default-image
বিজ্ঞাপন

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান আমাদের গন্তব্য। সকাল সকাল সেখানে যেতে হবে। অটোরিকশা নিয়ে শ্রীমঙ্গল থেকে খুব ভোরে বের হলাম। বসন্ত এলেও রয়ে গেছে শীতের রেশ। সাতছড়ির নির্জন বনে যখন পৌঁছালাম, সূর্য উঠেছে। চারদিকে বসন্তের ফুলের নানা সুগন্ধ। সাতছড়ি উদ্যানে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযোগী সময় জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস। কারণ, এ সময় গাঢ় কমলা রঙের মান্দার ফুলের দেখা মেলে।

default-image

সাতছড়ি পৌঁছে মান্দার ফুল দেখতে উঠলাম ওয়াস টাওয়ারে। আগে থেকেই জনা বিশেক আলোকচিত্রী সেখানে ক্যামেরা তাক করে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পরপর যেই পাখির ঝাঁক মান্দার ফুলের মধু খেতে আসছে, অমনি ক্যামেরার শার্টারে ক্লিকের ঝড় উঠছে। তবে ভালো ব্যাপার হলো, কেউ পাখিদের বিরক্ত করছেন না। কথাও বলছেন নিচু গলায়।

আমিও একপাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। একে একে পাখি আসছে গাছে। তবে বেশি দল বেঁধে আসছে বাদামি রঙের কাঠশালিক। দেখতেও সুন্দর। গায়ের রং মেটে আর ঠোঁটে নীলের ছোঁয়া। এখানে ক্যামেরা নিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে পাখির দেখা মিলবেই। তবে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আসে দুর্লভ পাখিগুলো। তারা লাজুক। মানুষের আনাগোনা একেবারেই সহ্য করে না। দুর্লভ কিছু পাখি কেবল এই বনেই দেখা যায়।

default-image

ঝাঁক বেঁধে আসতে দেখা গেল পাহাড়ি ময়নাকে। ময়নার ডাকে যেন অচেনা পাহাড়ি আবহ। তবে মধুটুকু খেয়েই দিল ছুট। ময়নার মতো মধু খেয়ে ছুট দেয় না ফুলমাথা টিয়ারা। ফুলের কাছে গিয়ে ভালোবাসাবাসিতে ব্যস্ত দেখা গেল দুই ফুলমাথা টিয়াকে। বিকট হাঁকডাক দিয়ে হাজির হলো লাল বুক টিয়া। মদনা টিয়া নামেও পরিচিত এই পাখি। বিশাল ডানা আর ধূসর বুকের মধ্যে টকটকে লাল বাঁকানো ঠোঁটে যেন নয়ন জুড়িয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সুইচোরা পাখির দেখা মেলে সাতছড়ি উদ্যানে। সচরাচর ঘন জঙ্গলে এদের দেখা মিললেও এ মৌসুমে সুইচোরা পাখির দেখা মেলে সাতছড়ি উদ্যানে। বনে রাজা থাকবে আর সেপাই থাকবে না, তা তো হয় না! মান্দার বনের প্রহরী সেপাই বুলবুলির জোড়া এসে সে কথা জানিয়ে দিল। দুর্লভ পাখি বাসন্তী লটকন টিয়া। সব পাখি যেখানে মধু আহরণ করে ফুলের ওপর বসে, সেখানে বাসন্তী লটকন উল্টোভাবে ঝুলে থাকে ফুলের নিচে। ফুলের মধুর টানে একে একে আসতে শুরু করল শেওলা রঙের ছোট মাকরমা, কালো ঝুঁটি বুলবুলি, বাবুনাই আর সবুজ সুইচোরার মতো নয়নজুড়ানো সব পাখি।

default-image

বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দিপু বলছিলেন, সাতছড়ির মান্দারগাছ শুধু মানুষের কাছেই জনপ্রিয় নয়। পশুপাখির কাছেও সমান প্রিয়। প্রায় ৪০ জাতের পাখি এসব গাছে দেখা যায়। বেশির ভাগই পোকা খেকো। কিছু কিছু মধু খেকো। পতঙ্গদেরও প্রিয় জায়গা এই গাছের ফুল। পাখি ছাড়াও এখানে দেখা মেলে কাঠবিড়ালি ও গিরগিটির। একটি গাছ সবারই এত প্রিয় কিন্তু এই গাছটি সম্বন্ধে আমরা তেমন কিছু জানি না। সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। যারা আমরা গাছটি দেখতে যাই, তারাও হয়তো একটি করে মান্দার লাগানোর উদ্যোগ নিই না। যেকোনো জাতীয় উদ্যানের জলাধারের পাশে এই গাছটি লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বায়োফেন্সিং হিসেবেও প্রাকৃতিকভাবে এই গাছটি দারুণ কাজ করে।

এখানেই কাঠশালিকের ছবি তুলে এ বছর আলোকচিত্রের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘উইকি লাভস আর্থ ২০২০’-এ সেরাদের সেরা হয়েছিলেন বগুড়ার আলোকচিত্রী তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব। বিপ্লব বলছিলেন, ‘প্রতিবছর মান্দার ফুল ফোটা মানে দল বেঁধে এখানে আসা। এবারও এলাম। পাখি এসেছে অনেক ।’

default-image

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দর্শনার্থীদের পানির বোতল বা খাবারের প্যাকেট না ফেলা এবং বন্য প্রাণীকে বিরক্ত না করার জন্য অনুরোধ করেছে বন কর্তৃপক্ষ।

default-image

ঢাকা থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার এ মনকাড়া উদ্যানের নাম ‘সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান’। এখানকার প্রবেশমূল্য মাত্র ২০ টাকা।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন