আফ্রিকায় মাটির কন্যা

জীর্ণ কুটির, স্যাঁতসেঁতে মেঝে। বৃক্ষশাখাকে পেঁচিয়ে রাখা লতানো গাছ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে কুঁড়েঘরটিকে। এর মাঝেই জন্ম মেয়েটির। তখন ঘরে না ছিল পানি, না বিদ্যুত্। তখন কেনিয়া ছিল সবুজের চাদরে ঢাকা শান্তিময় একটি দেশ। প্রকৃতির আপন নিয়মে ছোট্ট মেয়েটি বেড়ে উঠতে থাকে। তার চোখের সামনেই সবুজ মাঠ হয়ে গেল রুক্ষ-ঊষর, ভরা যৌবনা নদী রূপ নেয় মরা গাঙে। একে একে উজাড় হতে থাকে বন জঙ্গল। এসব প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয় মেয়েটিকে। ততদিনে মেয়েটি হয়েছে তরুণী। সবুজে ঘেরা অরণ্য ফিরিয়ে আনতে কঠোর সংগ্রামে ব্রতী হন তিনি। নেমে আসে শাসকের নিষ্ঠুর খড়্গ। তাঁকে ছুড়ে দেওয়া হয় জেলে। মরতে মরতেও বেঁচে ওঠেন। পান সারা জীবনের স্বীকৃতি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। এ মহিলার নাম ওয়ানগারি মাথাই, আফ্রিকা মহাদেশে সবুজ বিপ্লবের নেত্রী। প্রকৃতিপ্রেমী এ মানুষটি বিশ্বময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন শান্তির বার্তা নিয়ে। তাঁর বক্তব্য—জীবন রক্ষাকারী বৃক্ষ কেটে ফেলা আর নিজের জন্য কবর খোঁড়া একই কথা।ওয়ানগারি মাথাইয়ের গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা বৃক্ষ দিয়ে। ১৯৪০ সালে মাথাই নিরক্ষর এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। একটা ডুমুরগাছের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিতেন তিনি।মাটির কন্যাজাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে তাঁর ভাষ্য ছিল, ‘সবুজ গাছগাছালি ছাড়া আমি থাকতে পারি না। এরাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। সত্যি বলতে আমি মাটির কন্যা। আর বৃক্ষই হচ্ছে আমার জীবন।’ছোটবেলায় তাঁর মা একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মেয়েকে স্কুলে দিয়েছিলেন তিনি। তখন আফ্রিকায় খুব কম মেয়েই পড়াশোনা করত। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওয়ানগারি মাথাইকে নৃশংসতার কদাকার রূপ দেখতে হয়েছে। কেনিয়া তখন ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের হটাতে গেরিলারা সশস্ত্র সংগ্রামে নামে। ১০০ ব্রিটিশ সেনাকে হত্যা করে তারা। এক লাখ মানুষ মেরে ওই হত্যাকাণ্ডের বদলা নেয় ব্রিটিশরা। অনেককে ঢোকায় জেলে। মাথাই তখন ষোড়শী। তাঁকে দুই দিন আটকে রাখা হয় জেলে। সেই দুই দিনের নির্মম মানসিক নির্যাতনের ক্ষত আজও তাড়া করে ফেরে সদা হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটিকে।ব্রিটিশদের নির্যাতন শুধু মানুষের ওপরই নয়, চলল প্রকৃতির ওপরও। দেশটির ক্রান্তীয় বনাঞ্চল কেটে ফেলল তারা। সেখানে চা-বাগান হলো। এতে মাটির উপরিস্তরের পানি ধরে রাখার মতো গাছপালা আর থাকল না। ফলে মাটি হয়ে গেল রুক্ষ, ঊষর। স্বাধীন হওয়ার পর কেনিয়ার শাসকগোষ্ঠী ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া প্রথাটাই বজায় রাখল। এদিকে মাথাই পরীক্ষায় অসামান্য ফল করে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে যান এবং পিএইচডি নিয়ে দেশে ফিরলেন। তখন তাঁর বয়স কতই বা হবে! ২৫ কি ২৬। সে সময় পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকায় তিনিই ছিলেন একমাত্র পিএইচডিধারী নারী। ওই বয়সেই ওয়ানগারি মাথাই অধ্যাপক বনে গেলেন। অথচ শুধু নারী হওয়ায় অন্য পুরুষ শিক্ষকদের তুলনায় বেতন কম পেতেন তিনি। এ সময় মাওয়াংগি মাথাই নামের এক তরুণ রাজনীতিবিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বিয়েও হয় তাঁরই সঙ্গে। মাথাই কেনিয়ার জাতীয় মহিলা পরিষদে যোগ দিলেন। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লক্ষ করলেন, বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। কী করা যায়, ভাবছিলেন। সমাধানটাও তাঁর মাথা থেকেই বেরোল। বেশি করে গাছ লাগাতে পারেন তাঁরা। যেই ভাবা সেই কাজ।সবুজ বিপ্লবগ্রামে গ্রামে ঘুরে মাথাই নারীদের বোঝালেন, গাছ লাগালে তা আমাদের ফল দেয়, কাঠ দেয়, দেয় জ্বালানি ও ছায়া। বৃক্ষের সবুজ পাতা গৃহপালিত পশুর খাবার হয়। এসব কথা মনে ধরল গাঁয়ের নারীদের। নারীদের এই উদ্যোগে পুরুষেরা হাসি-ঠাট্টা জুড়ে দেয়। তাতে দমলেন না মাথাই। তত দিনে তাঁর বরাতে একটা কলঙ্কতিলক লেখা হয়ে গেছে।স্বামীর সঙ্গে খুব একটা বনিবনা হচ্ছিল না। পদে পদে স্বামী তাঁকে শৃঙ্খলের বেড়াজালে বাঁধতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিবাদ করে বসলেন মাথাই। পরিণামে স্বামী তাঁকে তালাক দিলেন। আদালত অবধি গড়াল মামলা। তখন কেনিয়ায় তালাকের চল খুব একটা ছিল না। সারা দেশের সংবাদমাধ্যম ছেঁকে ধরল মাথাই দম্পতিকে। আদালত অবমাননার দায়ে জেল হলো মাথাইয়ের। জেল থেকে বেরিয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাও ছাড়লেন। আবারও বাদ সাধলেন আদালত। সংসদ নির্বাচনের অধিকার হারালেন মাথাই। অধ্যাপনায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিল না।চাকরি নেই, স্বামী নেই, হাতে টাকাও নেই। এবার মাথাই পড়লেন অকূল পাথারে। ছেলেমেয়েদের খাওয়ানোর মতো টাকাও তাঁর হাতে ছিল না। এদিকে বন বাঁচাও, বৃক্ষ লাগাও—আন্দোলন থেমে নেই মাথাইয়ের। হঠাত্ একদিন জানতে পারলেন, কেনিয়ার স্বৈরাচারী সরকার রাজধানী নাইরোবির একটি পার্কের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পার্কটি বাঁচাতে নারীদের নিয়ে আন্দোলনে নামলেন মাথাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চিঠি লিখলেন। শেষ পর্যন্ত পরাক্রমশালী ড্যানিয়েল অ্যারাপ মইয়ের সরকার পিছু হটতে বাধ্য হলো। জয় হলো মাথাইয়ের, রক্ষা পেল একটি পার্ক।ওই ঘটনার পর কেনিয়ার নাগরিকেরা একটু নড়েচড়ে বসে। একজন নারীর সাহসিকতার কাছে স্বৈরশাসক হার মেনেছে! এর চেয়ে বড় বিস্ময় আর কী হতে পারে!তবে স্বৈরাচারী ড্যানিয়েল অ্যারাপ মইও দমলেন না। নতুন উদ্যমে তিনি কারুরা নামে একটি বন ধ্বংসের কাজে হাত দিলেন। এবার সৈন্য-সামন্ত বনের আশপাশে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিল। থোড়াই পাত্তা দিলেন মাথাই। কর্মীদের নিয়ে ফের ঝাঁপিয়ে পড়লেন আন্দোলনে। এবারও পশ্চাদপসরণ করতে হলো স্বৈরশাসককে। এর এক বছরের মাথায় ওই স্বৈরশাসকের পতন ঘটে।ভবিষ্যদ্বাণীমাথাইয়ের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির মারের মুখে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়তে হচ্ছে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি ক্রমেই আয়তনে বাড়ছে। দারফুরের অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। অনাবৃষ্টির জন্য দেশে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেবে, দেখা দেবে দুর্ভিক্ষ। তখন ধনীরা সহজেই অন্য দেশে পাড়ি জমাবে। আর হতদরিদ্র নাঙ্গা-ভুখা মানুষের মিছিল এসে উঠবে ইউরোপের রাস্তায়।বহুদিন পর ওয়ানগারি মাথাই তাঁর ছোট্টবেলার সেই ডুমুরগাছটি দেখতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। কিন্তু হায়! গাছ কই? সেখানে ফাঁকা খালি ময়দান পড়ে আছে। গাছটি কারা কেটে নিয়েছে। অদূরে নতুন একটি গির্জা হয়েছে। জায়গাটায় কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন মাথাই। কখন যে তাঁর গণ্ডদেশ বেয়ে অশ্রুধারা নামতে শুরু করেছে, টের পাননি। তবে গাছ বাঁচানোর সংগ্রামটা তাঁর মধ্যে আরও কঠোর রূপ নেয়।