default-image

২০২০ সালের ২৩ জুন, পলাশী যুদ্ধের ২৬৩তম বার্ষিকী। বাংলার ইতিহাসের কলঙ্কময় একটি দিন। হুগলী নদীর পূর্ব তীর বরাবর বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পলাশী নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভাড়া করা সৈন্যদের কাছে বাংলার নবাবের বেতনভোগী সৈন্যরা পরাজিত হয়। কোম্পানির সৈন্যসংখ্যা ছিল ১ হাজার ১০০ ইউরোপিয়ান এবং বেতনভুক্ত ভারতীয় ২ হাজার ১০০ জন সেপাই। আর নবাব সিরাজের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার সৈন্য। তবুও এক দিন যুদ্ধের পর নবাবের বিশাল সৈন্যবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায় অথবা আত্মসমর্পণ করে। কেমন করে সম্ভব হলো এটা?

আজকের দিনের ইতিহাসের ছাত্রদের মনে সংগত কারণেই এ প্রশ্ন ওঠে এবং ইতিহাসের মধ্যেই তাঁরা উত্তরও পেয়ে যান। উত্তরটা হলো, গোষ্ঠীস্বার্থ ও স্বার্থপরতা।

পুঁজিপতি জগৎ শেঠ, ব্যবসায়ী উমিচাঁদদের টাকা, সেনাপতি মীরজাফরের ক্ষমতার লোভ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ এক হয়ে কলকাতা, কাশিমবাজার এবং মুর্শিদাবাদে গড়ে ওঠা ভয়ানক অক্ষশক্তি মোর্চার সঙ্গে অনভিজ্ঞ তরুণ নবাব সিরাজের পরাজয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। পলাশীর আমবাগানে যে শুধু যুদ্ধের নাটক হয়েছিল, ইতিহাসসচেতন মানুষ মাত্রই সেটা জানেন।

এই যুদ্ধ ছিল বণিকশ্রেণির সঙ্গে রাজশক্তির যুদ্ধ, বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির সংঘর্ষ। এতে বণিকশ্রেণি জয়লাভ করে। এই যুদ্ধেই নির্ধারিত হয়ে যায় রাজা বড়, না টাকা বড়?

ইউরোপে সৃষ্ট নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিপতি মিল মালিক ও পুঁজিপতির যৌথ শক্তির সঙ্গে পুরোনো সামন্ত শক্তির সংঘর্ষ এবং তাতে ধনতান্ত্রিক এই নতুন শক্তির বিজয় লাভ ছিল অবধারিত। আমরা এখন ধনতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থার নতুন রাজ্যের প্রজা।

২.
পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ী ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ ভারত এসেছিলেন কপর্দকহীন অবস্থায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি হয়ে, হাতে ছিল ছোট্ট একটা হ্যান্ডলাগেজ। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর মাল বহন করতে লেগেছিল পাঁচখানা জাহাজ! বাংলায় তাঁর রাজত্বকালে কৃষিজমির কর বাড়ানো এবং কৃষি উৎপাদনে তাঁর অন্যান্য শোষণনীতির কুফলে সৃষ্টি হয় ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ। তাতে প্রাণ হারায় প্রায় এক কোটি বাঙালি।

কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, বাংলা থেকে লুট করা এত ধনসম্পদ ক্লাইভকে শান্তি দিতে পারেনি। ১৭৭৪ সালের নভেম্বর মাসে লন্ডন শহরে আত্মহত্যা করে মারা যান ক্লাইভ। তাঁর মৃত্যুতে আধুনিক ইংলিশ ডিকশনারির জনক বলে খ্যাত স্যামুয়েল জনসন লিখেছিলেন, ‘তাঁর অবৈধ সম্পদ এমন নিষ্ঠুর এবং অসৎ উপায়ে করেছিলেন যে তাঁর নিজের চৈতন্যই তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে।’

মৃত্যুর পর ক্লাইভকে নিজ গ্রামে সমাহিত করা হয়।

default-image

আমি গত ৪৪ বছর ইংল্যান্ডে বাস করি। কাজকর্ম করে রুজিরোজগার করে খাইদাই, চলিফিরি। বার্মিংহাম শহরে থাকি। এটা ক্লাইভের কবরস্থান মার্কেট ড্রেইটন টাউন থেকে ৬০ মাইল দূরে। শখ হলো বাংলাকে ছিবড়ে করে দেওয়া ক্লাইভের কবরটা দেখে আসি।

২০১৪ সালের জুন মাসের এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে স্ত্রীর চালানো গাড়িতে রওনা দিলাম। মিডল্যান্ডের সীমানা ছাড়িয়ে সর্পসায়ার কাউন্টি। ছোট এবং মাঝারি উচ্চতার পাহাড়ি উপত্যকার মনোরম পথ ধরে দুই ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম মার্কেট ড্রেইটন শহরে। সাজানো-গোছানো ছোট্ট গ্রাম্য শহর, দেখতে সুন্দর। শহরটা ঘুরে দেখলাম। বাইরে থেকে ক্লাইভের স্কুল দেখলাম। শনিবার, তাই স্কুলের প্রধান দরজা বন্ধ ছিল। বন্ধ না থাকলেও আমাকে ভেতরে যেতে দেওয়া হতো কি না, সে দুশ্চিন্তা আর দারোয়ানের সঙ্গে সঙ্গে কথা-কাটাকাটির অপরিহার্যতা থেকে রেহাই পেলাম।

এবারে গ্রামের ছোট আঁকাবাঁকা পথ ধরে ২০ মিনিট ড্রাইভ করে পৌঁছে গেলাম ‘মরটন সেই’ নামের গ্রামে, একদম সেন্ট মার্গারেট প্যারিস চার্চের সামনে। লাল ইটের ছিমছাম দেয়াল আর কালচে রং ধরা লাল টাইলসের উঁচু ছাদ। ছোট্ট তবে দেখতে অসুন্দর নয়। বাইরে থেকেই ছবি তুললাম।

গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম সবকিছুই খোলা। সীমানাপ্রাচীর থাকলেও প্রধান দরজা খোলা। চার্চের দরজা খোলা। ভেতরে গেলাম। কোনো মানুষ নেই। অবস্থা দেখে মনে হলো, রবিবার ছাড়া প্রার্থনা করার জন্য অন্য কোনো দিন মানুষ এখানে আসে না। কতজন আসে বা আদৌ কেউ আসে কি না, তাও সন্দেহাতীত নয়।

যা হোক, ধর্মের কথা বাদ দিয়ে আমি আমার কাজ শুরু করলাম, রবার্ট ক্লাইভের কবর খুঁজতে লেগে গেলাম। চার্চের সামনে পাথর খোদাই করে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে এটাই ক্লাইভ ফ্যামিলির পারিবারিক চার্চ, রবার্ট ক্লাইভকে চার্চের চৌহদ্দির মধ্যেই কবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি করেও ক্লাইভ সাহেবের কবরটা খুঁজে পেলাম না!

অবশেষে নোটিশ বোর্ডে লেখা বিভিন্ন টেলিফোন নম্বরে আমার মোবাইল ফোন থেকে টেলিফোন করলাম প্রথম তিনটি নম্বরে রিং হলো কিন্তু কেউ উত্তর দিল না। চতুর্থ নম্বরে এক বয়স্ক নারী টেলিফোন ধরলেন। তাঁর সঙ্গে কুশলবিনিময় করে কিছুক্ষণ কথা বলে যা বুঝলাম, তার সারসংক্ষেপ এই যে ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া বা রবার্ট ক্লাইভের কবরটা চার্চের ভেতরে বেজমেন্টে পাথরের ভল্টের মধ্যে রক্ষিত। আগে বেজমেন্টে যাওয়ার দরজাটা খোলাই থাকত। তবে নিরাপত্তার জন্য দরজা এখন তালা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়। তালার চাবিটা চার্চের ভিকারের কাছে থাকে। বছরের নির্দিষ্ট কোনো কোনো দিন এটা খোলা হয় মাত্র। চার্চের পশ্চিম দিকের ধূসর রঙের বাড়িতেই চার্চের ভিকার থাকে।

আমি ভিকারের বাড়িতে গেলাম। ডোরবেল বাজালাম। কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। বাড়ির ভেতরে বেল বাজল কি না, তাও বুঝতে পারলাম না। দরজার কড়া নাড়লাম। জোরে জোরে শব্দ হলো। ভেতর থেকে ভিকারের এলসেসিয়ান কুকুরটা বিকট শব্দে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। আমি বুঝলাম, কুকুরটা চিনতে পেরেছে আমি বাঙালি। রবার্ট ক্লাইভের কবর দেখার স্বাদ মিটে গেল।

default-image

৩.
ক্লাইভের মরদেহ মরটন সেই প্যারিস চার্চের ভল্টে তালাচাবি দিয়ে আটকে রাখা হলেও তার প্রতিকৃতি নিয়ে বানানো পাথরের মূর্তি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে দাঁড় করানো আছে। আমেরিকার মিনিয়াপলিস শহরে এক সাদা পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের নিহত হওয়ার পরে সারা বিশ্বজুড়ে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর ব্যানারে যে আন্দোলন চলছে, তাতে দাবি উঠেছে, ‘ক্লাইভ মাস্ট ফল’।

এমন একটি পাথরের মূর্তি ১৮৬০ সাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে সর্পসায়ার কাউন্টির সুরুজবাড়ি শহরের মাঝখানে। সময় বদলে গেছে। এই শহরের সাদা মানুষেরাই এখন দাবি করছেন, বর্ণবাদী ক্লাইভের মূর্তি নামাও। এই মর্মে সর্পসায়ার কাউন্সিলে পাঁচ হাজার মানুষের সই করা একখানা পিটিশন জমা দেওয়া হয়েছে। দরখাস্তকারীরা বলছেন, ক্লাইভ ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার নায়ক, ২০০ বছরের চুরি-ডাকাতি, অত্যাচার এবং দুঃশাসনের জনক, হাজার হাজার ভারতীয়র মৃত্যুর কারণ। এখন সময় এসেছে, আমরা নিজেদের কুকীর্তির অতীতকে স্বীকার করি। ক্লাইভের মূর্তি অপসারণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে আমাদের নতুন যাত্রা। ক্লাইভের মূর্তি বর্ণবাদ, অত্যাচার এবং দুষ্কৃতির প্রতীক, এটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

সর্পসায়ার কাউন্টি কাউন্সিলের নেতা পিটার নুটিন বলেছেন, ‘দরখাস্তের আবেদন কাউন্সিল চেম্বারে আলোচিত হবে এবং কাউন্সিলরদের সিদ্ধান্ত মতো ব্যবস্থা নেওয়াও হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্লাইভের মূর্তি অপসারণের বিপক্ষে।’

তারওপর কাউন্সিলে কনজারভেটিভদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সুতরাং ভোটের মাধ্যমে ক্লাইভের মূর্তিটা নামানো হবে, সে সম্ভাবনা খুব কম। ক্লাইভ সাহেব হয়তো এ যাত্রায় বেঁচে যাবেন; কিন্তু গণ-আন্দোলনের দুর্দম শক্তি উপেক্ষা করে কত দিন টিকে থাকতে পারবেন, সেটাই প্রশ্ন।

শক্তি সত্যের পক্ষে আর সত্য আমাদের পক্ষে। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঝড়ে ভেঙে যাবে ক্লাইভের মূর্তি, ঘৃণিত হবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কদর্য ইতিহাস। সূর্য উঠবে নতুন দিনের। আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে।

লেখক: ডাইরেক্টর, এশিয়ান রিসোর্স সেন্টার, বার্মিংহাম, ইংল্যান্ড।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0