default-image
বিজ্ঞাপন

শীত এখন অস্তাচলে, এসেছে বসন্ত। বাতাসে তার সজীব সুঘ্রাণ টের পাওয়া যাচ্ছে৷ আর বসন্তের সূচনা মানে রং। গাছে হালকা সবুজ রঙের কচি পাতা আর আকাশে-বাতাসে লাল, নীল, হলুদ রঙের বাহার নিয়ে ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। মনে পড়ে ‘সিলসিলা’ ছবির সেই বিখ্যাত গান ‘রং বরসে, ভিগে চুনারবালি রং বরসে’? গানের সুরে মুঠোভরা লাল হলুদ আবির মিশে যাচ্ছে বাতাসে। গানে–নাচে মাতোয়ারা মন। একে অন্যকে রাঙিয়ে দেওয়া, হোলিতে ভারতের চিত্রটা এই রকমই।

default-image

বাঙালির দোল আর অবাঙালির হোলি—দুইই এক। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সূচনা করেছিলেন বসন্ত উৎসবের। হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবি আর পলাশ ফুলে সেজে ওঠে প্রতিবছর কবিগুরুর শান্তিনিকেতন।

দোল উৎসব হয় ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে, এই দিনে শ্রীচৈতন্য দেবেরও জন্ম হয় তাই এই দিনটিকে ‘গৌর পূর্ণিমা’ বলা হয়। দোল বা হোলি এই দুইয়ের সঙ্গেই শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা জড়িয়ে আছেন। এ হলো শাশ্বত প্রেমের উৎসব। তবে আজ বলব উত্তর ভারতের বিখ্যাত লাঠমার হোলির গল্প।

‘লাঠমার হোলি’ হয় মূল হোলি বা দোলের এক সপ্তাহ আগে। উত্তর প্রদেশে বৃন্দাবনের গ্রাম বরসানার (রাধার বাসভূমি) রাধারানী মন্দিরে। এখানে রঙের উৎসব চলে এক সপ্তাহ ধরে। পুরাণমতে, এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ নন্দগাঁও (কৃষ্ণের বাসভূমি) থেকে এসেছিলেন শ্রীরাধিকার পিছু নিয়ে বৃন্দাবনের বরসানা গ্রামে। রাধিকা ও তাঁর সখীদের উত্ত্যক্ত করেছিলেন বিস্তর। ফলে সখীরা রেগে যান ও শ্রীকৃষ্ণকে লাঠি দিয়ে মারতে উদ্যত হন।

default-image

সেইমতো ও প্রথা অনুযায়ী বর্তমানে নন্দগাঁও থেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরে কৃষ্ণের বেশে দল ধরে পুরুষেরা আসেন বরসানা গ্রামে। নারীরা ঘাগরা-চোলিতে সজ্জিত হয়ে হাতে একটি শক্ত লম্বা লাঠি নিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। সেই লাঠি পড়ে পুরুষদের ওপরে—সে এক মজার দৃশ্য। চামড়ার গোল, মোটা ঢালের মতো একটি বস্তু দিয়ে পুরুষেরা সেই আঘাত থেকে নিজেদের রক্ষা করেন। কিন্তু দৈবাৎ যদি কেউ নিজেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হন এবং শরীরে লাঠির ঘা লাগে তবে তাকে পেতে হয় শাস্তি। বসে সভা। নারীরা শাড়ি পরিয়ে দেন এবং জনসমক্ষে সেই পুরুষকে নেচে দেখাতে হয়। এই লাঠির মার থেকেই ‘লাঠমার’ কথাটির উৎপত্তি। এই উৎসবে কদিনের জন্য গ্রামের প্রতিটি পুরুষই কৃষ্ণ এবং নারীরা সকলেই রাধা। পুরাকালে রাধা-কৃষ্ণের হোলি খেলার স্মৃতিতে এই কটা দিন ফাগের রঙে ডুবে যায় বরসানা-নন্দগ্রামের আকাশ–বাতাস।

বিজ্ঞাপন

‘লাঠমার হোলি’ পৃথিবী বিখ্যাত একটি উৎসব। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শখের ও প্রথিতযশা ফটোগ্রাফাররা ভিড় জমান এ সময়। আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল একবার যাওয়ার। দিল্লি থেকে আনুমানিক ১৭০ কিলোমিটার দূরত্ব। লাঠমার হোলি দেখার জন্য দুই রাত থাকতে হবে বৃন্দাবনে। অনেক হোটেল বা ধর্মশালা আছে ছোট, বড়, মাঝারি মানের। নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে বাস বা গাড়ি ছাড়ে আগ্রা-মথুরার। পথে পড়বে বৃন্দাবন। সেখানে নেমে অটোরিকশা ধরে কিছুদূর গেলেই মূল বৃন্দাবন শহর। অটোর চালককে বললে তিনিও দেখিয়ে দিতে পারেন। অগ্রসেনের একটি ধর্মশালার কথা মনে পড়ছে, বেশ পরিচ্ছন্ন এবং খাবারও চমৎকার। তবে আমিষ খাবার বৃন্দাবনে পাওয়া যায় না। তাতে কি? দুটো দিন দিব্যি ডাল, পনির, সবজি খেয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়। আর পাওয়া যায় লস্যি, রাবড়ি, পেঁড়া, কুলফি মালাই। সেসব অতি উত্তম খাবার।

default-image

আমরা আনন্দ কৃষ্ণ বন হোটেলে এক রাত থেকে পরদিন সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ রওনা দিয়েছিলাম বরসানার দিকে। আমাদের নিজস্ব ট্রাভেলর ছিল কিন্তু এই সময়ে অটো থাকে অনেক। সবারই গন্তব্য ওই বরসানার রাধারানী মন্দির। তাই চাইলেই গাড়ি পাওয়া যায়। বরসানা গ্রামের ভেতরের রাস্তা সরু গলির মতো। তাই মূল রাস্তা থেকে নেমে বাকি পথটুকু দোকান–বাজার দেখতে দেখতে হেঁটে চললাম।

মাথায়-গায়ে ভালোমতো তেল মেখে নিয়েছিলাম, যাতে রং সহজে বসতে না পারে। মাথা একটা ওড়না দিয়ে ঢাকলাম। আর জামাকাপড়ের মায়া রাখিনি কারণ ও রং ওঠার নয়। এত রং সারা দিনে প্রয়োগ হয়েছিল, ফিরে এক সপ্তাহ লেগেছিল গায়ের রং উঠতে। বরসানার পথে পথে ছবির বিষয় পাওয়া যায়। যাঁরা ছবি তুলতে ভালোবাসেন তাঁদের জন্য স্বর্গ এই সময়টা। তবে ক্যামেরা ঢেকে ঢুকে যাওয়া খুব জরুরি, লেন্সে রং লেগে যেতে পারে।

default-image

পথে চলতে চলতে হঠাৎই পিঠে সপাং, কিছু বুঝে ওঠার আগেই রঙিন স্নান। এমনই স্বাভাবিক ওখানে। পিঠে ছুড়েছিল বেলুন আর এক বাড়ির ছাদ থেকে ঢেলে দিয়েছিল এক বালতি রং গোলা জল। রাগতে গিয়েও হেসে ফেললাম। মনে পড়ল ‘শোলে’ সিনেমায় জয়া ভাদুড়ি বলেছিলেন, ‘হোলি হ্যায় ভাই হোলি ভাই, বুরা না মানো হোলি হ্যায়।’ আর এখানে রাগার তো সুযোগই নেই। কারণ, রঙের আক্রমণ বিভিন্ন দিক থেকে হবেই। আর এ সত্যি প্রেমের উৎসব। কেউ কাউকে চিনি না, ভবিষ্যতে আর কোনো দিন দেখাও হয়নি, কারোর নামটাও জানা হয়নি; কিন্তু সেই মুখগুলো মনে আছে—তারা এক দিনের জন্য ভালোবেসে, আবেশে রাঙিয়ে দিয়েছিল আবিরে। আর মজার বিষয় হলো, বরসানায় হোলি খেলতে কোনো রং বা আবির নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, স্থানীয় মানুষেরাই এত রং মাখিয়ে দেবে যে আপনি ঢুকবেন সাফসুতরো হয়ে এবং বেরোবেন রঙিন ভূত হয়ে।

বসন্তের সমাগমে প্রচুর পলাশ ফুটে থাকে। বরসানায় কৃত্রিম রঙের পাশাপাশি পলাশ ফুলের গেরুয়া রংও ব্যবহার করা হয়। ফুলকে ডলে যে রং বেরোয়, তাই মাখিয়ে দেয়। পথে পড়ে থাকে পলাশের পাপড়ি আর মানুষের পায়ের চাপে রস বেরিয়ে পথ হয়ে ওঠে গেরুয়া।

default-image

রাধারানী মন্দিরের কিছুদূর থেকেই ভেসে আসছিল গানের সুর, সঙ্গে ঢোল, খঞ্জনির মিঠে তাল। মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকে দেখলাম বিভিন্ন জায়গায় গানের আসর বসেছে। সবই গ্রামের প্রচলিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গান। যেকোনো আসরে অনায়াসে ভিড়ে যাওয়া যায়, গানের তালে নাচা যায় বা ঢোল তুলে নিয়ে বাজানোও যায়। আমি যেহেতু নাচ, গান, বাজনায় বিশ্রী রকমের আকাট তাই পাশে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের মাদকতাই শুধু উপভোগ করেছিলাম।

হঠাৎই শব্দ শুনে আকাশের দিকে দেখি হেলিকপ্টার থেকে গোলাপের পাপড়ি বৃষ্টিধারার মতো নেমে আসছে রাধারানী মন্দিরের চত্বরে। অনেকটা গল্পে শোনা আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টির মতো। শুনলাম উত্তর প্রদেশ সরকার থেকে এই ব্যবস্থা করা হয় হোলির সময়ে।

বিজ্ঞাপন

এ সময় প্রবল ভিড় হয়, সবারই গন্তব্য রাধারানী মন্দির। রাধাকে আবির দিয়ে পূজা করা হয়। আমি যদিও ভিড় ঠেলে মন্দিরের ভেতরে আর যাইনি। আমার ছবি তোলাই উদ্দেশ্য। বেলা যত বাড়তে লাগল মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে উঠতে লাগল খুনখারাবি লাল। মুঠো ভরে আবির উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, বালতিতে রং গুলে মন্দিরের ছাদ থেকে ঢেলে দিচ্ছে আর নিচের চাতালে চলছে নাচ–গান। ক্লান্ত হলে একটু বিশ্রাম আবার পুরোদমে হুল্লোড় শুরু। পকেটে খুচরো দশ-বিশ টাকা রেখে দেওয়া জরুরি। এ সময় ছবি তুলতে গেলে আবদার আসে টাকা দাও তবেই পোজ দেব। এগুলো খরচ ভাববেন না, ভালো ফ্রেম, ভালো পোর্ট্রেট পাবেনই পাবেন।

চারটে নাগাদ হুল্লোড়ের তোপ কমল, বুঝলাম এবার বসবে ‘সমাজ’। বরসানায় হোলি খেলার পরে সমাজ বসে, ভিজে চুপচুপে পোশাকেই। সমাজ হলো মূলত গানের আসর। নন্দগাঁও এবং বরসানার শিশু থেকে বয়স্ক সব পুরুষ একত্রে বসে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেমের গান করেন। একজন শুরু করেন তো আর একজন ধরে নেন সুর মিলিয়ে।

default-image

এভাবেই বরসানার হোলি শেষ হয় সন্ধ্যাবেলায়। পরদিন বরসানার পুরুষেরা কৃষ্ণ সেজে যান নন্দগাঁওতে। এখানে হোলি খেলা হয় নন্দগ্রাম মন্দিরে। মন্দিরের চারপাশে উঁচু দেয়াল আর ওপাশেই ভরতপুরের পাহাড়। চমৎকার দৃশ্য। আগের দিন বরসানার লাঠির মারের কপট প্রতিশোধ নিতে নন্দগাঁওয়ের পুরুষেরা বাড়ির দরজায় বালতি ভরে রং নিয়ে স্বাগত জানান। ছদ্মপ্রেম বা কামের গন্ধ পাওয়া যায়। সেসব ওদের নিজেদের ব্যাপার। এতে ট্যুরিস্টদের কোনো অসুবিধা হয় না। চলে রং মাখানোর প্রতিযোগিতা। শক্তি প্রদর্শন মাঝেমধ্যে জোরালো হয়ে ওঠে। তবে দুই দিনই দুই গ্রামে পুলিশ থাকে ভিড় বা উত্তেজনা দমনের জন্য। এরপর সারা দিন চলে উদ্দাম হোলি খেলা এবং পড়ন্ত বিকেলে এখানেও বসে সমাজ।

বরসানা গ্রামের হোলিই ‘লাঠমার’ হোলি। পরের দিন যদি কেউ নন্দগ্রামের হোলি না দেখতে চান তাহলে বলব, সেদিন সকালে বৃন্দাবনের মন্দিরগুলোতে ঘুরতে। প্রতিটি মন্দিরেই হোলি খেলা হয়। সে দৃশ্যও চমৎকার। যেকোনো আনন্দ উৎসবেই সবার সমান অধিকার থাকা উচিত। প্রাচীন কুসংস্কার ভেঙে বিধবারা এখানে হোলি খেলছেন ২০১৩ সাল থেকে চার শ বছরের পুরোনো গোপীনাথজির মন্দিরে। বৃন্দাবনে বিধবাদের থাকার আলাদা জায়গা আছে। অভাব বা স্বভাবে এই নারীরা তাঁদের পরিবারে স্থান পাননি হয়তো, চলে এসেছেন এখানে। ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে টিকে আছেন। যে বাড়ি সারা বছর বড় বেরঙিন হয়ে থাকে সাদা থানে, এক দিনের জন্য হলেও সেখানে আনন্দের রং লাগে। শুষ্ক মনে পরশ পড়ে ভালোবাসার। এ অনেক বড় পাওনা।

default-image

বেড়াতে যাব আর বেশ গুছিয়ে খাব না, তা হয় না। হোলিতে এখানে বিক্রি হয় ঠান্ডাই। কাজু, পেস্তা, খোয়া, দুধ আর অ্যামন্ড বা কাঠবাদাম দিয়ে বানানো। হলফ করে বলতে পারি, এ শরবত পেটের ভেতর দিয়ে মরমে পশিবে। মনে হবে আরও খাই। কিন্তু সাবধান, ঠান্ডাই খাবেন কোনো ভালো মিষ্টির দোকান থেকে। মন্দির চত্বর থেকে যে ঠান্ডাই বিলানো হয় তা খাবেন না, ওতে ভাঙ মেশানো থাকে। আর খাবেন পেঁড়া। মথুরা, বৃন্দাবনের পেঁড়া পৃথিবী বিখ্যাত। বৃন্দাবনে সব মিষ্টির দোকানেই এই পেঁড়া বানায়। তবে আমার ইসকন মন্দিরের পেঁড়াই বেশি পছন্দ। মন্দিরের ভেতরেই পাবেন। চাইলে মন্দির দর্শনও সেরে নিতে পারেন। আর রাবড়ি, কুলফি মালাই খাবেনই খাবেন। উত্তর প্রদেশে দুধের যেকোনো মিষ্টির স্বাদই অতুলনীয়। চাইকি খানিক কিনে ঝোলায় বেঁধে বাড়িও নিয়ে যেতে পারেন।

আর পাবেন জামার দোকান। গেঞ্জি, পায়জামা, টি-শার্ট—সবই অভিনব ডিজাইনের। আসলে প্রচুর বিদেশির সমাগম সারা বছর থাকে, তাই এই জামা বা গেঞ্জি দেখলেই পছন্দ হয়ে যায়। দামও বেশি না।

default-image

কতগুলো সাবধানতার বিষয় উল্লেখ করে দিই। বরসানা বা নন্দগ্রামে যাওয়ার সময় খুচরো টাকা পকেটে রাখবেন, মূল পার্স নিয়ে যাবেন না, পকেটমার হতে পারে। মোবাইল খুব সাবধানে রাখবেন, আর গয়নাগাটি যেন কানে, গলায় না থাকে। ভিড়ের মধ্যে ছিনতাই হতে পারে, টেরও পাওয়া যাবে না।

আমার জীবনের অনেক ভ্রমণের মধ্যে বরসানার হোলি অন্যতম। এই উৎসব যেন প্রাণপ্রাচুর্য ও উৎসাহের বার্তা দেয়। কানে কানে যেন বলে, ওহে মানব, জীবন তোমার আনন্দরসে পূর্ণ, খুঁজে নাও তাকে। ফেরার সময়, মন তখনো আবিষ্ট হয়ে রয়েছে, বারবার কবিগুরুর একটাই গান ফিরে ফিরে মনে আসছে, ‘আকাশ আমায় ভরল আলোয়,/ আকাশ আমি ভরব গানে,/ সুরের আবির হানব হাওয়ায়,/ লয়ের আবির হাওয়ায় জানে।’

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন