মেঘালয়ের পবিত্র বনভূমি

ছবি: লেখক
ছবি: লেখককোলাজ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
বিজ্ঞাপন

আমরা আছি মেঘালয় কন্যার আশ্রয়ে; ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ছয়টা হবে। বেশ ভালোই ঠাণ্ডা পড়েছে। শীত নিবারণের কাপড় গায়ে দেবার পরেও বেশ ভালোই ঠাণ্ডা লাগছে । আমরা উঠেছি শিলং শহরে পুলিশ বাজারের কাছে হোটেল সেরিনে। সকালবেলা উঠেই আমি জানলার পাশে বসে আছি। আজ শিলং ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন; আমার আর আমার সব সময়ের ভ্রমণসঙ্গী মায়ের; বেশ ভালোই লাগে জানালার পাশে বসে মানুষের কর্মকাণ্ড দেখতে। তবে এই সকালে মা তখনো ওঠেননি।

default-image

পুলিশ বাজার আমাদের ঢাকার ফার্মগেটের মত। সকাল হতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে যার কাজে। কিছু সময় জানলার পাশে বসে ভাবলাম একটু সামনে হেঁটে আসি । মাকে ডাকবো ভেবে পরে আর ডাকলাম না ঘুমিয়ে আছে থাক; বরং নিজেই ঘুরে আসি। শীতের কাপড় পরে নিলাম দুই প্রস্থ যেন শীত আমাকে কাবু না করতে পারে। আমাদের অস্থায়ী ডেরা থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগিতোতেই শীতল হাওয়া ঘিরে ধরলো। সবাইকে দেখলাম শীতের কাপড় পরে বের হয়েছে কিন্তু আমার মত এত শীতের কাপড় কেউ পরে নাই; তবে প্রাকৃতিক এই আবহাওয়া ঐ অঞ্চলের মানুষের গায়ে শয়ে গেছে তাই এত ঠাণ্ডার মধ্যেও ঠাণ্ডা লাগে না হয়তো। আমি পুলিশ বাজারের এক প্রান্ত থেকে হাঁটা শুরু করলাম ইচ্ছা শেষ পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে আবার ফিরে আসবো। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সাতটা ছুঁই ছুঁই, তখনই পুরো এলাকা জুড়ে মানুষের ভিড়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে বসেছে বিক্রেতারা। হরেক রকমের পণ্য সামগ্রী শীতের কাপড়, জুতা, খাবার, ভোগ্যপণ্য কি নেই বলা কঠিন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ তাদের খাদ্যসমগ্রী নিয়ে বসেছে। খাবারের দোকানগুলো থেকে লাইন দিয়ে মানুষ খাবার কিনে খাচ্ছে। সবাইকে সকালের নাস্তা করতে দেখে আমারও পেটে রাম-রাবণের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কি আর করা পেটের যুদ্ধ থামানোর জন্য মনে মনে ভাবছিলাম কোথায় ঢুঁ মেরে পেট পুজা সেরে নেয়া যায়। প্রায় সব দোকানেই ভিড়। শেষমেশ পুলিশ বাজারের শেষ প্রান্তের বাঙালি রেস্তোরাঁ সুরুচিতে ঢুকে পড়ি। সেখানেও অবশ্য তিল ঠাঁই নেই। তবু কি আর করা। সুযোগ মতো একটা চেয়ার পেয়ে সেখানেই বসে পড়ি। লুচি আর আলুর দম; অসাধারণ স্বাদ। হিংয়ের গন্ধে অন্য রকম রসায়ন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আবার বাপ্পি দার ফোন: আমি হোটেলের নিচে আসি চলে আসো।

default-image

বললাম, আমি পুলিশ বাজারে আছি। নাস্তা করছি। মা আছেন রুমে। দ্রুত নাস্তা সেরে হোটেলে ফিরি। রুমে গিয়ে দেখি মা ও তৈরি হয়ে বসে আছেন। কালক্ষেপণ না করে রওনা দিই নতুন গন্তব্যে। আঁকা বাঁকা পথ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের নতুন গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বাপ্পি দা বললেন, স্যাক্রেড ফরেস্ট। পবিত্র বনভূমি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মেঘালয়ের একমাত্র ফরেস্ট যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিডের দেখা পাওয়া যায়; আর আছে বিরল রুদ্রাক্ষ গাছ। প্রায় এক ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছাই স্যাক্রেড ফরেস্টে। বাপ্পি দা বললেন গাইড নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে তা না হলে রাস্তা খুঁজে বের করা কঠিন হবে। কিন্তু আমরা পড়লাম এক জটিল সমস্যায়; সেখানে যারা গাইড আছেন তারা কেউই ইংরেজি বলতে পারেন না। আর হিন্দি যা পারে তাও ভাঙা ভাঙা। তাদের নিজস্ব যে ভাষা তা বোঝা দুঃসাধ্য ব্যাপার।

