default-image
বিজ্ঞাপন

সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। একসময় কিছুটা স্থবিরতা এলেও একে ঠিক থামা বলা যায় না। প্রবল রোদনের ফাঁকে একটু ফুঁপিয়ে নেওয়া আর কি! কপালে চিন্তার ভাঁজ। গত সপ্তাহের ছুটির দিনও এমন বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল। কথা দিয়েও তাই বের হতে পারিনি। আনারসবাগানের মালিক মোসাহিদ আজও সেই সকালেই ফোন করেছেন, কবে বের হচ্ছি। উৎকণ্ঠা বুঝতে পেরে প্রকৃতিও কিছুটা সদয় হলো যেন। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়েছে। ছাতা মাথায় বের হয়েই দুই ভ্রমণসঙ্গীকে ফোন করি।

বৃষ্টিতে নেয়ে তকতকে পরিচ্ছন্ন ঢাকা-মৌলভীবাজার মহাসড়ক ধরে আমাদের বাহন অটোরিকশা ছুটেছে শ্রীমঙ্গলের পানে। গন্তব্য মাজদিহির আনারসবাগান। যেতে যেতে বৃষ্টিভেজা সবুজ মাঠ, পাতার ওপর জমাট জল নিয়ে পথের ধারে কচুর বুনোট, সিক্ত সতেজ সেগুনের বন রেখে পথ পেরোয়। একসময় সামনে পড়ে ভৈরববাজার। গন্তব্যের পথ এবার মহাসড়ক ছেড়ে বাঁয়ে বাঁক খায়। চিকন মসৃণ পথের নাম মিতিঙ্গা রোড। যেতে যেতে চোখে পড়ে দুপাশে টিলার মতো পাহাড়ের সমারোহ। একপাশে নিবিড় ঘন রাবার বনের আচ্ছাদন। অন্যপাশে চা-গাছে শোভিত টিলা রেখে বাহন ছুটে চলেছে। পথের পাশে চায়ের চারা গাছের ছাউনি পেরিয়েই চালককে থামতে বলি।

তিন চাকার বাহনের গন্তব্য এ পর্যন্তই। আমাদের এখন দুটো টিলা পেরোতে হবে হেঁটে। তারপরই আনারসবাগানটির টিলার অবস্থান। পাদদেশ থেকে টিলার ওপর এক চিলতে পথ ধরে উঠতে শুরু করি। চা-গাছের ফাঁকফোকর বেয়ে পেছন পেছন ভ্রমণসঙ্গী সহকর্মী নাহিয়ান ও সাগর। এখানে চা-গাছের বুনোট ততটা ঘন নয়। টিলার নিচে পাহাড়ি ছড়ায় স্রোত বয়ে যাওয়ার শব্দ। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে বাগানমালিক মোসাহিদ এগিয়ে নিতে চলে এসেছেন।

default-image

পরের টিলাটি বেশ বড় ও উঁচু। খাড়া পথ, বেশ পিচ্ছিল। সাবধানে উঠতে গিয়ে চোখে পড়ে টিলাজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য দাঁতরাঙা ফুল। বেগুনি ফুলগুচ্ছ নুয়ে আছে পাপড়িতে বৃষ্টির ফোঁটা মেখে। টিলার চূড়ায় ঘাসবনের মাঝ দিয়ে ফিতার মতো এক চিলতে ট্রেইল। সে পথ ধরে চলার সময় দূর থেকে ভেসে আসা প্রবল বর্ষণের শব্দে থেমে পড়ি। মনে হচ্ছিল ধারেকাছে কোথাও ঝরনার পানি পতনের শব্দ। তবে মোসাহিদ নিশ্চিত করেন, এখানে ও রকম কোনো ঝরনা নেই। ওটা বৃষ্টির শব্দ। প্রবল বেগে বৃষ্টি আসছে। মাথায় ছাতা থাকলেও পা চালাই দ্রুতলয়ে। বৃষ্টি তবুও ধরে ফেলে আমাদের। ঝু-উ-ম শব্দে নেমে আসা অঝোর ধারার বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে গেছে দূরের পাহাড়সারি। টিলার ঢাল বেয়ে ক্রমেই ওপরে উঠে যাওয়া ঘাসবনের সীমান্ত ছাড়িয়ে দূর আকাশে ঘোঁট পাকাচ্ছে কালো মেঘের দঙ্গল। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আনারসবাগানের টিলায় পা রাখলাম যখন, বৃষ্টি থেমে এসেছে। আচমকা শুরু হওয়ার মতোই তার থেমে যাওয়া। যদিও এই বিরাম কতক্ষণের, সেটা সময় গড়ালে বোঝা যাবে।

বিজ্ঞাপন

টিলার চূড়ার অংশটা মোটামুটি সমতল। চূড়ার মাথা থেকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া টিলার গা-জুড়ে আনারসবাগান। সার বেঁধে আনারসগাছ ওপর থেকে নেমে গেছে টিলার একদম পাদদেশে। আনারসবাগানের এমন দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য দেখতে থাকি চোখ জুড়িয়ে। কাঁটাময় চিকন লম্বাটে পাতার বুনোটের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে রসাল আনারস। হলদেটে সোনালি রং। কোনোটায় আবার কাঁচা সবুজ রং। আছে ফুল থেকে সবে শারীরিক গঠন পাওয়া আনারসও। দুজন শ্রমিক এরই মধ্যে পাকা আনারস তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কাণ্ড ভেঙে তুলে ভরছেন ঝুড়িতে। সাথি ফসল হিসেবে কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, তেজপাতার গাছ বাগানজুড়ে। ঘুরেফিরে বাগান দেখার ফাঁকে মোসাহিদ বলে গেলেন, তাঁর এই বাগান আয়তনে প্রায় ১১ বিঘা।

default-image

আনারসবাগানটির যাত্রা শুরু হয় বছর চারেক আগে। তরুণ এ উদ্যোক্তা আমি যে ব্যাংকে কাজ করি, সে ব্যাংকের একজন গ্রাহক। ব্যাংকেই পরিচয়। আনারসবাগানের গল্প তাঁর মুখে শুনে নিজ থেকেই সাধলাম, দেখতে একদিন যেতে চাই। এরপর ওনারও যেন তর সইছিল না, কবে যে নিয়ে গিয়ে দেখাবেন! বলে গেলেন, বাগান শুরু করার আগে কয়েক বছর আমিরাতে প্রবাসী ছিলেন। অনেকটা থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করি, তা বাগান করার দিকে ঝোঁকার কারণ? স্মিত হেসে উত্তর দেন, ছোটবেলা থেকেই মনের ভেতর স্বপ্ন ছিল, একটা ফলবাগান করার। বাগানবাড়ির মতো সে বাগানে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরবেন, সময় কাটাবেন।

প্রথমবার ছুটিতে এসে সে শখ বাস্তবায়নের চিন্তা মাথায় চেপে বসে। চেষ্টা-তদবির করে এই টিলা লিজ নিয়ে বাগান শুরু করেন। সীমিত পরিসরে চাষ শুরুর পর প্রবাসে ফিরে যান। তবে বাগান এভাবে রেখে প্রবাসে ফিরে কাজকর্মে মন বসছিল না। আর তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন, প্রবাস ফেলে দেশে এসে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে মনোযোগী হওয়ার বিষয়ে। বর্তমানে আনারস বাগানের সঙ্গে আছে ২০ বিঘা আয়তনের কাসাভা আলুর খেত।

default-image

গল্পের মধ্যেই চলে এল প্লেটভর্তি টসটসে রসাল আনারস। গাছপাকা সুমিষ্ট হানিকুইন জাতের আনারসের টুকরা মুখে পুরে মনে হলো যেন অমৃত! পুরো বাগানেই একমাত্র জাত এই হানিকুইন। শ্রীমঙ্গলের সর্বত্র বাগানজুড়ে মূলত এ জাতের আনারসের একক আধিপত্য। মাজদিহি ছাড়াও সাতগাঁও, বিষামনী, মোহাজেরাবাদ, বালিশিরা, ফয়েজাবাদসহ নানা জায়গার টিলা ও পাহাড়জুড়ে রয়েছে আনারসের এমন চোখজুড়ানো খেত। ষাটের দশকে শ্রীমঙ্গলে আনারসের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হওয়ার কথা জানা যায়। কাঁটাযুক্ত হানিকুইন জাতের আনারসের আরেক নাম জলঢুপি। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লালমাটির টিলাঞ্চল জলঢুপ গ্রাম এই আনারসের আদিভূমি। বৃহত্তর জলঢুপের টিলাঞ্চল আমার জন্মস্থান বলে ব্যাপারটা আমার কাছে আলাদা অনুভূতির।

এককালে জলঢুপ মহকুমার খ্যাতি ছিল নানা জাতের ফল ও ফসলের প্রাচুর্যের জন্য। কমলা গোত্রের কুড়ির অধিক ফল ও আনারস যার অন্যতম। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনে আসা জলঢুপি বা হানিকুইন আনারস স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বিরতুঙ্গ’ নামে। একটা সময় বাড়িতে বাড়িতে প্রাচুর্য থাকলেও বর্তমানে জন্মস্থানে তেমন জৌলুশ আর নেই বিরতুঙ্গের। কৈশোরকালে টিলার বনবাদাড়ে হাঁটতে গিয়ে বনের ভেতর প্রাকৃতিকভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে আনারস গাছ বেড়ে ওঠা দেখেছি কতশত! সিলেট অঞ্চল ছাড়াও বর্তমানে হানিকুইন আনারস ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে নরসিংদী ও রাঙামাটিতে। জেনে ভালো লেগেছে, রাঙামাটির নানিয়ারচরে ইতিমধ্যে আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে চিপস তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে সারা বছরই ভিন্ন স্বাদে মিলবে আনারস।

default-image

বাগানটির টিলার পাদদেশে, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী অংশে ঘন পাহাড়ি কাশের ঝোপ। দৃষ্টি নিবন্ধ হয়ে ছিল সেদিকে। গলায় এতক্ষণ আটকে থাকা প্রশ্নটা তাই বের না করে পারলাম না। জিজ্ঞেস করি, এখানে কোনো বন্য প্রাণী আসে কি না। এই প্রশ্নে মোসাহিদ কিছুটা সময় নিয়ে স্মৃতিশক্তি ঝালাই করে নেন। জানান, কালেভদ্রে একটা-দুটা বানর আসে। তবে বাগান করার একদম শুরুর দিকে নিচের কাশবনে ধূসর রঙের লম্বা কানওয়ালা এক জোড়া খরগোশ একপলক দেখেছিলেন একবারই। বর্ণনায় বুঝলাম, সম্ভবত শশক ছিল ওগুলো।

গল্পে গল্পে ইতিমধ্যে বেলা গড়িয়েছে বহুদূর। সূর্যের আলোর বিদায়কে ত্বরান্বিত করেছে মেঘের ঘনঘটা। এবার যে উঠতে হয়। মোসাহিদকে সে কথা বলতে স্মিত হেসে আবার আসতে নিমন্ত্রণ করে এগিয়ে দিতে সঙ্গে চললেন। তবে এরই মধ্যে ব্যাগ ভরে আনারস পাঠিয়ে দিয়েছেন গাড়িতে। টিলা থেকে ফেরার পথে নামতে নামতে চোখ গেল দূরের পাহাড় সারিতে। সন্ধ্যার ছাইরঙে ডুবতে থাকা রাবার বাগানের ওপর ঘোঁট পাকাচ্ছে কালো মেঘ।

বিজ্ঞাপন
ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন