স্কুলে পড়ার সময় আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল ঘুড়ি ওড়ানো। স্কুল থেকে ফিরেই কিছু না খেয়ে আমি ছাদে যেতাম ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য। এক দিন ঘুড়ির লাটাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে মায়ের সেলাইয়ের বাক্স থেকে কাটিম সুতো নিয়ে ছাদে গিয়েছিলাম ঘুড়ি ওড়াতে। এত সুন্দর বাতাস ছিল। আমার ঘুড়ি তখন একেবারে উঁচুতে।

আমাদের বাসার পেছনে ছিল কবরস্থান। তারপর রাস্তা, তারপর স্কুল। ঘুড়ি তখন স্কুলের মাঠের ওপরে উড়ছে তরতর করে। আমি সুতো ছাড়তে ছাড়তে আনন্দে ভাসছি। ভাসতে ভাসতে ভুলে গিয়েছি কাটিম সুতোতে কোনো গিঁট নেই। আমার ঘুড়ি তখন নিজের মতো আকাশে উড়তে উড়তে ভোকাট্টা।

খুব মন খারাপ হলো। বাসায় ফিরে না গোসল, না খাওয়া। আব্বার অফিস ছুটি হতো দুটোয়। সাইকেলে করে ফিরে, একটু খেয়ে বিকেল চারটায় আবার ছুটতে হতো। আব্বা অফিস থেকে এসে দেখল মেয়ের মুখ ভার। মায়ের বকুনিও জুটেছে কপালে। অফিসের পোশাক পাল্টে মেয়েকে নিয়ে ছুটলেন দোকানে। এক টাকার ঘুড়ি কিনে দিয়ে ফিরিয়ে আনলেন মেয়ের হাসি। সঙ্গে পঞ্চাশ পয়সার দুটো লেবেঞ্চুস। মেয়েকে কোলে করে বাসায় ফিরলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে। সেদিন তাঁর ঠিকমতো গোসল, খাওয়া কিছুই হলো না। কিন্তু মেয়ের আনন্দে তার মন ভরে গেল। বাসায় ফিরে বানিয়ে দিলেন নতুন লাটাই। বিকেলে মেয়ে ঘুড়ি ওড়াবে।

আমার বাবা তাঁর সততা, নীতি-নৈতিকতার লাটাইটি ঠিক তাঁর হাতে ধরে রেখেছিলেন। তারপর আমাকে স্বাধীনভাবে উড়তে দিয়েছিলেন আকাশে। আমার যা কিছু অর্জন, তাঁর জন্যই। একদিকে ছিল তার কোমলতা, অন্যদিকে কঠোরতা। যদি তিনি এই দুটোর সামঞ্জস্য করতে না পারতেন, তাহলে আমার জীবনটাও ভোকাট্টা হয়ে যেত।

কখনো সে ভাবে বলা হয়নি—তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি বাবা। খুউব। এই যে তুমি স্ট্রোক করার পর ঠিকমতো হাঁটতে পার না, তোমার বাঁ হাতটা অচল, ইচ্ছা করলেও তুমি তোমার মেয়েকে দুহাতে জড়িয়ে ধরতে পারো না। তবু সৃষ্টিকর্তার কাছে একটি জিনিসই চাই, খুব করে চাই—তুমি শুধু বেঁচে থাকো বাবা। আমার মাথার ওপরে মস্ত আকাশ হয়ে বেঁচে থাকো। তোমার আদরের মেয়ে তুমি ছাড়া ভোকাট্টা ঘুড়ি হয়ে যাবে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন