বিজ্ঞাপন

আমাদের বাসা ক্যাম্বেল টাউন এলাকা থেকে ব্লু মাউন্টেইনের দূরত্ব মাত্র এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিটের ড্রাইভ। তবে সিডনি থেকে যেতে সময় লাগবে পৌনে দুই ঘণ্টা; আর ট্রেনে গেলে লাগবে আড়াই ঘণ্টা। এটা দীর্ঘ যাত্রা মনে হলেও আপনি যখন ওখানে পৌঁছাবেন, তখন এই ক্লান্তি উবে গিয়ে শরীরে একধরনের প্রশান্তি বিরাজ করবে। নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন সবুজ আর নীলের মিতালিতে। আমরা খুব ভোরবেলায় রওনা দিলাম। যাওয়ার রাস্তা মোটামুটি সোজা। এম৭ হাইওয়ের পর এম৪ হাইওয়ে হয়ে এরপর একটানা এ৩২ রাস্তা। মাঝে আমরা একটা পেট্রলপাম্পে বিরতি নিয়ে গড়িতে তেল ভরে নিলাম। আর নিলাম বাচ্চাদের জন্য চিকেন স্যান্ডউইচ ও নিজের জন্য কফি।

default-image

সিনিক ওয়ার্ল্ডে পর্যাপ্ত ফ্রি কার পার্কিং আছে। গাড়ি পার্ক করে আমরা এন্ট্রিতে পৌঁছে সেখানে দাঁড়ানো সিনিক ওয়ার্ল্ডের একজনের কাছ থেকে টিকিট বিষয়ে একটা ধারণা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। টিকিটের প্রক্রিয়া শেষ করতে সামান্য সময় লাগল। টিকিট কাউন্টার থেকে আমাদের হাতে বারকোডওয়ালা ব্যান্ড পরিয়ে দেওয়া হলো। যেকোনো রাইডে প্রবেশের মুখে বারকোড স্ক্যান করলেই গেট খুলে যাবে। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কোন রাইডটা আগে চড়ব। টিকিট কাউন্টার থেকে সরবরাহ করা লিফলেট থেকে জানলাম প্রতিটি রাইডে আপ এবং ডাউন মিলে দুবার চড়তে বলা হয়েছে সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করার জন্য। এখানে মোট তিন রকমের রাইড আছে। সিনিক রেলওয়ে, সিনিক কেবলওয়ে আর সিনিক স্কাইওয়ে। এর পাশাপাশি আছে মনোরম সিনিক ওয়াকওয়ে। সিনিক ওয়াকওয়েটা রেইনফরেষ্টের মধ্যে বিছানো পাটাতনে হাঁটাহাঁটি। এখানে হাঁটলে বাইরের আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন শীত লাগবে, তাই জ্যাকেট পরে যাওয়া ভালো।

আমাদের মেয়ে তাহিয়া বলল, বাবা, আমরা রেলওয়ে দিয়ে শুরু করব। এরপর ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে কেবলওয়ে দিয়ে আবার ফিরে আসব; তারপর স্কাইওয়েতে যাব। সেই মোতাবেক আমরা রেলওয়ের গেটে হাতের ব্যান্ড স্ক্যান করে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করেই আমরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রকৃতির অপরূপ রূপ প্রত্যক্ষ করলাম। জ্যামিশন ভ্যালির পর্বতমালার মাঝের জায়গাটাতে তুলতুলে সাদা মেঘের বিশাল একটা ভেলা ভাসছে। রেলওয়েতে অপেক্ষার পুরো সময়টা আমরা এই দৃশ্য দেখলাম। এটা দেখে যেন আশ মেটে না। এটা এমনই একটা দৃশ্য যে দৃষ্টি ফেরানো যায় না। তবে এই দৃশ্যটা দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে খুব সকালে, না হলে পরে রোদের আঁচে মেঘগুলো উড়ে যায়। একটু পরেই রেলওয়েতে কেবিনগুলো চলে এল। এখানে বলে রাখা দরকার প্রতিটা রাইডের দশ মিনিট পরপর কেবিনগুলো হাজির হয় তাই তাড়াহুড়ো করার কোনো দরকার নেই।

default-image

রেলওয়ের এই রাইডটা পৃথিবীর সবচেয়ে খাড়া রাইড তাই পড়ে যেতে পারে এমন কোনো জিনিস থাকলে সাবধানে রাখতে হবে। এটা চলা শুরু করার কিছুক্ষণ পর আপনার মনে হবে আপনি সোজাসুজি কোনো গভীর সুড়ঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছেন। তখন মাথার ওপরের রেলিং ধরে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। এই রাইডটা খুবই কম সময়ের কিন্তু অভিজ্ঞতাটা আপনার সারা জীবন মনে থাকবে। আমি সামান্য ভয় পেলেও তাহিয়া আর রায়ানের কোনো বিকার দেখলাম না। তারা রীতিমতো হুল্লোড় করে চলল। রেলওয়ে থেকে নেমে আমরা হাঁটা শুরু করলাম রেইনফরেস্টের মধ্যে। সেখানে পুরোনো কয়লাখনির আদলে একেকটা স্থাপনা গড়া। উল্লেখ্য, এই কয়লাখনি সৃষ্টি না হলে এই সিনিক ওয়ার্ল্ডের মতো একটা সুবিধা তৈরি হতো না।

প্রথমেই আছে কাটুম্বা কয়লাখনির অফিস। সেই অফিসের জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলেই দেখা যায় একটা লোক তার সামনের টেবিলে খোলা খাতার ওপর চশমাটা রেখে মনে হয় ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। টেবিলের ওপর রাখা আছে একটা জ্বলন্ত হারিকেন। এরপরই আছে ভেন্টিলেশন ফার্নেস, তারপর রাখা আছে ঘোড়ার গাড়িতে কয়লা টেনে নেওয়ার ভাস্কর্য। এরপর আছে খনির একটা দেয়াল। তার সামনের কাঁটাতারের বেড়ায় লেখা আছে ইতিহাস। এরপরই আছে খনির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির একটা বোর্ড। এটা ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে খনি শ্রমিকদের গ্রামের। সেখানে পুরোনো বাড়ির আদলে তৈরি করা আছে ঘর। আর ঘরের ভেতরের আসবাবগুলো একেবারে সেই আমলের। এগুলো বাচ্চাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই সব পুরোনো দিনে।

default-image

এই পথের শেষে দেখা মিলবে কেবল কারের। আমরা সেটাতে করে আবার ওপরে চলে আসি। তারপর সেখানকার রেস্তোরাঁ ইটস ২৭০তে সেরে নিই দুপুরের খাবার। তারপর দাঁড়িয়ে যাই স্কাইওয়ের লাইনে। স্কাইওয়ের মজা হলো চারপাশের দৃশ্য দেখার পাশাপাশি মেঝেতে লাগানো পরিষ্কার কাচের মধ্য দিয়ে একেবারে নিচের দৃশ্যও দেখা যায়। এটাতে উঠেই রায়ান আর তাহিয়া দৌড়ে দৌড়ে চারপাশটা দেখছিল। স্কাইওয়ে থেকে ফিরে আমরা আবারও রেলওয়ের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। এবার বেলা হয়ে যাওয়ায় লাইন বেশ লম্বা। রেলওয়ে থেকে নেমেই আমরা বুশ ওয়াকিং শুরু করলাম। ওয়াকের রাস্তাটা খুবই মনোরম। আড়াআড়িভাবে একটা ঝরনার ওপর দিয়ে চলে গেছে রাস্তাটা। সেটাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা থ্রি সিস্টার্সের একেবারে পাদদেশে এসে পৌঁছালাম। সেখান থেকে প্রায় আট শ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলে দেড় ঘণ্টা পর দেখা মিলবে আমাদের আরাধ্য তিন বোনের। রায়ান আর তাহিয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই বাধ্য হয়েই ফিরে এলাম।

সিনিক ওয়ার্ল্ড থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে একজন সাহায্যকারীকে থ্রি সিস্টার্সে যাওয়ার রাস্তা জিজ্ঞেস করতেই পাশের একটা রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে বলল: তোমরা এটা ধরে হেঁটে গেলে আধঘণ্টা পরই পেয়ে যাবে থ্রি সিস্টার্সের দেখা। কিন্তু আবারও এই 'প্রিন্স হেনরি ক্লিফ' ওয়াকওয়ে ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম 'কুইন এলিজাবেথ লুকআউটে'। থ্রি সিস্টার্স বলতে সবাই এই জায়গাটাকেই বোঝায়, কারণ এখান থেকেই থ্রি সিস্টার্সের সবচেয়ে সুন্দর ভিউ দেখা যায় কিন্তু আমাদের মন পড়ে ছিল কীভাবে থ্রি সিস্টার্সকে ছুঁয়ে দেখা যায়। এরপর আমরা বিফল মনোরথে যখন ফিরে আসছি ঠিক তখনই দেখা মিলল 'থ্রি সিস্টার্স ওয়াকওয়ের'। সেটা ধরে আরও আধা ঘণ্টার মতো হাঁটার পর দেখা মিলল 'জায়ান্ট স্টেয়ারের ওপরের অংশের। এই পুরো যাত্রাপথে অনেক মানুষের সঙ্গেই কুশল বিনিময় করলাম আমরা। এখানে এসে এক প্রৌঢ় দম্পতির সঙ্গে দেখা হলো। আমি তাঁদের বললাম: ওপর এবং নিচ মিলিয়ে আমরা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে হাঁটছি শুধু থ্রি সিস্টার্সকে ছুঁয়ে দেখব বলে। সেটা শুনে ভদ্রমহিলা বললেন: তুমি তো দেখি সুপার ড্যাড অর আই মাস্ট সে হিরো ড্যাড।

default-image

এরপর ওনারা বললেন: এখনো আসল অংশটা বাকি রয়ে গেছে। এই 'জায়ান্ট স্টেয়ার' ধরে দুই শ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলেই দেখা মিলবে থ্রি সিস্টার্সে যাওয়ার সেতুটার যেটার নাম 'হানিমুন ব্রিজ' আর সেটা ধরে আরও আট শ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলে দেখা মিলবে সেই জায়গাটার, যেখান থেকে তোমরা ফিরে গিয়েছিলে। আমি বললাম অনেক ধন্যবাদ তোমাদের, তোমাদের দিনটা ভালো কাটুক। প্রত্যুত্তরে ওনারাও আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফিরে চললেন। জায়ান্ট স্টিয়ারের সিঁড়িগুলোর ঢাল খুবই খাড়া, তাই আমি রায়ানকে আমার পিঠে নিয়ে নিলাম, কারণ ও এমনিতেই অনেক ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপর আমরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। আমাদের দেখে সবাই সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিচ্ছিল, কারণ আমি রায়ানকে দেখিয়ে সবাইকে বলছিলাম, সাইড প্লিজ, এই হ্যাভ এ বিগ ব্যাকপ্যাক।

অবশেষে হানিমুন ব্রিজে এসে রায়ানকে পিঠ থেকে নামিয়ে দিলাম। এরপর ওরা দুভাইবোন প্রতিযোগিতা করে থ্রি সিস্টার্সের কোলে গিয়ে বসে পড়ল। এরপর ওখানে বসে সঙ্গে আনা চিপস আর পানি দিয়ে নাশতা সেরে নিল। একটা ব্যাপার আমাকে খুবই অবাক করছিল, মাত্র এগারো এবং পাঁচ বছরের এই বাচ্চা দুটো আমার সঙ্গে সঙ্গে এই উঁচু–নিচু পাহাড়ি রাস্তায় হেঁটে চলেছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে কিন্তু তবুও তাদের কোনো ক্লান্তি নেই। আসলেই শিশুদের জীবনীশক্তি অফুরান। ইতিমধ্যে আমার মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, তাই ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। এখানে বলে নেওয়া দরকার, সিনিক ওয়ার্ল্ডে মোবাইলের নেটওয়ার্ক থাকে না বললেই চলে, তাই গ্রুপে বেড়াতে গেলে সবাই একসঙ্গে থাকা শ্রেয়।

default-image

এরপর আমরা ফিরতে শুরু করলাম। ফেরার সময় রায়ান একাই খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। আমি শুধু ওর পেছনে থেকে ওকে কাভার করে গেলাম। ওপরে উঠেই ওদের জন্য পানি আর নিজের জন্য কফি নিয়ে নিলাম। আমাদের শরীরে হাঁটার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না, তাই ৬৮৬ নম্বর বাসের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম, যেটা সিনিক ওয়ার্ল্ডে যায়। বাস থেকে নেমে গাড়িতে এসে স্টার্ট দিয়েই শুরুতে মোবাইলটা চার্জে দিয়ে দিলাম, কারণ মোবাইল না হলে গুগল ম্যাপস চালানো যাবে না। গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের দুজনের নাক ডাকার শব্দ পেলাম। পুরো রাস্তাটা আমার মনে হচ্ছিল যেন আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। আসলেই সিনিক ওয়ার্ল্ডের রাইডগুলো খুবই উপভোগ্য, অনেকটা অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো আর থ্রি সিস্টার্সকে ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতাটা দুর্দান্ত। আপনি চাইলে দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন ব্লু মাউন্টেইন সিনিক ওয়ার্ল্ডের উদ্দেশে আজীবন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে।

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন