default-image
বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ায় পঞ্জিকা অনুযায়ী এখন চলছে স্কুল হলিডে। স্কুল হলিডের সঙ্গে বোর্ডের ইস্টারের ছুটি মিলিয়ে আমরা বেশ কয়েক দিন একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ পেয়ে গেলাম। এবার আমরা পরিকল্পনা করলাম, এক দিনের জন্য হলেও সিডনির সেন্ট্রাল কোস্টের ট্রি টপে বেড়াতে যাব। সেন্ট্রাল কোস্টের ট্রি টপ অবস্থিত ওয়ায়ং সাবার্বে। সিডনি থেকে এক ঘণ্টার ড্রাইভ আর আমাদের বাসা থেকে দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ। আমরা আর আশফাক ভাইয়েরা মিলে পরিকল্পনা করে ফেললাম। সেই মোতাবেক একদিন সকালে রওনা দিয়ে দিলাম। আমাদের গাড়িতে পরিবার নিয়ে আমি এবং অন্য গাড়িতে সপরিবার আশফাক ভাই।

default-image

দেড় ঘণ্টার এই যাত্রা একটু বিরক্তিকর। শুরুতে মোটরওয়ে এম ৫ এবং এম ৭ হয়ে আসে নতুন টানেল নর্থ কানেক্স, তারপর শুরু হয় এম ১ মোটরওয়ে। এই দীর্ঘ সময়ে ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং হুইল ধরে রাখা ছাড়া তেমন কোনো কাজ থাকে না। তবে এম ১–এ ওঠার পর চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। পাহাড় কেটে কেটে এ রাস্তা বানানো হয়েছে। তাই রাস্তার দুই পাশে চৌকিদারের মতো পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে।
ট্রি টপে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করে আমরা কাউন্টারে গেলাম। এখানে পর্যাপ্ত পার্কিং আছে আর যাওয়ার আগে অনলাইনে টিকিট কিনে রাখা ভালো। তাহলে আর কোনোভাবেই টাইম স্লট মিস হওয়ার সুযোগ থাকে না। তা না হলে টাইম স্লট মিস হতে পারে, যেমন এবার ইস্টারের ছুটির চাপে ক্রেজি রাইডারের কোনো টাইম স্লট ফাঁকা ছিল না।

এই ট্রি টপে মোট তিন ধরনের কার্যকলাপ আছে। ট্রি টপ অ্যাডভেঞ্চার, ট্রি টপ ক্রেজি রাইডার এবং ট্রি টপ নেট বল। ট্রি টপ অ্যাডভেঞ্চার হচ্ছে অনেক উঁচু গাছের ওপর দিয়ে এক গাছ থেকে অন্য গাছের দিকে ঝুলন্ত মইয়ে হেঁটে যাওয়া। আপনার যদি উচ্চতাভীতি থাকে, তাহলে এটাতে অংশ না নেওয়াই ভালো। ট্রি টপ ক্রেজি রাইডার বেশ সহজ। এখানে মোট দুটি লুপ আছে। গাছের উঁচুতে ঝোলানো রেলিংয়ের সঙ্গে একটা ঝুলন্ত চেয়ার বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঝুলন্ত রেলিংয়ের ঢাল এমনভাবে বজায় রাখা হয়, যাতে কেউ ঝুলন্ত চেয়ারে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অনায়াসেই যেতে পারে। আর টি টপ নেট বলটা হচ্ছে একটা ফ্যামিলি অ্যাকটিভিটি। এখানে পুরো পরিবার উঠে আনন্দ করতে পারে, তবে শিশুদের বয়স অন্ততপক্ষে এক বছর হলে ভালো হয়।

আমরা এর আগেও একবার ওখানে গিয়েছিলাম তাহিয়া ও রায়ানকে নিয়ে। সেবারও আমরা ট্রি টপ অ্যাডভেঞ্চার করতে পারিনি। কারণ, শিশুদের অন্ততপক্ষে একজন বয়স্ক মানুষের সুপারভিশন দরকার হয়। সেবার তাহিয়া ক্রেজি রাইডারে উঠেছিল। আর এবার আমরা শুধু নেট বলেই উঠতে পেরেছিলাম। অ্যাডভেঞ্চার ও নেট বল দুটিতেই মোটামুটি দুই ঘণ্টার একটা টাইম স্লট দেওয়া হয়। তবে ক্রেজি রাইডারে সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। রাইড শেষ করতে যতটুকু সময় লাগে, সেটুকুই।

বিজ্ঞাপন

ক্রেজি রাইডারে গাছের ওপর দিয়ে রেলিংটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটা নিচ থেকে দেখতে দারুণ লাগে। তাহিয়া এটাতে রাইড করছিল। আমি আর রায়ান নিচে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম, কীভাবে সে এক গাছ থেকে অন্য গাছ ঘুরে ঘুরে পাতার আড়ালে হারিয়ে গেল!

default-image

এবার আমরা সবাই মিলে নেট বলের বুকিং করলাম। বুকিং শেষ হলে নেট বলে ওঠার শুরুতে সবাইকে দাঁড় করিয়ে একটি ছোট ক্লাসের মতো নেওয়া হয়। সেখানে বলে দেওয়া হয়, কী কী করা যাবে আর কী কী করা যাবে না। এরপর একটা একটা করে ধাপ পেরিয়ে গাছের ওপরে একটা বেস স্টেশনে যেতে হয়। তারপর সেখান থেকে বিভিন্ন দিকে যাওয়ার রাস্তা আছে। এই রাস্তাগুলো দড়ির তৈরি জালের মতো। পা দিলেই তা দেবে যায়। তাই আপনাকে একটু ব্যালান্স রাখতে হবে, তা না হলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। রায়ানের এসব ব্যাপারে সীমাহীন উৎসাহ। তাই তাকে সবার আগে যেতে দিতে হয়, তা না হলে সে আর যেতে চায় না।

default-image

শুরুতেই একটা বড় জায়গা, সেখানে দুটি বড় প্লাস্টিকের বল রাখা। সবাই লাফালাফি করার পাশাপাশি এই বল ঠেলে একজন অন্যজনের গায়ে ফেলে দেয়। অনেকেই জালের ওপর শুয়ে পড়ে, তখন অন্যরা বল গড়িয়ে তাদের ওপর দিয়ে নিয়ে যায়। নেট বলে ওঠার শুরুতে দিশা ভাবি আর আমার গিন্নি রাজি না থাকলেও ওপরে গিয়ে তারা ঠিকই উপভোগ করেছিল। এর পরের জায়গায় রাখা আছে বোলিংয়ের পিনের মতো দুটি প্লাস্টিকের বড় পিন, যেগুলোর মধ্যে হাওয়া ভরা। সেটা নিয়ে কেউ মেকি মারামারি করে, আবার কেউ সেগুলোর ওপর চড়ে বসে। রায়ান সেগুলোর একটিকে ঘোড়া বানিয়ে চড়ে বসল। এরপরের ঘরে আছে তিনটা দোলনা। সেখানে শুয়ে বা বসে বিশ্রাম নেওয়া যায়। সেখানে এসে দিশা ভাবি আর আশফাক ভাই একটার মধ্যে বসে বিশ্রাম নিয়ে নিলেন।

তার পরেরটার মধ্যেও আছে প্লাস্টিকের মাঝারি আকৃতির বল এবং সংখ্যায় অনেক। এগুলো আকারে বেশ ছোট, তাই লাথি দিয়ে সরানো যায়। আমরা সেগুলোকে লাথি দিয়ে বল বানিয়ে খেলা শুরু করলাম। তার পরেরটাতেই আছে একেবারে ছোট ছোট টেনিস বলের মতো প্লাস্টিকের বল, সংখ্যায় অনেক। যেকোনো শিশু সেই প্লাস্টিকের বলের পুকুরে ডুব দিয়ে হারিয়ে যেতে পারে। রায়ান, তাহিয়া আর দৃপ্ত সেখানে গিয়ে ডুব দিল। আমি খুঁজতে গিয়ে দেখি দৃপ্ত নেই। পরে তার নাম ধরে ডাকলে সে বলের নিচ থেকে উত্তর দিল। এ ছাড়া এই জায়গাগুলোর মাঝবরাবর হাঁটার একটি বড় প্রশস্ত জায়গা আছে। আমরা দল বেঁধে সেখানে দাঁড়িয়ে দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লাম।

default-image

নেট বলের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে, এর ওপর দিয়ে হাঁটা বা লাফানোর সময় আপনার মনে হবে, আপনি মহাশূন্যের কোনো আকাশযানে আছেন। আপনি মোটেও অভিকর্ষ অনুভব করবেন না। পা দিলেই সেটা দেবে যাবে, আবার পরমুহূর্তেই সেটা বাউন্স করবে। মনে হবে যেন আপনি হাওয়ার ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছেন। এই দৌড়ে একেবারে রায়ান থেকে শুরু করে সবাই অংশ নিল। সবার অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল, সবাই যেন তাঁদের ছোটবেলায় ফিরে গেছেন, যেখানে পাড়া বা মহল্লার মোড়ে দল বেঁধে সবাই একসঙ্গে খেলাধুলা এবং দৌড়াদৌড়ি করত। এ ভাবেই লাফালাফি, হাঁটাহাঁটি, দৌড়াদৌড়ি করতে করতে কখন যে আমাদের জন্য নির্ধারিত দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, তা খেয়ালই করিনি। কিন্তু অবশেষে নেমে আসতে হলো।

নিচে এসেই আমরা সবাই ভ্রাম্যমাণ খাবার ভ্যান থেকে ঠান্ডা পানীয় নিয়ে নিলাম। আর অনেকেই ভ্রাম্যমাণ শৌচাগারে গেল। এরপর একটি টেবিলে বসে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া খাবার খেতে বসলাম। এখানে গেলে খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ভালো। কারণ, ভ্রাম্যমাণ খাবার দোকানে স্ন্যাকস ছাড়া তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। এতে আপনার তৃষ্ণা মিটলেও ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে না। আর একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, এখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। তাই গ্রুপে গেলে আগে থেকেই কর্মপরিকল্পনা করে নেওয়া যুক্তিযুক্ত।

এখানকার রাইডগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে, অবধারিতভাবেই এগুলো আপনাকে আবার আপনার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। নতুনভাবে নিজের ভেতরের শিশুটাকে আবারও আবিষ্কার করবেন আপনি। আর উত্তেজনাগুলো দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তিকে ধুয়েমুছে নিয়ে যাবে। এখান থেকে বের হবেন একেবারে নতুন একটি মন নিয়ে। দিন শুরু করতে পারবেন একেবারে নতুনভাবে। আর শিশুরা বয়ে নিয়ে আসবে নতুন সব স্মৃতি।

বিজ্ঞাপন
ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন