মন জয়ী জোতলাং

ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সাঙ্গু নদীর পান্না সবুজ বুক চিরে এগিয়ে চলেছি। দলে আছে রোমেল, আরাফ, আসাদ, মাসুদ আর রিফাত। টানা দুই দিনের সরকারি ছুটি কাজে লাগানো তো বটেই, সেই সঙ্গে মনটাকে চাঙা করতে আমরা চলেছি জোতলাংয়ের উদ্দেশে।

default-image

ভোরে ঢাকা থেকে বান্দরবান পৌঁছানোর পর হালকা নাশতা সেরেছি। নাশতা শেষ করেই চান্দের গাড়িতে থানচির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলাম। চান্দের গাড়িতে সর্পিল পাহাড়ি পথে ওঠা–নামার ফাঁকে চলছিল ছয় বছর আগের স্মৃতিরোমন্থন। সেবার গিয়েছিলাম সাকা হাফং জয় করতে।

বিজ্ঞাপন

কোরাসে সুর মিলিয়ে দ্রুতই পৌঁছে যাই থানচি। পৌঁছেই দেখা হলো প্রিয় লাল পিয়ানদার সঙ্গে। দাদার সঙ্গে পরিচয় প্রায় এক দশকের। দেখা হলেই বরাবরের মতো জড়িয়ে ধরেন। গত ১০ বছরে ১০ বার রেমাক্রি গেছি, প্রতিবারই লাল পিয়ানদার আতিথ্য নিয়েছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আগেই ফোন দিয়ে রেখেছিলাম। তাই আমাদের রিসিভ করতে নিজেই চলে এসেছেন। স্থানীয় ঝুটঝামেলা শেষ করে দাদার সঙ্গে চড়ে বসি তাঁর ইঞ্জিনের নৌকায়।

default-image

সাঙ্গুর সবুজ পানি আর দুই ধারের রহস্যময় উঁচু পাহাড়, অসম্ভব রূপসী তিন্দু, ভয়ংকর বড় পাথর পার হয়ে রেমাক্রি পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা ৩টা ছুঁই ছুঁই। হাতমুখ ধুতে না ধুতেই খাবার তৈরি।

default-image

জুমচাষের চালের ভাত, পাহাড়ি আলুভর্তা আর মোরগের মাংস দিয়ে ভরপেট খেয়ে এক কাপ চা পান করে সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলল। এদিকে বেলা প্রায় বয়ে যায়। আজই আমাদের পৌঁছাতে হবে দলিয়ান পাড়ায়, তাই লাল পিয়ানদা বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন।

রেমাক্রি খালের পানি পেরিয়ে খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে সবার গলদঘর্ম অবস্থা। অনেক দিন ধরেই পাহাড়ে উঠি না, তার ওপর গত কয়েক বছরে ওজনও বেড়েছে বেশ কিছুটা, সেই সঙ্গে ব্যাগের ওজন, সব মিলিয়ে বিশ্রি একটা অবস্থা। এমনিতেই পাহাড়ে প্রথম দিনের ট্রেকিংয়ে বেশ কষ্ট হয়। তার ওপর অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে একটু পরপরই বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল। খাড়া পাহাড়ের মাথায় উঠতেই সুয্যি মামা বিদায় জানাল। গোধূলির ম্লান আলোয় আশপাশের প্রকৃতি ধরা দিচ্ছিল অসম্ভব রূপসী মোহে। মনে হচ্ছিল পাহাড়ের চূড়ার সেই জুম ঘরটাতেই কাটিয়ে দিই জীবনের বাকিটা সময়। ঘোর ভাঙল লাল পিয়ানদার ডাকে, ‘দাদা, ওই দেখেন যোগী হাফং দেখা যায়।’

default-image

সন্ধ্যার সেই আবছা অন্ধকারে তাকিয়ে দেখলাম বহু দূরে দেশের কথিত চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। আমাদের পরিকল্পনা ছিল যোগী হাফং ট্রেক করা, পরে যা পরিবর্তন করে জোতলাং ট্রেক করা হয়, সে গল্প পরে হবে।

default-image

এবার আমাদের পাহাড় বেয়ে নামার পালা। আকাশে শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথির ছোট্ট একফালি চাঁদ। অসম্ভব মায়াময় একটা আবহ। রাতের মধ্যেই পৌঁছাতে হবে দলিয়ান পাড়ায়। পথ এখনো অনেকটা বাকি। লাল পিয়ানদা আমাদের রেখে রাতেই ফিরবেন রেমাক্রি। মাঝে একটা ছোট্ট বিরতি নিয়ে অনেক নাম না জানা পাড়া মাড়িয়ে বেশ কিছু ঝিরির পানিতে পা ভিজিয়ে দলিয়ান পাড়ায় যখন পৌঁছালাম, ততক্ষণে রাত ৮টা বেজে গেছে।

বিজ্ঞাপন

লাল পিয়ানদা এই পাড়ার কারবারি বা হেডম্যান, দাদার ভাইয়ের ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। ব্যবস্থা বলতে বাঁশের মাচার ওপর ঘর, চারদিকে বাঁশের বেড়া। ঘরের দরজা–জানলা সবই বাঁশের। জানুয়ারির তীব্র শীতে স্লিপিং ব্যাগই ভরসা। থাকার এন্তেজাম করে লাল পিয়ানদা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমাদের রাতের খাবারের জোগাড় করতে। এই ফাঁকে আমরা সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে ঝরনার থেকে পাইপ দিয়ে হিম শীতল ঠান্ডা পানিতে গোসল সেরে শরীর জুড়িয়ে নিলাম।

default-image

তারপর দেখি রাতের খাবার হাজির। টিলার ওপর একটা বমপাড়া এটা, বেশ সাজানো–গোছানো। একটা চার্চ আর স্কুলও আছে। সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ২০ ঘর বাসিন্দা নিয়ে এই পাড়া। বাংলা বলতে পারে, তবে তাদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। জুমের চাষ আর ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করে অধিকাংশ মানুষ। পাড়ার বেশ কিছু ছেলেমেয়ে ঢাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করছে। এ সময়ই সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হলো যে আমরা যোগীর পরিবর্তে জোতলাং ট্রেক করব। কারণ, জোতলাং হলো দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

মোরগ ডাকে, ঘুম ভাঙে

default-image

পরদিন ভোর চারটায় ঘুম ভেঙে গেল মোরগের ডাকে। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর এপাশ–ওপাশ করছিলাম, কিছুতেই আর ঘুম আসছিল না। অবশেষে সাড়ে চারটার দিকে উঠে পড়লাম। দলের বাকিরা এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাঁশের দরজা ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিলাম, বাইরে এখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমাদের আশ্রয়দাতা ততক্ষণে উঠে পড়েছেন। ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সকালের নাশতা তৈরিতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দলের বাকিরা একে একে ঘুম থেকে উঠতে লাগল। ফ্রেশ হয়ে সবাই তৈরি হয়ে নিলাম আসন্ন জোতলাং জয়ের উদ্দেশে। সবার চোখে–মুখে উত্তেজনা। খিচুড়ি, ডিম ভাজা আর আলুভর্তা দিয়ে নাশতা সেরে বের হয়ে পড়লাম। লাল পিয়ানদা হাসিমুখে বিদায় জানালেন আর তাঁর ছোট ভাইকে সঙ্গে দিলেন গাইড হিসেবে।

আমাদের দল যখন যাত্রা শুরু করল, ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে সাতটা ছুঁই ছুঁই। প্রথম এক ঘণ্টা পথ তেমন বেগ পেতে হলো না, সামান্য কিছু চড়াই বাদ দিলে পুরো পথটাই সমতল কিংবা উতরাই। পথে বেশ কিছু ছোট ছোট ঝিরি পার হলাম, পথে পড়ছিল নাম না জানা বিভিন্ন বুনো গাছ আর ঘন জঙ্গল। শিশিরস্নাত সকালের মিষ্টি হওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছিল। দেখা মিলল পাহাড়ি গয়ালের, আমরা পথ ছাড়ব কি, আমাদের সম্মানার্থে সে নিজেই পথ ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াল।

default-image

অনেকক্ষণ ধরে পথ চলছি, কিন্তু কোনো জনমানুষের দেখা নেই। চারদিক সুনসান নীরবতা, মাঝেমধ্যে ঝিরির কুলকুল ধ্বনি সুরের ঐকতান সৃষ্টি করছে। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ওয়াই জংশনের ঝিরি পথের মুখে। এখানে এসে পথ দুই ভাগ হয়ে গিয়েছে। আমরা ধরলাম সোজা পথটা।

default-image

ছোট–বড় পাথরের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছড়ানো বোল্ডারের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি ঝিরি, এর পাশ দিয়েই কিংবা কখনো একে অতিক্রম করেই পথ এগিয়েছে। খুব সন্তর্পণে পা ফেলে এগোতে হচ্ছিল। একটু এদিক-ওদিক হলেই পা মচকানোর মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সাবধানতার জন্য গতি শ্লথ হয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো অসম্ভব চড়াই। পাহাড় তার সমস্ত রূপ–মাধুর্য আর ভয় জাগিয়ে নিয়ে আসল রূপে দেখা দিল।

বিজ্ঞাপন

রহস্যের টানে

default-image

পাহাড় আমার কাছে বরাবরই রহস্যময়, কিন্তু দুর্বোধ্য নয় কখনো। পাহাড়ের প্রেমে পড়া সেই স্কুলজীবন থেকেই, যখন প্রথম কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে গিয়েছিলাম। প্রেমে পড়লে নাকি কাঁটার আঘাত সইতে হয়। এবার আক্ষরিক অর্থেই কাঁটার আঘাত খেতে হলো। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে গিয়ে কিছু কিছু জায়গায় কাঁটা ঝোপের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েই এই বিপত্তি। গাইডের দেখানো পথে বেশ কিছু জায়গা পার হলাম গাছের শিকড় ধরে বাদুড়ঝোলা হয়ে আর কিছু জায়গায় বাঁশের সাহায্যে। পুরো পথটাই কঠিন চড়াই।

যতই ওপরে উঠছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল এই পথ তো আবার নামতে হবে। নিচের দিকে তাকাতেই শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত নেমে গেল। একটা জায়গায় পাথরের একটা র‍্যাকের মতো পেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। দেখি সবার অবস্থাই কমবেশি খারাপ। হাতে কাঁটার আঘাত আর মশার কামড় খেয়েছে কমবেশি সবাই।

সিদ্ধান্ত নিলাম আর সামনে এগোনোটা বোকামি হয়ে যাবে, তার চেয়ে এখান থেকেই ফেরত যাই। রিফাত আর রোমেলও সুর মেলাল। দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মাসুদ আমাদের সাহস জোগানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল, সেই সঙ্গে যুক্ত হলো আসাদের অভয়বাণী। কিন্তু কোনো কিছুই মনে সাহস ফেরাতে পারছিল না।

default-image

পাহাড়ে উঠতে মনের জোরটাই আসল, এই সঙ্গে শারীরিক সামর্থ্যেরও একটা ব্যাপার আছে। প্রায় ৪০ বছর বয়সে এসে ডেস্ক জব করা এই শরীরে এমনিতেই সামর্থ্যের দিকে পিছিয়ে গেছি, তার ওপর এই খাড়া পাহাড়ের মুখব্যাদান করা ভয়ের। সব মিলিয়ে শরীর–মন কোনোটাই সাড়া দিচ্ছিল না সামনে এগোনোর। পাহাড়ের প্রতি সব ভালোবাসা ততক্ষণে উড়াল দিয়েছে মহাশূন্যে।

এই সময় আমাদের দীর্ঘদিনের পথের সাথি আরাফ আর আমাদের গাইড সাহস জোগালেন, আস্তে আস্তে এগোলে আমরা ঠিকই চূড়ায় পৌঁছাতে পারব। অগত্যা সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে খাড়া পাহাড় বেয়ে আবার ওঠা শুরু করলাম। একটু পরপরই থামতে হচ্ছিল। টপ টপ করে ঝরে পড়ছে শরীরের ঘাম। ঘামে ভেজা গামছা চিপে আবার সেই গামছা দিয়েই ঘাম মুছে এগোতে হচ্ছিল।

অবশেষে চূড়ায়

default-image

প্রায় ১২টার দিকে আমরা কিছুটা সমতলমতো জায়গায় এসে থামলাম। গাইড জানালেন এখান থেকেই ফাইনাল উতরাই শুরু হবে; তবে আশার বিষয়, পুরো পথটাই বাঁশবনের ভেতর দিয়ে, তাই বেশি কষ্ট হবে না। একে তো রোদের তাপ থেকে বাঁচা যাবে, তায় আবার বাঁশকে সাপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এখানে বসে কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছিলাম আর সঙ্গে করে নিয়ে আসা খাবারে ক্ষুধা নিবৃত্ত করছিলাম।

default-image

এ সময়ই দেখা হলো সামিট করে ফেরা একটা দলের সঙ্গে। তারাও অভয় দিল আর ৩০ মিনিটের মতো পথ চললেই নাকি মিলবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য আর পথও নাকি খুব দুর্গম নয়। আশার পালে লাগল হাওয়া, পুরোনো প্রেম আবার জেগে উঠল। আবার নতুন উদ্যমে শুরু করলাম পথচলা। অবশেষে ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’। সাড়ে ছয় ঘণ্টার দুর্গমগিরি পাড়ি দিয়ে মিলিত হলাম প্রেয়সীর সঙ্গে। দুইটা সামিট। বোতলে বেশ কিছু কাগজে যারা সামিট করেছে, তাদের নাম লেখা। জিপিএস অন করে দেখা গেল, চূড়াটা একেবারে মিয়ানমারের বর্ডারে।

লেখক: চিকিৎসক

মন্তব্য পড়ুন 0