লুজার্ন শহরে
লুজার্ন শহরেছবি: লেখক
আমরা পাহাড় কেটে, নদী ভরাট করে, প্রকৃতি নষ্ট করে নিজেদের আবাসস্থল তৈরি করি; অথচ এখানে ঠিক তার উল্টো। সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীরা কতটা নৈসর্গিক আর নিরিবিলি জীবন যাপন করে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

জেনেভা থেকে চলে গেলাম লুজার্ন। সেখানে বিশাল প্রমোদতরিতে লেকের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় চক্কর দিয়ে দ্রুতগামী প্যানারমিক ট্রেন চেপে লাঙ্গার্ন শহরে এসে নামলাম মধ্যাহ্নভোজের বিরতি হিসেবে। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা; সবাই দুই পদের স্ন্যাকস নিয়ে যাই। সম্মিলিতভাবে পিকনিকের একটা আমেজ যেন বিরাজ করছিল। আমরা অনেকটা দূর ভেতরে চলে আসি। এখানে বলতেই হবে, যত গহিন জঙ্গলেই যাই না কেন, সবখানেই যেন পরিপাটি সাজানো-গোছানো ছিমছাম পরিবেশ। বসার জন্য একটা জায়গা পাবেন, ময়লা ফেলার বিন আছে। আর রাস্তাঘাট যেন আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে।

default-image

আমি এর আগেও দুবার এসেছিলাম সড়কপথে; কিন্তু তখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অতটা দেখা হয়ে ওঠেনি। কারণ, একটা জায়গা দেখতে গিয়ে অন্য জায়গায় চলে যেতাম আমরা। নিজেরা ড্রাইভ করে গেলে গাড়ি চালানোয় একটা মনোযোগ দিতে হয়; আলাদাভাবে তখন আর অতটা উপভোগ্য হয়ে ওঠে না। বলে রাখি, ট্রেনভ্রমণ সুইজারল্যান্ডে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। তবে আরামদায়ক আর নিরাপদ। দুচোখ ভরে দেখার জন্যও ট্রেন জার্নি অতুলনীয়।

পাহাড়, লেক, প্রাকৃতিক শোভা পরিবেষ্টিত সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে ট্রেনের বিকল্প নেই; কারণ, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ট্রেন এবং কেব্‌ল কারে চড়ে বাইরের প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলি উপভোগ করা, সে শিহরিত হওয়ার মতো ব্যাপার! আপনার কাছে তখন মনে হবে, এ কোন বিস্ময়কর দুনিয়ায় এসে পড়লাম!

বিজ্ঞাপন

আমরা পাহাড় কেটে, নদী ভরাট করে, প্রকৃতি নষ্ট করে নিজেদের আবাসস্থল তৈরি করি; অথচ এখানে ঠিক তার উল্টো। সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীরা কতটা নৈসর্গিক আর নিরিবিলি জীবন যাপন করে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। গভীর অরণ্যের ভেতরে ডুপ্লেক্স বাড়ি, তার চারপাশে আঙুর, আপেল, কিউইসহ বিভিন্ন পাম ফলের বাগান। পাহাড়ের ঢাল বা আদল অনুযায়ী নিজেদের আবাসস্থল বা জমি চাষ করেন; কিন্তু প্রকৃতির বিন্দুমাত্র ক্ষতিসাধন এরা করে না।

default-image

খঁস-মন্তানা শহরের প্রায় ১৫০০ ফিট ওপরে উঠে দেখি বাঁকা বাঁকা কাঠের দোতলা বাড়ি, ভয়ংকরও মনে হয়েছে। ওরা পাহাড় কেটে ঘরগুলো সোজা করতে পারত কিন্তু প্রকৃতিকে নষ্ট করেনি; বরং পাহাড়ের আদল অনুযায়ী নিজেদের পছন্দের কাজগুলো করে থাকে। চারপাশে গরু, ভেড়ার ফার্ম হাউস, চিজ, গরুর দুধের ফ্যাক্টরি; অবাধে মোরগ, গরু, ভেড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন একেবারেই গ্রামীণ দৃশ্যপট। একদম সাদামাটা যাপন; অথচ এসব বাড়ির মালিকেরা সুইজারল্যান্ডের একেকজন ধনকুবের।

শহরের বাড়ি, ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে দূরদূরান্তের বন-জঙ্গলে চলে যান, কৃষিকাজ করেন, বাগান করেন। এমনও বাড়ি দেখেছি ইলেকট্রিসিটি আছে কিন্তু ওরা ব্যবহার করে না।সন্ধ্যায় রাতের খাবার খেয়ে পুরো বাড়ি মোমের আলোয় আলোকিত করে রাখে। মাটির চুলায় রান্না করতে দেখেছি, আর অবশ্যই তা উন্নত পর্যায়ের। অনেক পুরোনো গাছে ঘেরা, সবুজ আর সবুজ। আমাদের দেশে হলে কেটেকুটে লাকড়ি বানিয়ে ব্যবহৃত হতো। নিরাভরণ, নিস্তব্ধ, শান্ত প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতোই ব্যবহার করে সুইসরা। সামারে বাগান থেকেই জুকিনি, সালাদপাতা, টমেটো, শালগম, গাজর উঠিয়ে বাগানেই রান্না করে খেয়ে থাকে।

default-image

প্রতিটি বাড়ির একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, কাঠের দোতলা আর চারপাশে নাম না-জানা অসংখ্য ফুলে ভরা বাগানে ঘেরা। মনে হবে শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি, সৃষ্টিকর্তা যেন ঢেলে সাজিয়ে রেখেছেন। ম্যাটারহর্ন মাউন্টেন দেখতে গিয়েছিলাম জারমাট শহরে; সেখানে বাড়িঘর থেকে শুরু করে বেশির ভাগ জিনিস কাঠের তৈরি। তার ওপর এই শহরে ঢুকতে হলে ছয় কিলোমিটার দূরে যার যার গাড়ি রেখে ঢোকার নিয়ম এবং ভেতরে যানবাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঘোড়ার গাড়ি ও চার্জে চালিত এক ধরনের গাড়ি, যা শহরের বাতাস দূষিত করে না। সেখানে হর্ন বাজানো একদম নিষিদ্ধ। সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত শহররূপী একটি গ্রাম। সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে, তুমি যতটা সময় মাটির কাছাকাছি থাকবে, ততই তুমি দীর্ঘ ও শান্তিপূর্ণ জীবন পাবে।

লাঙ্গার্ন থেকে ইন্টারলেকেন—এই পথটুকু হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের প্রধান কয়েকটি পর্যটন স্থানের মধ্যে অন্যতম। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’সহ অসংখ্য হিন্দি ছবির শুটিং এই ক্যান্টনে হয়েছিল। বলিউড এরিয়া নামেই এই ক্যান্টন সুপরিচিত।

বনজঙ্গলের বাড়িগুলোতে বাতাসের শব্দ, পাখির কাকলি, লেকের পানি, প্রস্রবণের কলতান শুনবে বলে এরা কোনো মিউজিক শোনে না; অবশ্য নতুন প্রজন্ম এর ব্যতিক্রম। এত পিনপতন নীরব পরিবেশ যে আমাদের গা ছমছম করে। কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেও সেই রকম কোনো সম্পর্ক দেখিনি; এ জন্য এরা অবশ্য খুব ডিপ্রেশনে ভোগে। সংখ্যায় সেটা যদিও নগণ্য।

বিজ্ঞাপন

যা হোক, মূল কথায় ফিরে আসি। লাঙ্গার্ন থেকে ইন্টারলেকেনের উদ্দেশে যাওয়ার জন্য আবারও ট্রেনে চেপে বসি। ট্রেনে টিকিট চেক করার চেয়ে বারবার এসে দেখে যাচ্ছে আমাদের মুখে মাস্ক আছে কি না। লাঙ্গার্ন থেকে ইন্টারলেকেন—এই পথটুকু হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের প্রধান কয়েকটি পর্যটন স্থানের মধ্যে অন্যতম। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’সহ অসংখ্য হিন্দি ছবির শুটিং এই ক্যান্টনে হয়েছিল। বলিউড এরিয়া নামেই এই ক্যান্টন সুপরিচিত।

default-image

পুরো ইন্টারলেকেন ঘুরতে হলে ট্রেন জার্নির বিকল্প নেই; কারণ লেকের পাড় ঘেঁষে অসাধারণ কিছু দৃশ্য আছে, তা শুধু ট্রেন কিংবা প্লেন থেকেই উপভোগ করা সম্ভব। সড়কপথে গেলে এই স্বর্গীয় দৃশ্য উপভোগ করা যাবে কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম। এমনিতে ট্রেনের রাস্তাগুলো অনেক উঁচুতে থাকে যে ট্রেন থেকেই পুরো শহর দেখা যায়। এখানেই ট্রেন জার্নির সার্থকতা। এরপর চলে গেলাম মারেন। এর পাদদেশে শিলথর্ন নামে একটি সুইস পাহাড়ঘেরা গ্রাম; যেখানে শুধু কেবল কারে যাওয়া-আসা সম্ভব। সেই গ্রামটি মাটি থেকে ১৬৩৮ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এখানে জেমস বন্ড জিরো জিরো সেভেন সিনেমার শুটিং হয়েছিল (এই মুহূর্তে নাম মনে করতে পারছি না)।

যতই মাটি থেকে ওপরে উঠছি, মনে হচ্ছে আকাশ, মেঘ আর পাহাড়ের শিখর মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব মিলনের সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি! চোখ আর মনে প্রশান্তির এক আনন্দমাখা অধ্যায় মুঠোবন্দী করে ফিরছি ঘরে। সেখান থেকে আবারও ট্রেনে চেপে ওয়েঙ্গেন ও লাউটারব্রানেনে ঘুরলাম। এই জায়গাগুলোও পর্যটনবান্ধব অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
সারা দিন ঘুরে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় ইন্টারলেকেন থেকে ট্রেনে রাজধানী শহর বার্নে এলাম; রাতের খাবার খেয়ে সরাসরি ট্রেনযোগে জেনেভায় এসে পৌঁছালাম রাত একটায়। এখানে বলে রাখি, এই ডে ট্রিপে কিন্তু অন্য আর টিকিট কাটতে হয়নি আমাদের। এভাবেই শেষ হয় আমাদের এক টিকিটে দিনভরের ভ্রমণ।

default-image

সুইজারল্যান্ডে বেড়াতে আসতে পারেন যে কেউ। এ জন্য ট্যুরিস্ট ভিসার প্রয়োজন হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত আর্থিক সংগতি; সঙ্গে পূর্বের বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড এ ক্ষেত্রে খুব সহায়ক হবে। এরপরও বাংলাদেশ থেকে সুইস ভিসা পাওয়াটা কিছুটা ঝামেলাপূর্ণ। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত যেকোনো দেশ যেমন ফ্রান্স, পর্তুগালের জন্য সেনগেন ভিসা নিয়ে সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ করা যাবে সহজেই।

মন্তব্য পড়ুন 0