বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্যারিস মানে অর্ধেক নগর আর অর্ধেক কল্পনা। প্রথম তিন দিন আইফেল টাওয়ার, লুভ, সাক্রেকা বাসিলিকা দেখেও আমি অতৃপ্ত। আমার তো লুইদের ৪০০ বছরের শাসনের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গটিই দেখা হয়নি এখনো। সে আর কিছুই নয়, লুইদের বাড়ি। প্যালেস অব ভার্সাই। ফরাসিরা একে বলে ‘শাতো দে ভার্সাই’। প্যারিস শহর থেকে একটু দূরে, তবে ট্রেনে ঝক্কিঝামেলাহীন যাত্রা। সকাল সকাল গিয়ে হাজির হলাম একেবারে ভার্সাই প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে। সোনা রঙের আধিক্য থাকা সেই প্রধান ফটকের সামনে রয়েছে চতুর্দশ লুইয়ের বৃহৎ ভাস্কর্য। কেমন ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটছে! প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতেই বিস্ময় ক্রমশ বাড়তে থাকে। এ কোন রাজপুরীতে এসে পড়লাম রে বাবা! প্রাসাদের ভেতরের প্রবেশমুখে অনেকটা ময়দানের মতো খোলা জায়গা। প্রকৃতিতে তখনো গ্রীষ্ম অবশিষ্ট। চারদিকের বাগান ফুল আর সবুজে সুশোভিত। প্রবেশমুখের জায়গাটা খানিক উঁচু। খানিক সামনে এগিয়ে হাতের ডানে পা ফেলতে হবে। একটার পর একটা পুকুরসদৃশ জলাধারে পানির ফোয়ারা, আর তার মধ্যে নানাবিধ ভাস্কর্য। এই রাজপ্রাসাদে ৪০০ ভাস্কর্য ও ১ হাজার ৪০০ ঝরনা আছে। ভাবা যায়! জলাধারের দুই পাশে ঘন সবুজ বাগান। না, বাগান তো নয়, যেন ঘন বন।

default-image

বনের প্রতিটি গাছ যেন একেকজন সৈনিক—সোজা দাঁড়িয়ে, একটুও এদিক–ওদিক হেলে নেই বা বেঁকে নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটিও আগাছা নেই। ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে আছে, তাই বোধ হয় এমন। আমি হাঁটছি সামনে, কিন্তু কোনো কূলকিনারা তো পাচ্ছি না। এ পথের শেষ কোথায়? দূরের জলাধারগুলো অনেকটা লেকের মতো। এ রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার সৌন্দর্যবোধ ও জীবনদর্শন নতুন আঙ্গিক পাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বসার বেঞ্চ আছে। ভাবলাম একটু জিরিয়ে নেই। গুগল এই রাজবাড়ির যে আয়তন দেখাচ্ছে, তা আমাদের ঢাকার ধানমন্ডি এলাকারও দ্বিগুণ। ভার্সাই প্রাসাদ পৃথিবী বিখ্যাত ফরাসি রাজপ্রাসাদ। প্রতিবছর দেড় কোটি পর্যটকের আগমন ঘটে এ প্রাসাদে। খোঁজার চেষ্টা করছিলাম ঠিক কবে থেকে কীভাবে তৈরি হলো এই রাজবাড়ি।
ইতিহাস বলছে, ফ্রান্সের রাজবংশ লুইদের মূল বাসস্থান ছিল প্যারিসে। প্যারিস থেকে দূরে রাজা ত্রয়োদশ লুই তাঁর শখের শিকারের জন্য একটি জায়গা খুঁজছিলেন।

শিকারের সেই স্থান নির্বাচন করলেন ভার্সাই নামের একটি গ্রামের কাছে। একটি পাহাড়ে শিকার করার জন্য একটি শিকারি লজ তৈরি করা হলো। শিকারি লজ মূলত শিকারিদের থাকার জন্য বন বা পাহাড়ে নির্মিত ভবন। স্থানটি ছিল বৃক্ষে আচ্ছাদিত একটি জলাভূমি। একদা রাজা ত্রয়োদশ লুইয়ের আদালত এটিকে রাজার বাসের অযোগ্য বলে তিরস্কারও করেছিলেন। তাঁর রাজদরবারের একজন সভাসদ বা দরবারি মন্তব্য করেছিল, ‘একজন সাধারণ ভদ্রলোকের আভিজাত্য বা অহংকার প্রদর্শনের জন্যও এটি উপযুক্ত স্থান নয়।’ তাই ভার্সাইয়ের এই লজের স্থলেই রাজা ত্রয়োদশ লুই একটি শাতো নির্মাণ করেন। সালটি ১৬২৩। শাতো হচ্ছে একধরনের ম্যানর হাউস।

default-image

ম্যানর আসলে আমরা যেমন বলি ম্যানশন, ঠিক তেমন। যেমন আমরা বাসার নামকরণ করি অমুক ম্যানশন তমুক ম্যানশন। শাতো বা ম্যানর শব্দটির সঙ্গে ভূমিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার প্রকট মিল আছে। শাতো ঐতিহাসিকভাবে জমিদারের প্রধান বাসস্থান। ইউরোপীয় সামন্ত ব্যবস্থায় কোনো জমিদারের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবেই শাতো ব্যবহৃত হতো। এ ধরনের বাসস্থানে আমাদের বৈঠকখানার মতো বড়ো কক্ষ থাকত, জমিদারিসংক্রান্ত বিচারালয় বা আদালত থাকত বা বসত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে এখানে ভোজের ব্যবস্থা হতো। সে সময় প্যারিসে ত্রয়োদশ লুইয়ের স্থায়ী নিবাসে গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটলে লুই ভার্সাইয়ে তিন বছর বয়সী সন্তানসহ অবস্থান নিয়েছিলেন।

১৬৫০-এর দশকে চতুর্দশ লুইও ভার্সাইয়ে শিকার করতেন নিয়মিত। কিন্তু ১৬৬১ সাল পর্যন্ত তিনি ভার্সাইয়ের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখাননি। ১৯৬১ সালের ১৭ আগস্ট ঘটল একটি মজার ঘটনা। চতুর্দশ লুইয়ের আর্থিক সুপারিনটেনডেন্ট নিকোলাস ফুক তাঁর অভিজাত বাসভবন ‘শাতো দে ভক্স লে ভিকন্ত’-এ এক সাড়ম্বর উৎসবের আয়োজন করেন, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজা চতুর্দশ লুই। চতুর্দশ লুই সেই প্রাসাদ ও প্রাসাদের বাগান দেখে বিমোহিত। ফুকের অভিজাত ভবনটি লুইয়ের আদালতের স্থপতি লুই লে ভাউ, রাজকীয় মালি আন্দ্রে লে নত্রে ও রাজপরিবারের চিত্রকর চার্লস লে ব্রুন—এই তিনজনের তৈরি করা। এর সৌন্দর্য লুইয়ের নান্দনিক বোধকে অনুপ্রাণিত করে।

default-image

পরের সেপ্টেম্বর মাসে রাজা অনুপ্রাণিত হয়ে ভার্সাইয়ে নিজস্ব প্রকল্পের জন্য এর প্রস্তুতকারীদের দায়িত্ব দেন এবং প্যালেস অব ভার্সাইকে সম্প্রসারিত করার কাজ শুরু হয়। প্রথমে মনোনিবেশ করা হয় পার্ক ও বাগান তৈরিতে। কিন্তু ১৬৬৮-৬৯ সময়কালে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে চতুর্দশ লুই ভার্সাইকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজকীয় আবাসে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যুদ্ধে অর্থ ব্যয়ের কারণে এ রাজপ্রাসাদ পূর্ণাজ্ঞ রূপ পেতে বারবার সময় ব্যয় হচ্ছিল বেশি। যুদ্ধের কারণে রাজতহবিল কমে। ইউরোপের ৯ বছরের যুদ্ধের সময়ে, প্রাসাদের কাজ পুরোপুরি বন্ধ ছিল ১৬৮৮ থেকে ১৬৯৮ পর্যন্ত। এরপর আরও ব্যয়বহুল স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হয, ফ্রান্সকে সংকটে ফেলে দেয়। চতুর্দশ লুই কিছু পরিকল্পনা বাতিল করেন।

চতুর্দশ লুই ১৭১৫ সালে মারা যান এবং নতুন রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। সে সময় সরকার অস্থায়ীভাবে ভার্সাই থেকে প্যারিসে স্থানান্তরিত হয় ডিউক অব অরলিয়ান্স ফিলিপ দ্বিতীয়ের অধীন। ১৭২২ সালে রাজা পঞ্চদশ লুই বড় হন। তিনি তাঁর বাসস্থান ও সরকারকে ভার্সাইয়ে সরিয়ে আনেন আবার, যেখানে ফরাসি রাজকর্মকাণ্ড ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পঞ্চদশ লুই তাঁর প্রপিতামহের মূল পরিকল্পনার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন এবং ভার্সাইয়ের বহির্বিভাগে কিছু পরিবর্তন করেন। তাঁর প্রধান অবদান ছিল হারকিউলিসের সেলুন ও রয়েল অপেরা থিয়েটার নির্মাণ।

default-image

ষোড়শ লুই এবং অস্ট্রিয়ার আর্কডাচেস মারি আঁতোয়ানেতের বিবাহ অনুষ্ঠান উদ্‌যাপনের জন্য নতুন অপেরা থিয়েটারটি সময়মতো সম্পন্ন করা হয়। পঞ্চদশ লুই রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে অসংখ্য সংযোজন ও পরিবর্তন করেন, যেখানে তিনি, রানি, তাঁর কন্যা ও তাঁর উত্তরাধিকারী থাকতেন। পরবর্তীকালে ক্রমবর্ধমান আর্থিক অবনতির কারণে রাজপ্রাসাদে বড় ধরনের পরিবর্তন করা থেকে বিরত থাকেন ষষ্ঠদশ লুই। সে সময় বাস্তিল আন্দোলনের সূচনা হয়। রাজা ও রানি প্যারিসে সংঘটিত বাস্তিল আন্দোলন সম্পর্কে সর্বদা অবগত থাকতেন। সে সময় তাঁরা প্যারিস থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে ওই সময় প্যারিসে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিসে ক্রমবর্ধমান ক্রোধের কারণে ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর নারীদের একটি লংমার্চ ভার্সাইয়ের দিকে আসতে থাকে। রুটির উচ্চ মূল্য ও ঘাটতির প্রতিবাদে কয়েক হাজার নারী-পুরুষ প্যারিস থেকে ভার্সাই পর্যন্ত মিছিল করেন। তাঁরা শহরের অস্ত্রাগার লুট করেন। প্রাসাদ ঘেরাও করেন। রাজা ও রাজপরিবার এবং জাতীয় পরিষদের সদস্যদের পরের দিন প্যারিসে তাঁদের সঙ্গে ফিরতে বাধ্য করেন। রাজবাড়ি হয়ে যায় রাজাশূন্য। আসবাব, আয়না, গোসলখানা, রান্নাঘরের সরঞ্জামসহ প্রাসাদের সাজসজ্জা ১৭ হাজার লটে বিক্রি হয় সেই উত্তাল সময়ে। ভবনগুলোর সব রাজকীয় প্রতীক ছিন্নভিন্ন করা হয়। খালি ভবনগুলো পাঠাগার আর শিল্পসামগ্রীর মজুতক্ষেত্রে পরিণত হয়। শূন্য গ্র্যান্ড অ্যাপার্টমেন্টগুলো ১৭৯৩ সালে পর্যটকদের দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয় প্রথম। কিছু শূন্য ঘরে ফ্রেঞ্চ পেইন্টিংয়ের ছোট জাদুঘর খোলা হয়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন ১৮০৪ সালে ফরাসিদের সম্রাট হন, তখন তিনি ভার্সাইকে তাঁর বাসস্থান বানানোর কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু সংস্কার খরচের বাহুল্যের কারণে পরে তিনি তা করা থেকে বিরত থাকেন। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পতনের সঙ্গে সঙ্গে ষষ্ঠদশ লুইয়ের ছোট ভাই অষ্টাদশ লুই রাজা হন এবং রাজকীয় বাসভবন ভার্সাইয়ে ফিরে আসার কথা বিবেচনায় নেন, যেখানে তিনি জন্মেছিলেন। তিনি রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্টগুলো সংস্কারের আদেশ দেন। ফরাসি বিপ্লবের পর নতুন রাজা হলেন লুই-ফিলিপ। তিনি ভার্সাইয়ে থাকেননি, কিন্তু ‘ফ্রান্সের ইতিহাস জাদুঘর’ তৈরি শুরু করেন এই ভার্সাই রাজপ্রাসাদে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এ রাজমহলের দ্য হল অব মিররসে ।

default-image

প্রাসাদ অভ্যন্তরে আমার সবচেয়ে বেশি মন কেড়েছে ‘হল অব মিরর’। এটিই তো সেই স্থান, যে স্থান থামিয়ে দিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ? এ হল ৩৫৭টি আয়নায় আচ্ছাদিত। না, আমি গুনে দেখিনি, বিশ্বাস করেছি। চোখধাঁধানো বিস্ময়। দ্য হল অব মিররস চমকপ্রদ, ঝলমলে নকশার জন্য বিখ্যাত। তিন হাজার বাতি জ্বালিয়ে পুরোপুরি আলোকিত করা হয় একে। প্রাসাদ নির্মাণ ও সাজানোর জন্য ব্যবহৃত সব উপকরণ ফ্রান্সে তৈরি করা হয়েছিল। সে সময় আয়না তৈরিতে একচেটিয়া সাফল্য ছিল ভেনিসের। ফরাসিরা কৌশলের আশ্রয় নিল। তারা ভেনিসের কারিগরদের প্রলুব্ধ করল। ফ্রান্সের আয়না তৈরির রহস্য উন্মোচিত হওয়ার পর ভেনেসিয়ান সরকার আয়না নির্মাতাদের হত্যার আদেশ দেয়।

আমি বিমোহিত ফরাসিদের সৌরভে, সৌন্দর্যে ও বীরত্বে। পৃথিবীর আর যদি একটি জাতিগোষ্ঠিরও কোনো রাজপ্রাসাদ এ জীবনে আমি না দেখি, তাবু আমার কোনো খেদ থাকবে না।

আমি কেবল ক্লান্ত হয়েছি, কিন্তু এর শেষ ছুঁতে পারিনি।

লেখক: গবেষক ও পরিব্রাজক
ছবি: লেখক

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন