লেডিস ডে আউট

অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
বিজ্ঞাপন

আজ লেডিস ডে আউট। তবে সঙ্গে ফেউ জুটে গেছে। ছাও পাও ঘরে রেখে আসা যায়নি। তারা যথারীতি ট্রেন কাঁপিয়ে ফেলেছে। তাও ভালো, কামরার এদিকটায় লোকজন কম। দুই সিট পেছনে শুধু দুই তরুণ বসে আছে। তারাও জোরসে গান ছেড়ে চুক চুক করে বিয়ার টানছে। হল্লাহাটির অভাব নেই। এর মাঝেই আমরা কজন বঙ্গ ললনা আধবোজা চোখে আধগরম সমুচা চিবোচ্ছি।

default-image

গরমের এই সময়টায় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ছুটি থাকে। তার সঙ্গে মিলিয়ে দিন কতক ছুটি নিতে হয়েছে। সময়টা শুয়ে-বসে কাটিয়ে দেব, এই ছিল আলসে ফন্দির ফানুস, পিন দিয়ে ফুটিয়ে আমাকে টেনে বের করা হয়েছে ভুলিয়ে ভালিয়ে। এমন ঝটিকা সফরের আয়োজন খুব পাকা হাতের কাজ। মুখোমুখি সিটে গা এলিয়ে বসে মৌরি আপুর মুখে বিজয়ীর হাসি। ‘কি, কেমন লাগছে?’। ঠান্ডা কমলার জুসে চুমুক দিতে দিতে একান ওকান হেসে উত্তরটা দেওয়া হয়ে গেল। পথে যেতে যেতে সমুচা-শিঙাড়া, অদেখা শহরতলির অলিগলিতে এলোমেলো হেঁটে বেড়ানো, লেকের পাড়ে পিকনিক, ব্যস—আর কিছু বলতে হয়নি। হাতের কাছে জামা-জুতা যা পেয়েছি, হাতে-পায়ে গলিয়ে এক ছুটে এই বব গাড়ি ধরেছি।

বব গাড়িই তো। ট্রেনের গায়ে বড় বড় করে লেখা আছে, BOB। বায়েরিশা ওবারল্যান্ডবান-এর সংক্ষেপ। জার্মান ঢং আর এমন কি, শুনেছি সুইস রং নাকি আরেক কাঠি সরেস। তাদের কোনো এক ট্রেন সার্ভিসের নাম, ফ্লার্ট। খটমটে বারো হাত নাম ‘ফাস্ট লাইট ইন্টার-সিটি অ্যান্ড রিজওনাল ট্রেন’। ছোট্ট হয়ে গিয়ে দারুণ দুষ্টু এলআইআরটি (ফ্লার্ট) হয়ে গেছে। অমন ট্রেনে চেপে কাজ নেই। তার চেয়ে বব ভাইয়াই ভালো।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শহরের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ট্রেন ছুটে চলছে সারি সারি ভুট্টাখেতের মাঝ দিয়ে। এমন ঘন খেতের আড়ালে অনায়াসে এক-আধটা ইউএফও লুকিয়ে থাকতে পারে। হঠাৎ কচু পাতা রঙের কোনো হ্যান্ডসাম এলিয়েনের দেখা পেলে মন্দ হতো না। আজ লেডিস ডে বলে কথা। ঝাড়া হাত-পা। হা করে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি দেখে তুনা প্রশ্ন ছুড়ল, ‘আপু বোধ হয় খুব একটা বেড়াতে বের হন না?’ এলিয়েন খোঁজা বাদ দিয়ে অল্পবয়সী বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালাম।

default-image

হালকাপাতলা ছিপছিপে তুনাকে দেখে বুয়েট পাস মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মনেই হয় না। তার সঙ্গে ইদানীং যোগ হয়েছে একটা জার্মান এমএস। আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই পিএইচডি পাস ফ্রাউ ডক্টর মৌরি আপু যোগ করল, ‘ওর আসলে “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া” অবস্থা। যে দেশে বাস, সেটাই দেখা হয়নি।’ ব্যাপারটা সলজ্জে মাথা নেড়ে স্বীকার করতেই হলো। কড়ে গুনলে প্রায় বছর আষ্টেক আছি এই প্রবাসে। কিন্তু জার্মানি বলতে ওই মিউনিখই বুঝি। কুয়ার ব্যাঙ যাকে বলে। তবে ব্যাঙটা আজ এই বিদ্যাবতী বিদুষীদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মানুষ হওয়ার একটা ট্রাই মেরে দেখবে।

২.

গল্পে-আড্ডায় সময় কর্পূরের মতো উধাও। মাঠ-ঘাট, পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পাতার ফাঁকে নীল জল ঝিলিক দিয়ে উঁকি দিল। ট্রেন এসে থামল টেগের্নসি স্টেশনে। নামের সঙ্গে ‘সি’ থাকা মানেই এখানে একটা লেক আছে। ‘ইংরেজিতে যাহাই লেক, জার্মানে তাহাই “সি”’। সমতল থেকে প্রায় সাড়ে ৭০০ মিটার উঁচুতে বাভারিয়ান আলপস ঘেরা টেগের্নসি নাকি জার্মানির টপ টেন লিস্টে থাকা লেক। আজ তাহলে সৌন্দর্য পরীক্ষা হয়ে যাক। সত্য হলে ‘আরে ওয়াহ্, ওয়াহ্’ বলে খৈয়াম কিংবা গালিবের রোমান্টিক দু-একটা শের-শায়েরি ঝেড়ে দেব। আর মিথ্যে হলে লেক পাড়ের কোনো গাছের ডাল ভেঙে রেখে যাব। বহুত খতরনাক লোক আমরা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাচ্চাওয়ালা ভদ্রমহিলা বলতেই যে সাদাকালো ম্যাটমেটে ছবিটা ভেসে ওঠে, সেটাকে দু-আঙুলে টশকে দিয়ে বাচ্চা আর ভদ্রমহিলা আমরা ট্রেনের উঁচু সিঁড়ি টপকে লাফিয়ে নেমে এসে মাঝদুপুরের কড়া রোদকে বাঁকা হেসে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালাম। আমাদের চৌকস ল্যান্ডিং দেখে আরও ১০ সেকেন্ড আগে নেমে পড়া টগবগে তরুণী তুনা কুমারী খাপখোলা সামুরাই সোর্ডের মতো ঝনঝনিয়ে হাসছে।

default-image

লেক-টেকের আর তোয়াক্কা না করে ঘষামাজা সাইনবোর্ড ঝোলানো দুই নম্বরি চেহারার এক চায়নিজ রেস্তোরাঁ বরাবর পা চালালাম। ক্ষুধাই আসল। বেড়ানো নকল। সৌন্দর্য গিলে কবে কার পেট ভরেছে, ঠিক মনে পড়ছে না। তবে স্টার ফ্রাই ভেজিটেবল উইথ স্টিমড রাইস খেলে পেট-মন দুটোই যে সমান তালে ভরবে, তা কি আর বলে দিতে হয়। সয়া সস ছিটিয়ে সাদা ভাত কালো করে দিতে দিতে আলাপ এগোতে থাকল। ঠিক হলো, ছক বেঁধে কিছু করা যাবে না। যেদিকে দুচোখ যায়, সেদিকে হাঁটব। ঘুরঘুর লাটিম লাটিম একটা দিন। আর, পা বাড়ালে পথ নাকি আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়।

কাঠের দেয়ালগুলোতে হোটেল হোটেল কমার্শিয়াল গন্ধ নেই। তার বদলে আছে বারান্দা উপচে পড়া ফুলের সুবাস। ফুলের থোকাগুলো যেন বাড়ির মালিকের রুচির সার্টিফিকেট হয়ে ঝুলে আছে ব্যালকনির ফোকর গলে।

বিল চুকিয়ে শুরু হলো আমাদের দিগ্‌বিদিক হন্টন। এই খেয়ালখুশির এলোমেলো হাঁটাকে অবশ্য পাঁচ মিনিটে লাইনে নিয়ে এল মৌরি আপু। সে আজকের রাখাল। বার দুই দাবড়ানি খেয়ে ভেড়ার পাল আমরা রীতিমতো রাস্তার নাম ধরে ধরে এগোচ্ছি। কোথায় গেলে কতক্ষণে যে একটু জাবর কাটার অবসর মিলবে, কে জানে। আয়েশি চিন্তাটার সঙ্গে দুপুরের রোদটা মিশে গিয়ে আরামদায়ক আবেশে চোখ বুজিয়ে দিতে চাইছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৩.

