বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে যেমন আছে পাহাড়পুর, ময়নামতি, পুঠিয়া, বাগেরহাট আর সোনারগাঁর মতো ইতিহাসের সাক্ষীস্বরূপ সব পর্যটনকেন্দ্র, তেমনি আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর উৎকর্ষের সব লীলাভূমি। কক্সবাজারে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পতেঙ্গা ও কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত, সিলেটের মালনীছড়াসহ অন্যান্য স্থানের চা–বাগান, জাফলংয়ের পাথুরে জলাভূমি, বান্দরবান ও রাঙামাটির পার্বত্য এলাকা—এসব স্থানের সব কটিই বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে।

default-image

তবে আজকাল সরকারি–বেসরকারি এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও একটু প্রত্যন্ত, দুর্গম আর অন্য রকম পর্যটনস্থলগুলো সবার পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে। যোগাযোগব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো হওয়ায় আজকাল মানুষ রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, বান্দরবানের নাফাখুম, দেবতাখুম বা অমিয়াখুম জলপ্রপাত, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওর, রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি ইত্যাদি জায়গায় অনায়াসেই চলে যাচ্ছে দল বেঁধে। আবার নির্দিষ্ট কিছু উৎসব, যেমন চাকমা জনগোষ্ঠীর বিজু উৎসব, মণিপুরী রাস উৎসব, গারো জনগোষ্ঠীর ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের সময়ে পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠে সেই স্থানগুলো।

পর্যটনশিল্পের সঠিক পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তা যেকোনো দেশেরই অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের কার্যকারিতা এবং কাভারেজ বৃদ্ধি—এ ব্যাপারগুলো যেন স্থানীয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সবার জীবনযাপনের মানোন্নয়নের কাজে আসে, সেটা আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। বিশ্ব পর্যটন দিবসে এ বছরের থিম কিন্তু এ কথাই বলে।

default-image

এবারের বিষয় ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’–এর অর্থ আসলে পর্যটনের মাধ্যমে প্রাপ্ত আর্থসামাজিক উপকারিতা এবং সুযোগ-সুবিধা যেন সবার মধ্যে সমবণ্টন হয়, সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করা। বিশেষত, এমনটা যাতে মোটেই না হয়, পর্যটন স্থলের নিজস্ব জনগোষ্ঠী অর্থকষ্টে ভোগার সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনাহীন পর্যটন তরিকার মাশুল গুনবে দূষণ আর কোণঠাসা জীবনের দিনপঞ্জিতে, অথচ লাভের গুড় খেয়ে যাবে সুযোগসন্ধানী পিঁপড়েরা।

default-image

দুঃখের বিষয় হলো, সাজেক ভ্যালিতে যেমন একদিকে লকডাউন উঠলে রাতে থাকার সব জায়গা বুকড হয়ে যায়, সেই একই জায়গায় স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা অর্থকষ্টে ভুগে ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে থাকে। পর্যটনস্থলের গণমানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিষয়ে আজকের এই পর্যটন দিবসে যদি সর্বতোভাবে অঙ্গীকার না করা হয়, তবে শুধুই পরিবেশদূষণ ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহতকরণ ঘটবে ক্রমাগত, আর কিছুই না। কেবল অতিরিক্ত যানবাহনের চলাচলের কারণে টায়ারের ঘর্ষণে যে প্লাটিক কণা মিশে যাচ্ছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নির্মল নদী–হাওরে, তা অত্যন্ত ভীতিকর বলে গবেষকেরা জানান। জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এই প্লাস্টিকের সামগ্রী যত্রতত্র ফেলা থেকে আইন করেই হোক আর যেভাবেই হোক, পর্যটকদের নিরস্ত করতেই হবে।

সুনৈতিক বা এথিক্যাল পর্যটনের আরেক চরম ব্যত্যয় ঘটে, যখন কোনো স্থানীয় নারী নিগৃহীত হন কোনো তথাকথিত পর্যটকের হাতে। আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তার ব্যাপারগুলোও এ দেশে খুব কঠোর নয় এসব প্রত্যন্ত পর্যটন স্থলে। এই সুযোগেই ঘটে যায় নান অপ্রীতিকর ঘটনা। আমাদের পর্যটকদের আরও একটি ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, আর সেটা হলো সাঁতার না জেনে বা ভাটার সময়ে সমুদ্রে বা অন্য জলাভূমিতে না নামা। অ্যাডভেঞ্চারের অদম্য আকর্ষণে খেই হারিয়ে ফেলে জীবন দিয়ে তার মাশুল দেন তারা।

default-image

বিভিন্ন গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইকো ট্যুরিজম নীতি গ্রহণ করলেই কেবল প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে সুনৈতিক এবং টেকসই পর্যটনশিল্প গড়ে উঠতে পারে। ইকো ট্যুরিজমের মূলনীতিতে প্রকৃতি ও মানবগোষ্ঠীকে যথাসম্ভব কম প্রভাবিত বা অনুরণিত করে পর্যটন নিশ্চিত করা হয়। ইকো ট্যুরিজমে আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিষয় খুব জোরালোভাবে থাকায়, এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ইনক্লুসভ গ্রোথ’ বা সবার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্যাপারটিও প্রতিফলিত হয় ভালোভাবে।

কলাতলী বা ইনানী সৈকত আজ এক আবর্জনার স্তূপ। সেখানে শব্দ দূষণ আর পানি দূষণ করতে থাকা পর্যটকের দল একসময় ঠিকই বুঝতে বাধ্য হবে তাদের কুকর্মের ফল। কিন্তু তার আগেই আমরা সবার কাছে সুনৈতিক ও টেকসই পর্যটনের সুফলের গল্পগুলো পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের সবারই মঙ্গল।

default-image

আজকের দিনে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, যেন আমরা কোনো বর্জ্য ফেলে প্রকৃতিকে দূষিত করব না, স্থানীয় বাসিন্দাকেও বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকব, ক্ষতি করব না জীববৈচিত্র্যের। সুনীতি আর টেকসই নিয়মে এগোলে দেশের পর্যটনশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত, হবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং আর মিলবে অর্থনৈতিক সাফল্য।

ছবি: প্রথম আলো

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন