গাজীপুরের সাফারি পার্কে থাকা সাদা বাঘটির বয়স এখন ২ বছর ৩ মাস
গাজীপুরের সাফারি পার্কে থাকা সাদা বাঘটির বয়স এখন ২ বছর ৩ মাসছবি: আশরাফুল আলম

সেই ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি, হলুদের ওপর কালো ডোরাকাটা বাঘের কথা। মানে, বাঘ হবে হলুদ রঙের ওপর কালো ডোরাকাটা। কিন্তু যদি কখনো শোনেন, সাদার ওপর কালো ডোরাকাটা বাঘের কথা, তা–ও আবার সেটা আমাদের দেশেই, কিছুটা থমকে যেতে পারেন বৈকি। এ রঙের বাঘ সারা পৃথিবীতেই আছে হাতে গোনা।

default-image

সেই বিরল প্রজাতির সাদা রঙের ওপর কালো ডোরাকাটা বাঘ আছে এ দেশে। গাজীপুরের শ্রীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে দেখা মেলে স্ত্রী সাদা বাঘের। পৃথিবীতে বিরল বলেই এ সাফারিতে দর্শনার্থীদের জন্য সাদা বাঘ দেখা একটি বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

বিজ্ঞাপন

পার্ক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ দেশে সাদা বাঘের সংখ্যা মাত্র দুটি। এর একটি আছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। আর অন্যটি গাজীপুরের শ্রীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। বাঘের মধ্যে সাদা বাঘগুলোর শারীরিক বৃদ্ধি দ্রুত হয়। এরা কিছুটা চঞ্চল হয় অন্যগুলোর তুলনায়। গাজীপুরের সাফারি পার্কে থাকা সাদা বাঘটির বয়স এখন ২ বছর ৩ মাস। এটি স্ত্রী। এর জন্ম হয়েছিল ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় সাদা বাঘের জন্ম হয়েছিল একই বছর ১৯ জুলাই। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কেবল এ দুটিই সাদা বাঘ আছে। প্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০ হাজার বাঘের মধ্যে একটি সাদা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

default-image

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, এগুলো বেঙ্গল টাইগার। জিনগত পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় এদের শরীরের রং সাদা হয়। এটা তাদের কোনো শ্বেতী রোগ নয়। শ্বেতী রোগ হলে তার শরীরে কালো ডোরাগুলো থাকত না। এদের চোখের রং সোনালির পরিবর্তে নীল রঙের হয়। তিনি বলেন, পৃথিবীব্যাপী সাদা বাঘের সংখ্যা খুবই কম। চিড়িয়াখানায় চাহিদা থাকার কারণে এখন অনেক দেশে সাদা বাঘ বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ব্রিডিং করার চেষ্টা চলছে।

এক দুপুরে পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তবিবুর রহমানের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পর্যটক বাসে চেপে বাঘ দেখতে বের হয়ে দেখা যায়, বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা বেঙ্গল টাইগার। বীরদর্পে ঘুরে বেড়ানো বাঘ দুটির একটি লেকের পানিতে নেমে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই লেকের পাড়ে গিয়ে অবস্থান নেয় সাদা বাঘ। দেখে মনে হচ্ছিল, সে পানিতে নামা বাঘটিকে উঠে আসার আহ্বান জানাচ্ছে। এর মধ্যে কমলা রঙের বাঘটি একটি নালার পাশে পানি থেকে উঠে আসে। মুহূর্তেই সাদা-বাঘটি এক লাফে নালা পাড় হয়ে সোনালি হলুদ রঙের বাঘের কাছে চলে আসে। সারা দিন বাঘেদের এমন খুনসুটি লেগেই থাকে এখানে। দর্শনার্থীদের কাছে সাফারির বিচিত্র এ সাদা বাঘ, বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

default-image

বাঘের খাবার দেওয়ার গাড়িতে করে পরিচর্যাকারী মো. মিন্টু বাঘগুলোকে বিভিন্ন নামে ডেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন। পর্যটক বাসে চেপে কাছেই অন্য একটি পর্যটক বাসের ভেতরের লোকজনের মধ্যে সাদা বাঘ নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ করা গেল। বাঘের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত স্থানে বাঘগুলোকে শুয়ে-বসে থাকতে দেখা গেছে। পর্যটক বাস দেখে একটি বাঘ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে যায়। বাসটি স্থির হয়ে যাওয়ার পর বাঘটিও স্বাভাবিক হয়।

বিজ্ঞাপন

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক তবিবুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১০। এর মধ্যে স্ত্রী বাঘ ৬টি। পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় বেশ কিছু বাঘ দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা হয়। এরপর সাফারি পার্কে বাচ্চার জন্ম দিয়েছে বাঘিনী। জন্ম নেওয়া সাদা রঙের বাঘিনীটি কিছুদিন পর প্রাপ্তবয়স্ক হবে। ভবিষ্যতে এই বাঘ থেকে আরও সাদা বাঘের জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন, পার্কে ১০টি বাঘের মধ্যে একটি সাদা বাঘ, এটি অত্যন্ত বিরল দৃশ্য দর্শনার্থীদের কাছে।

default-image

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের ওয়াইল্ডলাইফের সুপারভাইজার সরোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় বাঘের শরীরের রং সাদা হয়। এদের ওজন হয় অন্যান্য বাঘের তুলনায় কিছুটা বেশি। বৃদ্ধিও হয় দ্রুত। এদের একেকটির ওজন ২০০ থেকে ২৬০ কেজির মতো। দৈর্ঘ্য হয় ৩ মিটার। সাফারি পার্কে থাকা বাঘটি স্ত্রী। তিনি বলেন, জেব্রার মতো বাঘের শরীরের ডোরাকাটা প্যাটার্ন অনন্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ, একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল থাকে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক তবিবুর রহমান বলেন, পার্ক খোলা হওয়ার পর দর্শনার্থীরা কোর সাফারিতে গিয়ে সাদা বাঘ দেখে আনন্দ নিচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুরা বাঘ দেখে খুব আনন্দ পাচ্ছে। সারা পৃথিবীতে স্বল্পসংখ্যক সাদা বাঘের মধ্যে বাংলাদেশে আমাদের এখানে একটি আছে।

মন্তব্য করুন