অশান্ত ককেশাস, বিদ্রোহী তারুণ্য

চোখের পানিতে গাল ভিজে গেছে মাদিনা আলবাকোভার। গায়ে একটা কালো শাল। সেনাবাহিনীর তছনছ করা বসতঘরের সামনে বসে তিনি বর্ণনা করেন কম বয়সে বিধবা হওয়ার ঘটনা। রাশিয়ার খুবই অস্থিতিশীল মুসলিম প্রদেশ ইঙ্গুশেটিয়ায় গত ৯ অক্টোবর সেনারা তাঁর স্বামী মোভসার মেরজোয়েভকে গুলি করে হত্যা করে। ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাদিনা বলেন, তিনি (মোভসার) আইনের ছাত্র ছিলেন। বয়স বেশি হলে ২০ হবে। দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর। তিনি জানান, সেনারা মোভসারের বুকে রাইফেল ঠেকায় এবং তাঁকে ইসলামি জঙ্গি আখ্যায়িত করে গুলি করল। তারপর তাঁদের মূল্যবান সবকিছু—অর্থ-কড়ি, বাসনকোসন, এমনকি ছোট শিশুর কাপড়চোপড়ও নিয়ে গেল। রুশ সেনাবাহিনীর এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে ইঙ্গুশেটিয়ার পূর্বে চেচনিয়ায় দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। অঞ্চলজুড়ে বিস্তার ঘটছে মৌলবাদী মুসলিম বিদ্রোহের। এই বিদ্রোহীরা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়ে শক্তি বাড়িয়েছে। এক দশক আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চেচেন প্রজাতন্ত্রে সেনা পাঠান। গত এপ্রিলে মস্কো চেচনিয়ায় সামরিক অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করে । কিন্তু তারপর থেকেই রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে সহিংসতা বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনা। দীর্ঘ বিরতির পর আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনাও ঘটছে। গত ২৯ অক্টোবর এক গুলিবর্ষণের ঘটনায় ইঙ্গুশবিরোধী দলের একজন জনপ্রিয় নেতা গুরুতর আহত হন। এর কয়েক মাস আগে চেচনিয়ায় একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মীকে হত্যা করা হয়। পরমাণু কর্মসূচি প্রসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে মস্কোর অনাগ্রহের অন্যতম কারণ এই বিদ্রোহ। কূটনীতিকেরা বলছেন, প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান সাম্প্রদায়িক বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে এবং মুসলিম বিদ্রোহীদের সমর্থন দিতে পারে ভেবে ক্রেমলিন উদ্বিগ্ন। এদিকে অঞ্চলটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গি নিয়োগের একটি ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, গত মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্রোহীদের হামলা ও সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫১৯ জন নিহত হয়েছে। গত বছর এ সময়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৯৯ জন। বেশির ভাগ লড়াই হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে। উত্তর ককেশাসের এই এলাকাটির আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন অঙ্গরাজ্যের মতো। সেখানে বাস করে ৫০টি নৃতাত্ত্বিক জাতি-গোষ্ঠীর এক কোটি ৪০ লাখ লোক।কিছুদিন শান্ত থাকার পর বিদ্রোহীদের হামলা বেড়েছে চেচনিয়া এবং এর পার্শ্ববর্তী দাগেস্তান ও কাবারদিনো-বালকারিয়ায়। তবে সবচেয়ে সহিংস ঘটনা ঘটছে রাশিয়ার সবচেয়ে ছোট ও দরিদ্রতম প্রদেশ ইঙ্গুশেটিয়ায়। সেখানে সহিংসতার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। সেখানে এমনকি মানবাধিকার কর্মীরাও বন্দুক বহন করে।গত জুন থেকে চেচনিয়ায় সহিংসতা বেড়েছে। তখন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ইউনুস-বেক ইয়েভকুরবের গাড়ি বহরে এক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ইউনুস বেক গুরুতর আহত হন। প্রাণ হারান তাঁর তিনজন দেহরক্ষী। দুই মাস পর সুস্থ হয়ে ইউনুস বেক কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। পথে তাঁর ওপর এক আত্মঘাতী হামলায় ইঙ্গুশেটিয়ার সবচেয়ে বড় শহর নাজরানের পুলিশ বিভাগের কার্যালয়টি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। নিহত হয় কমপক্ষে ২৪ জন। আহত হন ২০০ জন। চেচনিয়ায় সহিংসতার জন্য রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি সরকার ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সমর্থনপুষ্ট মুসলিম চরমপন্থীদের দায়ী করে আসছে। মৌলবাদী ইসলাম এই অঞ্চলে আপেক্ষিকভাবে নতুন। ধর্মীয় অনুভূতি নয়, কঠোর জাতীয়তাবাদই বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে এবং সহিংসতা চেচনিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।বিদ্রোহী নেতা দকু উমারভ চেচনিয়ায় স্বাধীনতার লক্ষ্য ২০০৭ সালে বাতিল করে দেন এবং মৌলবাদী ককেশাস এমিরেট প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে জিহাদ ঘোষণা করেন। মস্কো গত এপ্রিলে চেচনিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার পর দকু বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রচার করেন। একই সঙ্গে তিনি পুনরুজ্জীবিত করেন রিয়াদ-উস-সালেহীন সংগঠনকে। ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত রাশিয়াজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার জন্য এই সংগঠনটিকে দায়ী করা হয়।সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আলেক্সান্ডার তিখোমিরভ। চেচনিয়ায় তিনি সাঈদ বুরিয়াতস্কি নামে পরিচিত। নিজ দেশ সাইবেরিয়ায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর গত বছর তিনি বিদ্রোহে যোগ দেন। পড়াশোনা করছেন মিসরে। তিখোমিরভের নেতৃত্বে সহিংসতা বাড়তে দেখে চেচনিয়ায় ক্রেমলিনের প্রতিনিধি প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ তিখোমিরভের মুসলিম পরিচয়ের প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন।ইন্টারনেটে তিখোমিরভের প্রকাশিত বিবৃতি ধ্বনিত হচ্ছে ইঙ্গুশেটিয়াজুড়ে। এই প্রদেশে বেকারত্বের হার ৭৫ শতাংশ। রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। তরুণেরা তাদের জীবনমান উন্নয়নের তেমন কোনো সম্ভাবনাই সেখানে দেখে না। বিবৃতিতে তিখোমিরভ নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার জন্য এই বাহিনীগুলোকে বহুলাংশে দায়ী করা হয়।বিশিষ্ট ইঙ্গুশ ব্যবসায়ী ও বিরোধী দলের নেতা মাকাশারিপ আউশেভ বলেন, তিনি (তিখোমিরভ) তরুণদের মুগ্ধ করেছেন। ইঙ্গুশেটিয়ার তরুণেরা তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসে।’ আউশেভ বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত, তিখোমিরভ তাঁদের চেয়ে অনেক ভালো। মানবাধিকার সংগঠন মেমোরিয়ালের তিমুর আকিয়েভ বলেন, বিদ্রোহে যাঁরা যোগ দিচ্ছেন তাঁরা সবাই তরুণ। যাঁদের আত্মীয়স্বজনকে সরকারি বাহিনীর সদস্যরা হত্যা করেছেন। তাঁরা সব হত্যার প্রতিশোধ নিতে চান। বিরোধী দলের নেতা মাগমুদ খাজবিয়েভ জানান, বিদ্রোহীরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে, যা সরকার দিতে চায় না বা দিতে পারে না। খাজবিয়েভ জানান, কয়েক মাস আগে লম্বা দাড়িওয়ালা কয়েকজন বিদ্রোহী রাইফেল নিয়ে তাঁর বাড়িতে আসেন। তাঁরা তাঁকে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য প্রতিবাদ সভা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, ‘আমরা মানুষের লেখা কোনো সংবিধান চাই না। আমরা আল্লাহর আইন চাই।’