default-image

আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে বললাম আমরা ভেতরে ঘুরতে যেতে চাই কতটুকু সময়ের ট্রেলার আছে। উপস্থিত মানুষের কথা শুনে বুঝলাম, এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট, তিন ঘণ্টার আর সাড়ে চার ঘণ্টার ট্রেলার আছে। সাথে যেহেতু মা আছেন তাই এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের ট্রেলার আমরা বেছে নিলাম। এখন কতো টাকা দিতে হবে তাদের তা আগেই ঠিক করে নেয়াই ভালো। অনেক কষ্টে উদ্ধার করা গেল এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের জন্য ৫০০ রুপি দিতে হবে। ভাষা জটিলতার জন্য দরদামে না গিয়ে সামনে এগোই।

default-image

সামনের বড় মাঠ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। আমাদের মত অনেকেই এসেছে এখানে। বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে আমরা বনে প্রবেশ করলাম। বনের ভেতরে অন্য রকম পরিবেশ। বড় বড় গাছের ছায়ার মাঝে রোদের ঝিলিক বেশ ভালোই লাগছিলো আমাদের। চরাচর জুড়ে ঝরাপাতার কাব্য। একদিকে গাছের ছায়া তার মাঝে শীতের ছোঁওয়া বেশ উপভোগ্য। কথায় কথায় উদ্ধার করা গেলো গাইডের নাম মারি মং। নানা প্রজাতির গাছের সমারোহ। গাইড তার ভাষায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে। তাকে বোঝার চেষ্টায় আমরাও কসুর করছিলাম না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চলতে চলতে বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস আর ব্যাঙের ছাতার দেখা পেলাম। এসব ব্যাঙের ছাতা আবার খুব সুস্বাদু। দেখতে দেখতে আমরা উপস্থিত হলাম রুদ্রাক্ষ গাছের সামনে। গাছের নিচে বেশ কয়েকটা রুদ্রাক্ষ পড়ে থাকতে ও দেখলাম। আমি রুদ্রাক্ষ সংগ্রহ করতে চাইলে জন্য গাইড ইঙ্গিতে নিষেধ করল। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর এক জায়গায় দেখিয়ে গাইড জানালো, এটি তাদের প্রার্থনাস্থল। মারি মং দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করলো আমরা ও কিছু সময় দাঁড়িয়ে মৌন ধ্যান করলাম।

default-image

অসাধারণ পরিবেশ পুরো বনের ভেতর এই জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অন্য রকম। এ এক অন্য রকম অনুভূতি। মারি মং আমাদের কাছে জানতে চাইলো আমরা আর কি সামনে যাবো না কি এখান থেকেই ফিরে যাবো। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ঠিক ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরো সামনের যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নিষেধ করল মারি মং। কারণ আরো এক ঘন্টা হাঁটতে হবে। সেক্ষেত্রে যাওয়া আসা মিলিয়ে অন্তত ঘন্টাতিনেক লেগে যাবে। মায়ের পক্ষে তা সম্ভব হবে না। ফলে আমরা ফেরার পথ ধরলাম। মারি মং আমাদের অন্য পথ দিয়ে নিয়ে চলল। আঁকা বাঁকা পথ; পথে আবার বিশাল বড় বড় গাছ পড়ে আছে। এই পথে যেতে একটু কষ্টই হচ্ছিল। কিন্তু স্যাকরেড ফরেস্টের পরিবেশ সব ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছিল।

default-image

আমরা ফিরে আমাদের গাড়ির কাছে আসতেই বাপ্পি দা জলের বোতল হাতে দিয়ে বললো, জল খাও অনেক পথ হেঁটে এসেছো। বনের ভেতরে কোন প্লাস্টিকের পণ্য নিয়ে প্রবেশ করা যায় না তাই আর তোমাদের জলের বোতল নিতে বলি নাই। আমি মনে মনে ভাবলাম ঐ অঞ্চলের মানুষ কত সচেতন তাদের পরিবেশ সুরক্ষায়। অথচ আমরা যদি ওদের মতো হতে পারতাম।

লেখক: ভ্রমণ লেখক ও ব্যাংকার; সদস্য, বাংলাদেশ ট্র্যাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন