default-image

মাঝেমধ্যে ক্লাসও নেন তিনি। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে যখন কাজ করতাম, তখন মাঝেমধ্যেই আফসোস হতো—আরও বড় পরিসরে যদি কাজ করতে পারতাম! যখন আইসিডিডিআরবিতে যোগ দিই তখন আর তাই ফিরে তাকাইনি। কাজ করার জন্য যা চাই এর সবই পেয়েছি এখানে’—বলছিলেন ফেরদৌসী কাদরী।

মা নওশাবা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। মায়ের এমন প্রভাবেই বেড়ে উঠেছেন তিনি—ছোটবেলা থেকেই জানতেন নিজের কিছু একটা করতে হবে। আলাদা কিছু। তবে তা করতে পরিবারকে বাদ দেননি কখনোই। নিজেই বলছিলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত হতে হলে সবাইকেই কষ্ট করতে হয়। গবেষণার মতো বিষয় হলে তো কথাই নেই। প্রতিনিয়তই নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে ব্যক্তিটি যদি মেয়ে হয়, তবে তার দায়িত্ব দ্বিগুণ হয়ে যায় স্বভাবতই।’

default-image

আমাদের দেশে বিজ্ঞানী এমনিতেই কম। আর এর ওপর বিজ্ঞানী যদি হন নারী তবে তো একটু ভিন্ন ঘটনাই বটে। কীভাবে সব দিক মানিয়ে চলছেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একদিকে সংসার, অন্যদিকে অফিসের কাজ। কিন্তু আমি যখন কাজ করি তখন আমার মাথাকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নিই। যখন অফিসে আসি তখন বাসার সব চিন্তা বাদ দিয়ে দিই। আবার যখন বাসায় যাই তখন সেখানেই সব মনোযোগ। তাই মেয়ে হওয়াটা মোটেই কোনো বাধা নয়। নিজের কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে।’ এমনটাই মনে করেন ফেরদৌসী। ‘আমি নিজে পারছি, তাই আমার সঙ্গে যে মেয়েরা কাজ করছে, তারাও প্রত্যয়ী হয়—আমরাও পারব। আমি আমার নারী সহকর্মীদের সব সময়ই বলি, কখনো এমন কিছু করবে না, যাতে কেউ বলে তুমি নারী হয়ে আলাদা সুবিধা নিচ্ছ।’ মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত হতে হলে পরিবারের ভূমিকা অনেক বেশি বলে তিনি মনে করেন। ‘আমাকে দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হয়, এটা আমার সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই দেখে অভ্যস্ত। তাই বাড়ি ফিরে একটা বড় টেবিলে আমরা একসঙ্গে বসে থাকতাম। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করত, আর আমি অফিসের কাজ। এতে ওদের কাছেও থাকা হতো। আবার কাজও করা যেত।’ তাঁর তিন ছেলেমেয়েই চাকরি, পড়াশোনার কাজে দেশের বাইরে আছেন। তাঁর স্বামী সালেহিন কাদরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক।

default-image

ফেরদৌসী কাদরী বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, কাজের প্রয়োজনেও নিয়মিতই বিদেশে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু তিনি মনে করেন কাজ করার মতো যথেষ্ট সুযোগ এখানেই আছে। কোনো কাজ করে তা যখন নিজের দেশেই প্রয়োগ করা যায়, এর তৃপ্তি অন্য রকম তাঁর কাছে। ‘আমরা যখন কোনো ভালো কাজ করি, তখন বিদেশিরা আমাদের কাজটাকে অনেক সাধুবাদ জানায়। এর যে আনন্দ তা অন্য দেশে কাজ করে কোথায় পাব। আর ভালো কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০০৬-এর ইনফেকশাস ডিজিজেস সোসাইটি অব আমেরিকার (এফআইডিএসএ) নির্বাচিত ফেলো হয়েছেন তিনি।

২০০৫-এর জীববিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৭ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের স্বর্ণপদক পেয়েছেন তিনি।

default-image

কতটা কাজপাগল তিনি তা বোঝা যায় তাঁর অফিসকক্ষে গিয়েই। কাজে এতটাই ডুবে থাকেন যে মোবাইল ফোন ব্যবহারও করেন খুব কম। পাছে কাজের সমস্যা না হয়ে দাঁড়ায়। তিনি কাজ করছেন মূলত কী করে রোগ প্রতিরোধ করে সুস্থ থাকা যায় এর ওপর। ‘প্রতিদিন যখন অফিসে ঢুকি, তখন দেখি স্ট্রেচারে করে কত মানুষ আসছে এ হাসপাতালে। কোনো রোগী যদি নিচে বমি করে সেটাও আমার এই অফিস রুম থেকে শুনতে পাই। ডায়রিয়ার মতো জটিল রোগ হচ্ছে শুধু আমাদের সচেতনতার অভাবেই। আমরা বিশুদ্ধ পানি, খাবার দিতে পারছি না বলেই এত মানুষ রোজ আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে’—হতাশাভরা কণ্ঠে বলছিলেন তিনি। আর যে দুটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়া হয়, মূলত তা নিয়েই কাজ করছেন তিনি। ‘যদি আমরা এ রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন (টিকা) তৈরি করতে পারতাম, তাহলে তা মহামারির আকার ধারণ করত না। আইসিডিডিআরবি থেকে করা গবেষণার পরই খাবার স্যালাইন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এখন জিঙ্কের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এগুলো যদি কার্যকরী হয়, তবে কেন ডায়রিয়া প্রতিরোধে ভ্যাকসিন কার্যকরী করতে পারব না।’ এটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন ফেরদৌসী কাদরী। সামনে একটাই স্বপ্ন। একদিন দেশেই এই ভ্যাকসিনের কার্যকরী বাস্তবায়ন হবে। উদ্ভাবনের নেশায় বিভোর এই বিজ্ঞানী এমনই স্বপ্ন দেখেন।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন