হৃদয়ের সোনারোদে জেগে থাকা শহর টোকিও

আগস্টের ১৫ তারিখে ঢাকার গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত জাপান দূতাবাসে ভিসা অফিসারের মুখোমুখি হলাম। ভিসা অফিসার তন্নতন্ন করে আমার দেওয়া সব কাগজপত্র পরীক্ষা করলেন। প্রশ্ন ছিল, কত দিন ধরে আমি কোর্টে প্র্যাকটিস করছি, বাংলাদেশে একজন ল গ্র্যাজুয়েটকে আইনজীবী সনদ পেতে গেলে কী কী ধাপ অতিক্রম করতে হয়? কিছুটা সন্তোষজনক উত্তর পাওয়ার পর ভিসা অফিসার পাসপোর্ট রেখে দেন, আর নির্দিষ্ট দিনে আসতে বলেন। ভিসা অফিসারের সদর্থক উত্তর আমাকে জানিয়ে দেয় আবেদনের পরিণতি।

মাঝখানে কয়েকটি ফাঁকা দিন। আনন্দের ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে নীলাকাশে ভাসিয়ে দিই ইচ্ছে ফানুস! যথাসময়ে থাই এয়ারলাইনসের টিকিট কেটে রওনা হই স্বপ্নময় জাপানের পথে! থাই এয়ারলাইনসের এয়ার হোস্টেসদের দ্বারা আপ্যায়িত হতে হতে পৌঁছে যাই মাত্র দুই ঘণ্টায় যাত্রাবিরতির মঞ্চে। এবার ব্যাংকক টু টোকিও কানেকটিং ফ্লাইট। যাত্রাবিরতিতে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুবিশাল লবিতে ঘুরতে ঘুরতে ইমোতে কথা বলি, নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, সেই দেশি সুহৃদ কাজল মজুমদারের সঙ্গে। এদিকে তিনি এবং তাঁর জাপানি সহধর্মিণী জানতে উদগ্রীব, কখন আমার উড়োজাহাজ অবতরণ করবে নারিতা বিমানবন্দরে।

বিজ্ঞাপন

২৬ আগস্ট ২০১৭, ভোর ৬টায় আমি পৌঁছে যাই স্বপ্নভূমি জাপানে। যেখানে আমি পৃথিবীর ৯০টি দেশের একজন হয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবীদের সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি বাংলাদেশের হয়ে। টোকিওর বিখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল ‘হোটেল হিলটন’ সিনজুকি আমার সম্মেলন ভেন্যু। থাকার বন্দোবস্ত এই হোটেলে থাকলেও প্রিয়জনদের আবদার ফেরানো দায়; তাই আমার থাকার বন্দোবস্ত হলো প্রবাসীদের সঙ্গে, প্রিয়জন কাজলদার বাসায়।

টোকিওর কিংসশিখো টোকিওর বৃহত্তম বাণিজ্যিক এলাকা। কিংসশিখো যেতে হলে আপনাকে জেআর সবুলাইন (টোকিওর মেট্রো ট্রেন) চড়ে হলুদ রঙের ট্রেনে উঠতে হবে। সময়সচেতন জাপানিরা যে বর্ণময় জাতিও, তা ওঁদের পোশাক, আভিজাত্য আর ট্রেনে চড়া দেখেই বোঝা যায়। যেমন অঞ্চলভেদে তাঁদের ট্রেনের রং আলাদা। ফলে ভিন্নভাষী মানুষের বিভ্রান্তিতে পড়ার সুযোগ কম।

টোকিওর কিংসশিখো টোকিওর বৃহত্তম বাণিজ্যিক এলাকা। কিংসশিখো যেতে হলে আপনাকে জেআর সবুলাইন (টোকিওর মেট্রো ট্রেন) চড়ে হলুদ রঙের ট্রেনে উঠতে হবে। সময়সচেতন জাপানিরা যে বর্ণময় জাতিও, তা ওঁদের পোশাক, আভিজাত্য আর ট্রেনে চড়া দেখেই বোঝা যায়। যেমন অঞ্চলভেদে তাঁদের ট্রেনের রং আলাদা। ফলে ভিন্নভাষী মানুষের বিভ্রান্তিতে পড়ার সুযোগ কম।

কিংসশিখোর চারপাশের এলাকা মূলত শপিংভিত্তিক। এ ছাড়া রয়েছে অসংখ্য নৈশক্লাব আর বার। কাজলদার সঙ্গে মধ্যরাতে বাংলাদেশের গল্প করতে করতেই একটি বারে ঢুকলাম। বারগার্ল এসে অভ্যর্থনা জানালেন। এই বারগার্লরা আবার সাদা চামড়ার দেশ পোল্যান্ড, রোমানিয়া, রাশিয়া থেকে আগত। এখানে খদ্দেরকে যত বেশি টেবিলে বসিয়ে রাখা যায়, তত লাভ!

এখানেই পরিচয় হয় এক বয়স্ক জাপানি আন্তিয়াগোর (৬৫) সঙ্গে। কথায় কথায় তিনি আমাকে বুক ফুলিয়ে জানালেন, তাঁর প্রথম বউ ছিলেন এক রাশিয়ান, বছরখানেক ঘরসংসার করার পরই ডিভোর্স দিয়েছেন। তবু স্মৃতি তাঁকে তাড়িত করে প্রতিক্ষণ, তাই মানিব্যাগে যত্ন করে রেখেছেন প্রথম বউয়ের ছবি।

default-image

জাপান সম্পর্কে বাংলাভাষীদের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান ভ্রমণ। বিশ্বকবি ১৯১৬ সালে জাপান ভ্রমণ করেন। তাঁর সেই ভ্রমণ বিবরণী ‘জাপান যাত্রী’ বই আকারে প্রকাশের পর বাংলার বিদগ্ধ সমাজে দেশটির নতুন পরিচিতি উঠে আসে।

যাহোক, ফিরে আসি বিস্ময়কর জাপানে। জাপানিদের সঙ্গে আমাদের কিছু মিল রয়েছে। বলা যায়, আমাদের মতো জাপানিরাও ভাত খায়। তাই বলে ওদের কেউ ভেতো জাপানি বলে না! ভাত খেয়ে আমাদের মতো বোধ হয় ঘুমায় না; তাই ওদের ভুঁড়িটাও বাড়ে না। আমার সামনেই ইন্ডিয়ান হোটেলে এক জাপানি কী অনায়াস ভঙ্গিতে স্টিলের বাটিতে রাখা দেড় শ গ্রামের মতো আঠালো ভাত, একটি সেদ্ধ করা সাগরের মাছ, সঙ্গে পর্যাপ্ত সস, এক টুকরা বেগুন, কিছু শসা-টমেটোর মতো সালাদ চপস্টিক দিয়ে খেয়ে নিলেন!

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ খাবার শেষে জুসও নিচ্ছেন; সেই তালিকায় আছে দই, আইসক্রিমও। পাড়ার মোড়ে মোড়ে রয়েছে অল্প পয়সার কয়েনের সাহায্যে নানা জাতের সফট ড্রিংকস, বিয়ার গলাধঃকরণের সুবিধা। পানির দামের চেয়ে অনেক সস্তা এই সব বিয়ার। মনে হলো, বহুকাল ধরে জাপানিরা পানির পরিবর্তে বোধ হয় বিয়ারই পান করে যাচ্ছে!
আগন্তুক হয়ে থাকার মধ্যে একধরনের সুপ্ত আনন্দ থাকে। জীবনকে ভীষণ উপভোগ্য করে তুলতে এই যেমন বিদেশ–বিভুঁইয়ে ইচ্ছা করেই পথ হারিয়ে ফেলি! ঢুকে পড়তে ইচ্ছা করে জাপানি তরুণীদের হৃদয় নগরে! যে অচেনা নারী আমাকে দেখে এক গাল হাসেন, তাঁর কাছে ছুটি নীড়-হারানো পাখি আমি। ঠিকানা খুঁজে পেতে পরিচয়পর্ব সারি। মুগ্ধতা মাখানো সারল্যে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন, মিচিকো সাকুরা; ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত এ ছাত্রী।

উন্নত জীবনযাপন সত্ত্বেও জাপানিদের মধ্যে অহংয়ের প্রকাশ অত্যন্ত কম। বৌদ্ধরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মানবধর্মকে এঁরা বড় করে দেখেন।

উন্নত জীবনযাপন সত্ত্বেও জাপানিদের মধ্যে অহংয়ের প্রকাশ অত্যন্ত কম। বৌদ্ধরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মানবধর্মকে এঁরা বড় করে দেখেন। রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর ধর্ম যে অচল, সে প্রসঙ্গে আলাপ করতে করতেই মিচিকো ওসাকা জানালেন বিস্তর তথ্য। এখানে ধর্মীয় উৎসবের চাইতেও বড় নববর্ষ উদ্‌যাপন। নতুন স্যুট-কোট-টাই-জুতা পরে পুরুষেরা উন্মাতাল হয়, নারীরা হাল ফ্যাশনের পাশ্চাত্য পোশাক পরে নাচ-গান, আনন্দ-খুনসুটিতে ভাসিয়ে দেয় দিনটাকে।

পুরো টোকিও ঘুরলে আপনার কাছে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি দৃশ্যমান হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ব্যবসায়িক বুদ্ধির সঙ্গে শান্তির বাণী যোগ করে কর্মচঞ্চল এই নারীরাই এগিয়ে নিয়েছেন জাপানের অর্থনীতিকে। বিমানবন্দর, স্টেশন, ফ্যাশন হাউস, কফি হাউস, হোটেল-মোটেল সর্বত্রই নারীদের ব্যাপক পদচারণ। ‘জাপানি নারী’ আজ তাই দুনিয়াতে এক ব্র্যান্ডিং; যাঁদের আতিথ্য লাভের জন্য বিদেশি পর্যটকেরা উন্মুখ। আর বাঙালি যুবক আমি তো আগে থেকেই জানি আমেরিকান বাড়ি, চীনা খাবার আর জাপানি বউয়ের শ্রেষ্ঠত্বের কথা।

আগেই জানা ছিল, টোকিও স্কাই ট্রি বিশ্বের সর্বোচ্চ টাওয়ার। ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ঈদের দিন। প্রবাসীদের অনেকেই দেখলাম কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়েছেন।

কিংসশিখোর স্থানীয় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের পর, আমি তাই টোকিও স্কাই ট্রি দেখার জন্য উন্মুখ হই। আমাকে সঙ্গ দেন কাজলদা এবং তাঁর বন্ধু হক রোকন। স্কাই ট্রি অভ্যর্থনায় লিফলেট পড়ে জানলাম, এটি একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভবনও। অনেকে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু না, এটি শুধু সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার। মূলত টেলিভিশন সম্প্রচার আধুনিকায়নের জন্য জাপান সরকার ২০০৬ সালে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ২০১২ সাল থেকে পর্যটকদের জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

default-image

সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারের ওপর থেকে পৃথিবী দেখে মন প্রশান্ত হলো। নানা দেশের মানুষের ভিড়, জটলা, সবাই সেলফি তুলে নিচ্ছেন। এই টাওয়ারে হয়তো জীবনে দ্বিতীয়বার আসা হবে না। লিফটে প্রতিটি ফ্লোর একবার করে ঢুঁ মেরে, আপন মনে আমিও কিছু ছবি তুলে নিলাম। আসলেই নয়ন জুড়ানো,অনিন্দ্য সুন্দর একটি টাওয়ার নির্মাণ করেছে জাপান সরকার।

আমাদের ঢাকার ওয়ারীর ছেলে কাজল মজুমদার। ২৭ বছর জাপান মুলুকে আছেন। জাপানি ভাষা বলেন বাংলার চাইতেও স্বাচ্ছন্দ্যে। তিনি একদিন আমাকে জানালেন, জাপানিদের ঐতিহ্য নগ্ন স্নান সম্পর্কে। ‘পাবলিক বাথ’ সম্পর্কে উৎসাহ বেড়ে গেল। এখানে প্রতিটি তিন তারকা থেকে পাঁচ তারকা মানের হোটেলে অত্যাধুনিক সুবিধাসংবলিত পাবলিক বাথ আছে। হোটেলের বাইরেও প্রতিটি শহরে আছে এ ধরনের পাবলিক বাথ।

default-image

জীবাণুমুক্ত থাকার জন্য এখানে কেউ কাপড় পরে গোসল করে না। নারী আর পুরুষদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। তবে অনেক জায়গায় দেখেছি, ছেলেমেয়ে একসঙ্গেও গোসল করে। এমনকি বাপ–ছেলে বা পুরো পরিবার একসঙ্গে গোসল করে। প্রথমে লকারে পোশাক রেখে পুরো উলঙ্গ হয়ে শাওয়ার এরিয়ায় ঢুকতে হয়। ঢুকেই শ্যাম্পু, বডি লোশন দিয়ে গোসল করতে হয়। তারপর বিশাল ঝাকুঝি সুইমিং পুলে কমপক্ষে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট গোসল করে আরেকটি অংশে ৪০ ডিগ্রির অনেক বেশি তাপমাত্রায় বসে থাকতে হয়। এরপর সাউনায় একটি কক্ষে ৮০ থেকে ৯০ ডিগ্রি তাপে আরও ১৫ মিনিট। সবশেষে ঠান্ডা পানির সুইমিং পুলে গোসল সেরে আবার শাওয়ার।

১৬ বছরের ছেলে থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই একসঙ্গে নগ্ন হয়ে গোসল করছেন। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেন না। সবাই সাবলীল। তবে এসব কিছুর জন্য কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না। শুধু লকারে ১০০ ইয়েন ছাড়া।

বিজ্ঞাপন

জাপান ঘুরব অথচ চেরিফুল দর্শন হবে না, তা কি হয়? ট্রেনে যেতে যেতে চেরিফুল কোথাও চোখে পড়ল না। জাপানের চেরি দেখতে তাই ঢুকতেই হলো সিনজুকুর বাগানে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও যেখানে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সাহেব ছুটে আসতেন বছরে একবার। পৃথিবীর যত রাষ্ট্রনায়ক জাপান সফরে আসেন, তাঁদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে আনা হয় চেরির বাগানে। সম্ভবত এর পেছনেও জাপানের কূটনৈতিক নীতি কাজ করে। জাপানের জাতীয় অগ্রগতিতে এই চেরি তাই শৌর্য ও সজীবতার প্রতীক।

default-image

চেরিফুলকে এখানে তুলনা করা হয় সামুরাইদের সঙ্গে। সামুরাই হচ্ছে একটি বীর্যবান যোদ্ধা শ্রেণি; যাঁরা মহৎ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অজেয় তেজে প্রতিদিনই জাপানিজদের মনে দীপ্তিমান। আসলেই কি তাই নয়? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত, প্রতিনিয়ত টাইফুন, ভূকম্পনে কেঁপে ওঠা, প্রাকৃতিক সম্পদে দৈন্য এক দেশ জাপান পৃথিবীর নানা দেশ থেকে কাঁচামালের রসদ জোগাড় করে এনে কী নিপুণভাবেই না শিল্পসামগ্রী তৈরি করে। এত নিখুঁত এর পণ্যের গুণগত মান যে ক্রেতা বনে যায় অর্ধেক পৃথিবী!

৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, প্লেনের সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে মনটা বিষণ্ণ হলো। প্রতিটি বিদায় মুহূর্ত বুঝি এমনই করুণ। ভাবিনি ঘোরের মধ্যে থাকা একটি সপ্তাহ এত অল্পতেই ফুরিয়ে যাবে! শত কষ্টের মধ্যে থাকা প্রবাসীদের ভালোবাসা খুব মিস করব। প্রাপ্তির হিসাব কষলে টোকিও আমাকে দিয়েছে উজাড় করে, অভিজ্ঞতা, বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ, নিয়মানুবর্তিতা—যা এ জীবনে বিস্মৃত হওয়ার নয়।

লেখক: আইনজীবী, ঢাকা জজকোর্ট।

মন্তব্য পড়ুন 0