লেডিস ডে আউট

অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
বিজ্ঞাপন
নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে উল্টো রসের সমুদ্দুরে এসে পড়েছি। এক যুগল খুবসে ভাব বিনিময় চালিয়ে যাচ্ছে। একটু আগে যে কটা আঙুর খেয়েছি, এই নর-নারী এই পাঁচ মিনিটেই তার চেয়ে বেশি চুমু খেয়ে ফেলেছে। তারপর, আচমকাই চুমুবিদ্যার সর্ব-ইউরোপীয় কেতা বাদ দিয়ে বিশেষায়িত ফ্রেঞ্চ কায়দার দিকে ঝুঁকে পড়ল।

গতকালের পর...

৫.

ব্যাগ থেকে এক বাক্স আঙুর উঁকি দিচ্ছে। ভরপেট থাকায় সেটা কারও নেক নজরে পড়ল না। বাক্সটা কাছে টেনে নিলাম আল পটকা। গাছের সুশীতল মৃদুমন্দ ছায়ায় কাত হয়ে শুয়ে একটা একটা করে আঙুর মুখে পুরে দেওয়ার মাঝে বেশ একটা আভিজাত্য টের পাচ্ছি। নিজেকে হঠাৎ টেগের্নসির সুলতানা মনে হচ্ছে। মনে মনে অত্র অঞ্চলকে মুলক্-ই-টেগের্নসি ঘোষণা করলাম। এত বড় সালতানাৎ চালানো সহজ কথা নয়। পরিশ্রমের কাজ। প্রচুর আঙুর খেতে হয়। দ্রুত চোয়াল চালাতে থাকলাম।

default-image

টলটলে পানির হাতছানি উপেক্ষা করা মুশকিল। মৌরি আপু আর তুনা গিয়ে দুটো ঝপাং ডুব দিয়ে এসে হি হি করে কাঁপছে। কোন ফাঁকে যে গুনগুনিয়ে ভ্রমর এসে হাজির, কেউ টের পেলাম না। তবে মানুষের তৃতীয় নয়নটা বোধ হয় মাথার ঠিক পেছনেই থাকে। তাতে ধরা পড়ে গেল কেউ একজন ড্যাবড্যাবিয়ে এদিকেই চেয়ে আছে। ঘাড় ঘোরাতেই তামিল চেহারার কালপ্রিট ধরা পড়ে গেল। লেকময় সাদা চামড়ার অমল ধবল রমণীদের জলকেলি রেখে আধভেজা ফতুয়া-তোয়ালে জড়ানো জবুথবু বঙ্গ ললনায় মজে যাওয়ার কারণ কী, ঠিক বোঝা গেল না। তামিলদের দক্ষিণে কি দুর্ভিক্ষ চলছে নাকি। কোথাও তো পড়িনি যে ‘চেন্নাই শহরে নারীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। তামিল পুরুষেরা দক্ষিণ ছেড়ে উত্তরের বঙ্গ ললনার সন্ধানে দলে দলে দেশ ছাড়ছে। তাদের অবস্থা “যেখানে পাইবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই” ধরনের শোচনীয়...’ ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই পাজি রজনীকান্তের কি মা-বউ কেউ নেই নাকি, ভেবে চারিদিক রেকি করতেই মোচওয়ালা এক তাগড়া মহিলা লোকটার পাশ থেকে খুনে চাহনি হানল। বাবারে, কাজ নেই আর অভিযোগ জানিয়ে। সাক্ষাৎ বউয়ের পারমিশন নিয়ে ‘মিশন ড্যাবড্যাব’-এ নেমেছে এই তামিল হিরো। তাকে থামায় সাধ্যি কার। অতএব আমরাই পাততাড়ি গুটিয়ে কেটে পড়লাম।

default-image

অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়—কথাটার ভেতর ঘাপলা আছে। নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে উল্টো রসের সমুদ্দুরে এসে পড়েছি। এক যুগল খুবসে ভাব বিনিময় চালিয়ে যাচ্ছে। একটু আগে যে কটা আঙুর খেয়েছি, এই নর-নারী এই পাঁচ মিনিটেই তার চেয়ে বেশি চুমু খেয়ে ফেলেছে। তারপর, আচমকাই চুমুবিদ্যার সর্ব-ইউরোপীয় কেতা বাদ দিয়ে বিশেষায়িত ফ্রেঞ্চ কায়দার দিকে ঝুঁকে পড়ল। তিন হাত দূরের এই লাইভ দৃশ্য তো আর টিভি পর্দার এইচবিও নয় যে রিমোট চেপে বিবিসি, সিএনএন-এর জলবায়ুবিষয়ক খবরে লাফ দেব। তাই দুর্বল হৃৎপিণ্ড চেপে লেকের পাড়েই পালিয়ে এলাম লাফিয়ে। ছায়াবিথি তলে শুয়ে দুলাইন কবিতাও চলে এসেছিল মাথায়। নটঘট তাণ্ডবে সেটুকুও গেল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৬.

আঠালো জুটির ফরাসি ক্লাইমেক্সের খপ্পর থেকে বেরিয়ে ভালোই হয়েছে। ইচ্ছেমতো পানিতে নুড়ি ছুড়ে তোলপাড় ফেলে দিচ্ছি। একটা যুক্তিহীন আনন্দ কাজ করছে। মনের শিশু কীভাবে যেন ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে এসেছে। এগিয়ে এসে তার সঙ্গে জুটেছে দুটো আসল শিশু। আর আমাদের পায় কে। চিৎকার-চেঁচামেচিতে এলাকা কাঁপিয়ে ফেলেছি। পাথর ছোড়া ব্যাপারটা দেখলাম বেশ থেরাপিউটিক। শহুরে শ্রান্তি পাথরে পেঁচিয়ে ছুড়ে মারলে তারা দেখছি উধাও হয়ে যাচ্ছে পটাপট। ক্লান্তি জেঁকে না ধরা পর্যন্ত চলল বিনে পয়সার থেরাপি পর্ব।

default-image

তারপর ক্লান্তিটা ক্যাঁক করে চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে নুড়ি খেলায় ইস্তফা দিয়ে ধপ করে বসে পড়লাম ঘাসে। মৌরি আপু আর তুনা ততক্ষণে রোদে শুকিয়ে খটখট। তারা প্রস্তাব তুলল, এক দফা গানের কলি খেলা যাক। প্রস্তাব শুনে মাঝারি সাইজের ঢোঁক গিললাম। দুজনেরই গানের সঙ্গে ওঠবস আছে বেশ। কিন্তু এই শর্মা তাতে যোগ দিলে গান আর সংগীত থাকবে না। ইমোশনাল অত্যাচারে গিয়ে ঠেকবে। শিল্পের এই কলায় আমি একদম কাঁচকলা। দেখা গেল, এমন গান গাইলাম যে বিকিনি সুন্দরী পিঠের ফিতা না বেঁধেই পালিয়ে গেল, ছোকরাগুলোও তাস ফেলে ছুটল তার পিছু পিছু। আর লোলুপ রজনীকান্ত রমণীদর্শন বাদ দিয়ে দৌড় লাগাল। রাসলীলায় ব্যস্ত যুগলও রাগে-দুঃখে বিলা হয়ে রওনা দিল আরেক দিকে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এত অঘটনের সাক্ষী হতে পারব না। তাই শ্রোতা বনে বাকিদের উৎসাহ দিয়ে অনুরোধের আসর শুরু করে দিলাম। জোর বাতাসের তোড়ে ঢেউভাঙা টেগের্নসির পাড়ে ‘ওরে নীল দরিয়া’ খুব জমে উঠল। তারপরের গানগুলো কীভাবে যেন আরও ব্যাক গিয়ার দিয়ে কয়েক দশক পিছিয়ে উত্তম-সুচিত্রার যুগে ঘুরে গেল। হেমন্তের ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ দিয়ে শুরু করে কিশোর কুমার ছুঁয়ে, শেষে সন্ধ্যা নামিয়ে দিলাম সন্ধ্যা মুখার্জিতে। ‘এ শুধু গানের দিন, এ লগন গান শোনাবার...’। বাংলা ভাষা আসলে শার্টের বুকপকেটের মতো। গায়ে চাপিয়ে যত দূরেই যাই না কেন, সুর হয়ে সে থেকে যায় বুকের ভেতর।

default-image

হেলে পড়া সূর্যটার তাড়ায় লটবহর গুছিয়ে অনেকখানি পা চালিয়ে বব গাড়ি ধরেছি আবার। বাচ্চারাও পুরোনো মেজাজে ফিরে গেছে। গলা সপ্তকে চড়িয়ে শিয়ালের হুক্কাহুয়া তান ধরেছে তারা। ট্রেনের শেষ মাথা থেকে আরও কতগুলো শিয়ালের ছাও একই রবে তাদের অস্তিত্ব জানান দিল। এটা তাদের নিজস্ব মোর্স কোড। বাকি পথ এই টরে টক্কা সিগনাল চালাচালির মাঝে বসে যেতে হবে ভেবেই মাথা ধরে গেল চিং করে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সবকিছু উপেক্ষা করে চোখ বুজে গা এলিয়ে দিলাম। টেগের্নসিময় টই টই না ঘুরেও মন আজ তৃপ্তিতে টইটুম্বুর। কাছেপিঠে কোথাও বেরিয়ে পড়ে পাটি বিছিয়ে আকাশ দেখাটাও দেখছি এক ধরনের ভ্রমণ। কে জানত, দুই পয়সার বাজেট ঘোরাঘুরিতেও যে দশ পয়সার আনন্দ আর রোমাঞ্চ মিলতে পারে। এই না হলে ইকোনমিক লেডিস বুদ্ধি!

default-image

নতুন একটা ফন্দি উঁকি দিল হঠাৎ। মিউনিখের বাঙালি প্রমীলাসমাজকে এক করে একটা ক্লাব খুলে ফেললে কেমন হয়। ক্লাবের নাম হবে, ‘লেডিস সু ক্লাব’। মাঝেমধ্যেই আমরা দল বেঁধে এক-আধ বেলার ঝটিকা সফরে চলে যাব। আর দিন শেষে সব ক-জোড়া জুতা নানান ঢঙে জড়ো করে অ্যাস্থেটিক এক ফটো খিঁচে বাড়ি ফিরে আসব। সম্ভাব্য আরেকটা মিনি ভ্রমণের প্রস্তাব তুলে আমরা লেডিস সু ক্লাবের প্রথম সদস্যরা আলাপে মশগুল হয়ে পড়লাম। শিশুদের হুক্কাহুয়া ছাপিয়ে আমাদের গল্প-আড্ডা আর হাসিতে বব গাড়ির কামরা তরল হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। (সমাপ্ত)

লেখক: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন