রঙের শহরে বিষণ্ন রঙের মানুষ

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিকে বলা হয় ‘সিটি অব কালারস’। সত্যিকার অর্থেই সিডনি রঙের শহর। সারা বছরই কোনো না কোনো উৎসব লেগে থাকে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যায় শহরের রং। এ ছাড়া প্রকৃতির পরিক্রমায় ঋতুবদলের সঙ্গে সঙ্গেও বদলে যায় শহরের রং। কিন্তু করোনাকালে প্রাণবন্ত এই শহরই কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে কোনো প্রকার প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা যাচ্ছে না। তাকে যেন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা পেয়ে বসেছে। সিডনিতে দিনের বেলায় যানবাহন থেকে শুরু করে ফুটপাতগুলো থাকে লোকে লোকারণ্য কিন্তু করোনাকালে তার সবই প্রায় ফাঁকা। বর্তমানে সে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি প্রাণ ফিরে আসেনি এখনো। কবে আসবে, সে বিষয়েও কোনো ধারণা আপাতত করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

বড় উৎসবগুলোর মধ্যে রয়েছে ২৬ জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া ডে, ফেব্রুয়ারি মাসে চাইনিজ নিউ ইয়ার, মে–জুন মাসজুড়ে চলে ভিভিড ফেস্টিভ্যাল, সেপ্টেম্বরে বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে ‘ফেস্টিভ্যাল অব উন্ডস’ আর অক্টোবর মাসে হ্যালোউইন। তবে সিডনির সবচেয়ে বড় ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে ‘নিউ ইয়ার’কে বরণ করে নেওয়ার চোখধাঁধানো আতশবাজি।

default-image

এ ছাড়া এখানকার বাঙালিদের রয়েছে বছর জুড়েই বিভিন্ন ধরনের মেলা ও উৎসব। এভাবে সারা বছরই সিডনির মানুষ ব্যস্ত রাখে নিজেদের। ঘড়ির কাঁটার আগে চলে বছরের দিনগুলো শেষ হয়ে যায়। কিন্তু করোনা আসার পর বছরটা যেন অনেক লম্বা হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা ঠিকই চলছে কিন্তু মনে হচ্ছে, সময় যেন তার টাট্টু ঘোড়া থামিয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়া ডে এবং চাইনিজ নিউ ইয়ারের পর মে–জুনের সবচেয়ে বড় ফেস্টিভ্যাল ছিল ভিভিড। ঋতু পরিক্রমায় জুন মাস থেকে অস্ট্রেলিয়ায় শীতকাল শুরু হয়, তাই তখন শহরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও কিছুটা মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয়। সেই মন্দাভাব কাটাতেই মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাসব্যাপী আয়োজন করা হয় এই ফেস্টিভ্যালের।

সারা সিডনি বিভিন্ন বর্ণের বৈদ্যুতিক আলোয় সেজে ওঠে। সিডনির অপেরা হাউসের দেয়ালে এবং ছাদে খেলা করে বিভিন্ন বর্ণের আলো। তার পাশেই রাতের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বিভিন্ন প্রকারের আলোর ঝলকানিতে। তরঙ্গা জুতে আলো দিয়ে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি বানানো হয়। ডার্লিং হারবারে বর্ণিল পোশাক পরে হেঁটে যায় ছয় মিটার উঁচু মেরি ডাইন।

default-image

ভিভিড শো দেখতে দেশ–বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন সিডনি শহরে। রাতে পুরো সিডনি শহর যেন প্রাণ ফিরে পায়। রাতের সিডনির রাস্তাগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। পায়ে–পায়ে মানুষ পৌঁছে যায় একটি প্রদর্শনী থেকে অন্য একটি প্রদর্শনীতে। আলোর এই ঝলকানি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে শিশুরা। কিছু সময়ের জন্য হলেও তারা যেন রূপকথার রাজ্যে হারিয়ে যায়। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ১০টা অবধি চলে এই প্রদর্শনী।

সিডনি হারবারের ছোট–বড় জাহাজও সাজে বিভিন্ন রঙে। অনেকেই জাহাজে চড়ে ঘুরে বেড়ান। ট্রেনে বাসে অনেক মানুষ আসা–যাওয়া করে। খাবার দোকানগুলোয় থাকে লম্বা লাইন। গত বছর প্রায় ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন দর্শনার্থী ভিভিড শো উপভোগ করেন, যা থেকে আয় হয় প্রায় ১৭২ মিলিয়ন ডলার।

বিজ্ঞাপন

এরপর সেপ্টেম্বরে সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে চলে দিনব্যাপী ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব। এটাকে বলা হয় ‘ফেস্টিভ্যাল অব উইন্ডস’। সকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব। ওয়েভারলি কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে চলে এই উৎসব। বাহারি রং আর আকৃতির ঘুড়িতে ছেয়ে যায় বন্ডাই সমুদ্রসৈকতের আকাশ। এই উৎসব দেখতে শত শত পর্যটক আসেন। ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে তাঁদেরও মন হয়তোবা ঘুড়ি হয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বন্ডাই সৈকতের শীতল বাতাসে উড়ে বেড়ায়।

default-image

পাশাপাশি চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বিভিন্ন রকমের পরিবেশনা চলতে থাকে। শিশু–কিশোর থেকে শুরু করে তাদের অভিভাবকেরাও অনেক সময় ঘুড়ি কিনে নিয়ে উড়াতে শুরু করেন। এভাবেই একটা দিন কেটে যায় বাতাসে বাতাসে। এই উৎসবের সময় বন্ডাই সমুদ্রসৈকত লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এমনিতেই বন্ডাই সৈকত পর্যটকদের কাছে অনেক বড় আকর্ষণ। উপরন্তু ফেস্টিভ্যাল অব উইন্ডস তাতে বাড়তি রং যোগ করে।

default-image

সিডনির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উৎসবের নাম ‘ক্রিসমাস’। ক্রিসমাস আসার অনেক আগে থেকেই দোকানগুলোয় ক্রিসমাসের জিনিসপত্র তোলা হয়। ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ আসতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু এখনই দোকানগুলোয় ক্রিসমাস ট্রি থেকে শুরু করে সব রকমের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছে। ক্রিসমাস উপলক্ষে বাড়িগুলোকে নানা রঙের আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়।

কিছু কিছু সিটি কাউন্সিল আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করে থাকে। তখন সেসব সাবআর্ব ভ্রমণে গেলে আপনার মনে হবে আপনি হয়তো স্বর্গের কোনো রাস্তায় হাঁটছেন। ক্রিসমাসের অনেক আগেই স্কুলগুলো ছুটি হয়ে যায়, তাই শিশুরা ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করতে পারে। অনেকেই মা–বাবার সঙ্গে দেশ–বিদেশ ঘুরতে বের হয়। অফিসগুলোতেও অনেক লম্বা ছুটি দেওয়া হয়, যাতে করে পরিবারের সঙ্গে সবাই আনন্দময় সময় কাটাতে পারে।

default-image

এরপর প্রতিবছর অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখে পালন করা হয় হ্যালোউইন উৎসব। অস্ট্রেলিয়াজুড়েই এদিন শিশুরা বিভিন্ন রকমের সাজে এক বাসা থেকে অন্য বাসার দরজায় গিয়ে টোকা দিয়ে বলে ‘ট্রিক অর ট্রিট’। হ্যালোউইনের আগে থেকেই দোকানগুলোতে হ্যালোউইনের পোশাক থেকে শুরু করে ক্যান্ডি তোলা হয়। সেগুলো সবাই কিনে নিয়ে আসেন। শিশুরা সবাই বিভিন্ন ধরনের ভূত সাজে। আবার অনেক অভিভাবকও বাচ্চাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য নিজেরাও ভূত সেজে বেরিয়ে পড়েন। কেউবা বালতি, আবার কেউবা ব্যাগে চকলেট সংগ্রহ করে।

default-image

আশপাশের পাড়া ঘুরে তারা অনেক চকলেট সংগ্রহ করে। এ সময় সবাই আগে থেকে অনেক চকলেট ও ক্যান্ডি কিনে রাখেন, যাতে শিশুরা খালি হাতে ফেরত না যায়। দিন শেষে তারা একগাদা চকলেট আর ক্যান্ডি নিয়ে বাসায় ফেরে। চকলেটের পরিমাণ দেখেই তারা খুশিতে ডগমগ করে। এর পরদিন স্কুলে গিয়ে কে কত পরিমাণ চকলেট পেয়েছে, সেটা নিয়ে গল্প করে।

এ ছাড়া বছরজুড়ে চলে বিভিন্ন দেশের মানুষের বিভিন্ন রকমের ফেস্টিভ্যাল। বাংলাদেশের উৎসবের মধ্যে পয়লা বৈশাখ, ঈদ ও দুর্গাপূজা অন্যতম। পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সিডনিজুড়ে অনেকগুলো মেলার আয়োজন করা হয়। সেই সব মেলায় বিশাল জনসমাগম হয়। সেখানে জিনিসপত্র বিকিকিনির পাশাপাশি চলে বিভিন্ন রকমের খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা।

default-image

অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় প্রজন্ম কিছুটা হলেও দেশের মেলার স্বাদ নিতে পারে। ইদানীং বাংলাদেশের আদলে মেলার অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ হয়েছিল রাস্তায় আলপনা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ ছাড়া সারা বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবসও পালন করা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সিডনির এশফিল্ড পার্কে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় বইমেলার। সেখানে ২০০৬ সালে স্থাপন করা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ’।

সিডনির সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে ধরা হয় সিডনি হারবার ব্রিজের ‘নিউ ইয়ার’ উপলক্ষে করা আতশবাজি। বিশ্বখ্যাত এই আতশবাজি দেখতে সিডনিতে পর্যটকেরা ভিড় করতে থাকেন অনেক আগে থেকেই। অনেকেই সিডনি হারবারে সপ্তাহখানেক আগে থেকেই তাঁবু টানিয়ে থাকা শুরু করেন আতশবাজির একটা ভালো ভিউ দেখার জন্য।

বিজ্ঞাপন

ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ সকাল থেকেই মানুষ জড়ো হয় সিডনি হারবারসহ আশপাশের সব জায়গায়। অনেকেই আবার ডার্লিং হারবারেও যান। এ ছাড়া সিটি কাউন্সিলগুলোর উদ্যোগেও ছোট আকারে আয়োজন করা হয় আতশবাজির। দুই পর্যায়ে এই আতশবাজি চলে। রাত ৯টার সময় একবার এবং রাত ১২টার সময় একবার। রাত ৯টার সময় হয় ছোট আকারে। এরপর ১২টার সময় হয় বড় আকারে। হারবার ব্রিজের দুই পাশের কংক্রিটের থামের ওপর চলে আলোর প্রদর্শনী। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর আলোকচিত্র পরিবেশন করা হয়। সেখানেই দেখানো হয় ‘সিডনি: সিটি অব কালারস’।

default-image

এ বছর করোনার কারণে কোনো উৎসবই আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। আর যেগুলো আয়োজন করা হয়েছিল, তাতেও ছিল অনেক বিধিনিষেধ, তাই মানুষ মন খুলে আনন্দ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। উৎসব মানেই হাজার হাজার মানুষের সমাগম। করোনার বিস্তার রোধের লক্ষ্যে সে জনসমাগমের ওপরই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

গত বছর অস্ট্রেলিয়াতে দেখা দিয়েছিল স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বন অগ্নিকাণ্ড, যেটাকে অস্ট্রেলিয়ার ভাষায় বলে ‘বুশ ফায়ার’। এরপর দেখা দিয়েছিল পানির সংকট। পানির সংকট মোকাবিলার জন্য পানির গৃহস্থালি ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সারা বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াও করোনার কবলে পড়েছে। এর ফলে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে।

বিভিন্ন প্রকার বিপর্যয়ের মধ্যেই প্রকৃতি চলেছে তার আপন নিয়মে। ঋতু পরিক্রমায় শীতের পরে এসেছে বসন্ত। গাছেরা সব আড়মোড়া ভেঙে নতুন সবুজ পাতায় সেজেছে। গাছের শাখায় শাখায় দেখা দিয়েছে হরেক রকমের ফুল। মৌমাছিরা গুঞ্জন করে ফুল থেকে ফুলে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছে।

default-image

অতিসম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বসন্তকালের সিগনেচার ফুল জ্যাকারান্ডাতে ছেয়ে গেছে পুরো সিডনি শহরের রাস্তাঘাট। পাখির চোখে দেখলে মনে হবে, কোনো এক নিপুণ শিল্পী তাঁর তুলির আঁচড়ে সিডনির সবখানে বেগুনি রং ছড়িয়ে দিয়েছেন। শীতের সময় সব পাতা ঝরিয়ে জ্যাকারান্ডা গাছগুলো থুত্থুড়ে বুড়োর মতো ঝিম মেরে বসে থাকে। বসন্তকাল এলে শুরুতেই সেই শুকনা শাখাগুলোতে দেখা দেয় গাঢ় বেগুনি রঙের ফুল। এরপর একসময় ফুলগুলো ঝরে গিয়ে পুরো গাছটা আবার সবুজ পত্রপল্লবে ভরে ওঠে।

বলা হয়ে থাকে, বেদনার রং নীল। তাহলে জ্যাকারান্ডার গাঢ় বেগুনি রংটাকেও আমরা বেদনার রং বলতে পারি। সেদিক দিয়ে বিচার করলে সিডনি এখন বেদনায় আক্রান্ত একটা অবয়ব। বুশ ফায়ার, পানির সংকটের পর করোনায় সিডনির স্বাভাবিক জীবন এখন বিপর্যস্ত। তবে আমরা আশাবাদী, শীতের পরে যেমন সিডনিতে বসন্তের হাওয়া এসে লেগেছে, ঠিক তেমনি করোনাকাল শেষ হয়ে সিডনিতে বইবে সুবাতাস। সিডনি আবার ফিরে পাবে তার পুরোনো রূপ। পর্যটক ও কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণে মুখর হয়ে উঠবে সিডনির পথঘাট। সেই সুদিনের আসায় আমরা দিন গুনছি, কারণ, স্বপ্ন বা আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

মন্তব্য পড়ুন 0