর, তার একেবারে চূড়াতে আছে এক দুর্গ। বেলে পাথরে গড়া সেই দুর্গের শিখরে পতপত করে ওড়া একটি পতাকা বহু দূর থেকে নজরে আসে। এবারে আমি সেই দিকে চলি। দুই পাশে পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা সরু কিছু পথ অতিক্রম করতে হয়। সে পথের এখানে-ওখানে ভুস করে জেগে ওঠে সাইপ্রেসগাছের সুচালো শিখর। আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য সেখানে দাঁড়াই।

বিজ্ঞাপন

দেয়ালে কোমর ঠেকিয়ে নিচের দিকে তাকাতে গিয়ে মাথাটা একেবারে চক্কর দিয়ে ওঠে। দেখা যায়, বহু নিচে কুয়াশার স্তরের অন্তরালে মন্থর গতিতে ভেসে যাচ্ছে কয়েকটি পাখি। চোখ আরেকটু ধাতস্থ হওয়ার পর বুঝতে পারি, ওগুলো পাখি নয়। বরং বহু নিচের সমতল জমিনে ধীরে ধীরে ছুটে চলেছে কয়েকটি যান্ত্রিক যান!

আশপাশে ভাসতে থাকা কুয়াশার দলটি একপর্যায়ে আমাকেও যেন গিলে খায়। আমার এই পথের শেষ প্রান্তে থাকা একটি ল্যাম্পপোস্টের বাতি জ্বলার জায়গাটি ছাড়া এই চরাচরের আর কিছু তখন দৃষ্টিসীমায় ধরা দেয় না। হঠাৎ মনে হয়, এখান থেকে ওই নিচের জমিনের দিকে লাফ দিলে কেমন হয়? তারপর মনে হয়, এই ভাবনা আমার মাঝে এল কেন? এটা কি বহু ওপরের কোনো স্থান থেকে নিচের সমতল ভূমির অপার রূপ দেখে নিজেকে বিলীন করার অভিপ্রায়? কিন্তু কই, প্লেনের জানালা দিয়ে যখন নিচের দিকে তাকাই, তখন তো এই বোধটা জাগে না! তাহলে হয়তো শুধু উচ্চতাই মুখ্য ব্যাপার নয়, পারিপার্শ্বিকতা আর স্থিতি জড়তার কোনো ব্যাপারও এমন ইচ্ছার পেছনে নিয়ামক হয়ে থাকতে পারে।

default-image

নিজের মনকে এমন অলক্ষণে ভাবনার গণ্ডিতে খুব বেশি প্রশ্রয় দেওয়ার আগেই হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামে। এ পথে হাঁটার সময়েই দেখেছিলাম, খুব কাছেই পাহাড়ের ঢালে এক ছোট ক্যাফে আছে। গরমাগরম পিৎজার সঙ্গে চা–কফি পাওয়া যায়। সেখানে ঢুকলে হয়তো আশ্রয় যেমন মিলবে, তেমনি মধ্যাহ্নে উদরপূর্তির বন্দোবস্তও হয়তো একটা হবে।

ক্যাফের পেছন দিকটায় পাতলা কাচের দেয়াল। পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে সেই দেয়াল দূরাগত হাওয়াকে ঠেকিয়ে দেয়। রাস্তার দিকটা খোলা। তবে এখন বৃষ্টির ঝাপটা থেকে ভেতর ভাগকে রক্ষা করার জন্য সেখানে পাতলা প্লাস্টিকের স্বচ্ছ পর্দা টানানো হয়েছে। ক্যাফের একদিকের উনুনে বেক করা হচ্ছে দু–তিন পদের পিৎজা। আমি তেমনই একটি পিৎজার অর্ডার দিয়ে সেই কাচের দেয়ালঘেঁষা একটি ছোট্ট টেবিলে গিয়ে বসি। দেয়ালটি ততক্ষণে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় ঝাপসাপ্রায়। সে কারণে দূরের সবুজ পাহাড় কিংবা তাকে ছাপিয়ে দিগন্তের কাছে ঘাপটি মেরে থাকা কালো মেঘের ভেলাকে ক্লদ মনের স্ফীত ব্রাশে আঁকা ল্যান্ডস্কেপ ছবির মতো মনে হয়।

default-image

ছোট এই দোকানের ভেতর তেমন ভিড় নেই। হয়তো এই ঝুম বৃষ্টির জন্যই নেই। আমি ছাড়া পাশের টেবিলে আছে জনা তিনেক মানুষ। বছরখানেক বয়সের শিশুসহ এক দম্পতি, অন্যজন একজন তরুণী। এঁরা কেউই ইতালিয়ান নন। নিজেদের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলছেন, সে কথা কান পেতে শুনে অনুমান করি। তবে সেই শেষোক্ত তরুণীটি খুব সম্ভবত ইতালিতে প্রবাসী। উঠে গিয়ে সে যখন পিৎজার কারিগরকে কিছু একটা নির্দেশ করে, তখন তার জড়তাহীন কণ্ঠে ইতালীয় ভাষা ঝনঝনিয়ে ওঠে।

default-image

এদিকের মেয়েটি উঠে ওদিকে গেলে, সেই দম্পতির কোলে থাকা শিশুটির হাত থেকে একটি মিনারেল ওয়াটারের খালি বোতল হঠাৎ মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যায়। শিশুটির বাবা সেটি দেখেও না দেখার ভান করে পা দিয়ে বোতলটিকে ভিন্ন দিকে ঠেলে দেয়। এই আচরণ আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকে। পশ্চিম ইউরোপের গড়পড়তা লোকেরা এমন আচরণ করে না। ওদিকে এদের গাত্রবর্ণ আর ভাষা শুনে মনে হচ্ছে, এরা আশপাশের কোনো দেশের লোক। আমার মনে কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়।

এরই মধ্যে সেই তরুণী মেয়েটি ফিরে এসেছে। পরিধেয় বস্ত্র আর সাজসজ্জার দিক দিয়ে মেয়েটির সঙ্গে এই দম্পতির সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। ওর মুখে চড়া মেকআপ আর ঊর্ধ্বাঙ্গে লাল টুকটুকে স্কিনটাইট টপস। অন্যদিকে সেই দম্পতির পোশাক মলিন, কুঁচকে যাওয়া। লোকটির মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি আর মেয়েটির মাথায় জটা পাকানো সোনালি চুল। এই তিনজনের মধ্যে সেই পরিপাটি সজ্জার মেয়েটির কিছুটা ইংরেজি জানার সম্ভাবনা মাথায় রেখে আমি তার সঙ্গে আলাপে উদ্যত হই।

default-image

‘ডিড ইউ অলসো অর্ডার এ মাশরুম পিৎজা লাইক মি?’ ওদের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্নটি ছুড়ে দিই। ‘নো, উই অর্ডারড পেপারনি পিৎজা।’ আমার ধারণা সঠিক। সেই তরুণী বেশ ভালোই ইংরেজি জানে। তার সঙ্গে আলাপ জমে উঠতে তাই দেরি হয় না। জানতে পারি, এই যে দম্পতি, এরা আসলে তার গ্রাম সম্পর্কের ভাইবোন। তিনজনেই রোমানিয়ার মানুষ। মেয়েটির নাম আঙ্কা। ইতালিতে এসেছে প্রায় বছর সাতেক আগে। প্রথমে এসেছিল মিলান শহরে। একটা পারলারে কাজ করত। মিলান বড় শহর। সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি। তাই বছর দুয়েক আগে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে এসেছে রিমিনিতে। এখানে নিজের বাড়িতেই ছোট একটা পারলার খুলেছে। নিজের স্বাধীন ব্যবসা। আয়–রোজগার মন্দ নয়। রোমানিয়া থেকে এরা আঙ্কার বাড়িতে বেড়াতে এলে ও এক দিনের জন্য কাজ বন্ধ রেখে ঘুরাতে নিয়ে এসেছে এই সান মেরিনোতে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না তেমন। আজ তো সারা দিনই এমন বৃষ্টি চলবে। ওদিকে কোলের শিশু নিয়ে তো আর ভিজে ভিজে এখানে-ওখানে যাওয়া সম্ভব নয়। কিছুটা তাই বিরক্ত ও। আকাশের ওপর। হয়তো নিজের ওপরও। বারবার বলছিল, শুধু শুধু আজ পারলার বন্ধ রেখে এদের নিয়ে এখানে এলাম।

আমাদের এমন সব নানা আলোচনার মধ্যে সেই শিশুটি কেঁদে ওঠে। ওর মা নিজের আকাশি রঙের শার্টের বোতাম খুলে স্তনদানে উদ্যত হয়। আমি খানিকটা সংকোচবোধে আক্রান্ত হয়ে বৃষ্টির দিকে মুখ ফেরাই।

মন্তব্য পড়ুন 0