পথটা নেহাত কম না। একঘেয়েমি লাগছে না যদিও। পথের ধারে বাহারি বাড়িগুলো দেখার মতো। এগুলো ছোট ছোট গেস্টহাউস। কাঠের দেয়ালগুলোতে হোটেল হোটেল কমার্শিয়াল গন্ধ নেই। তার বদলে আছে বারান্দা উপচে পড়া ফুলের সুবাস। ফুলের থোকাগুলো যেন বাড়ির মালিকের রুচির সার্টিফিকেট হয়ে ঝুলে আছে ব্যালকনির ফোকর গলে। কোথাও বারান্দার এধার থেকে ওধার জুড়ে শুধুই রক্ত লাল গোলাপ। কোনো বাড়ির ফুল হালকা গোলাপি থেকে গাঢ় হতে হতে বেগুনি বনে গিয়ে একেবারে লতিয়ে সদর দরজায়ে নেমে এসেছে। এমন জায়গায় দিন দুই কাটালে জব্বর হতো।

default-image

উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তায় এখন রীতিমতো হাঁপ ধরে যাচ্ছে। আরেকটু এগোলেই নাকি পৌঁছে যাব। মৌরি আপুর মনভোলানো কথাও হতে পারে। তাও সরল মনে পা চালিয়ে যাচ্ছি। খানিক বাদেই বায়ের অদ্ভুত পথটা দেখে থামতে হলো। ঢালু হয়ে কোথায় যে নেমে গেছে, বোঝার উপায় নেই। দুপাশে নেই বাড়িঘর, নেই গাড়িঘোড়া। শুধু গাছগাছালি। সবুজ ডিঙিয়ে চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়চূড়ার মরীচিকায়। যেন হাত বাড়ালেই নাগাল মিলবে। কোত্থেকে হঠাৎ এক বুনো বাদামি খরগোশ লাফিয়ে উঠে মিলিয়ে গেল। কৌতূহলে এগিয়ে গেলাম এক পা। যাব নাকি এই পথে? হারিয়ে যাওয়ার হাতছানিটা মায়াবী সুরে ডাকছে ‘আয় আয়’। ওদিকে বাকিরাও ডাকছে খুব। নাহ্, হাতছানিটা ফিরিয়ে দিতে হলো। খরগোশের পিছু ছোটা আর হলো না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৪.

কাঠের সাঁকো এঁকেবেঁকে চলে গেছে লেকের পাড় ঘেঁষে। ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে চলছি। স্বচ্ছ জলে এক-আধটা মাছ উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতরের বড়শিটা টোপ লাগিয়ে তৈরি হতে চাইছে। ভাজা মাছের মচমচে ঘ্রাণ কল্পনা করে নিতে একটুও বেগ পেতে হলো না। পানির বাতাস খিদে চাগিয়ে দিতে ওস্তাদ।

default-image

চারদিকে শুধু পাহাড় আর পর্বত। তারই ঠিক মাঝখানে কাকচক্ষু জল টেগের্নসি। আকাশের আঙিনায় ঘাসফুল মেঘ এখানে ওখানে ছন্নছাড়া ভবঘুরের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট ফেরি যাত্রী নিয়ে খুব ধীরে এগোচ্ছে। কারোই কোনো তাড়া নেই। তবে আজ বাতাসের খুব তাড়া। জলে ঢেউ ভাঙিয়ে ছাড়ছে সাগরের আদলে। উইন্ডসার্ফিং করতে আসা লোকজনের পোয়াবারো। বাতাস ফুঁড়ে উজ্জ্বল লাল-নীল পাল উড়িয়ে ছুটছে তারা। টেগের্নসি জায়গাটা আসলেই সুন্দর।

স্বচ্ছ জলে এক-আধটা মাছ উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতরের বড়শিটা টোপ লাগিয়ে তৈরি হতে চাইছে। ভাজা মাছের মচমচে ঘ্রাণ কল্পনা করে নিতে একটুও বেগ পেতে হলো না। পানির বাতাস খিদে চাগিয়ে দিতে ওস্তাদ।

আলোছায়া লুকোচুরি খেলছে, এমন জায়গা খুঁজে চাদর বিছিয়ে বসে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী আলসেমিটা ছেঁকে ধরল। মনে হলো, বনবন্ না ঘুরে আজকের দিন শুয়ে-বসে এখানেই গড়িয়ে দিই না। মাথার ওপর চড়া সূর্যটাও যেন সায় দিয়ে বলল, ‘চিল ম্যান, চিল। এই রোদ্দুরে ঘুরে কাজ নেই।‘ মাঝদুপুরের রোদকে ‘কুল ডুড’ মেনে তার উপদেশ আমরা মাথা পেতে নিলাম। (বাকি অংশ কাল)

লেখক: লেখক: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন