বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ডলহাউসের সেকাল-একাল

সেই ১৭ শতকে প্রধানত ইংল্যান্ড, হল্যান্ড আর জার্মানিতে প্রচলন ঘটেছিল ডলহাউসের। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে সময়ে এই ডলহাউসগুলো খেলার জন্য তৈরি হয়নি। বরং মেয়েদের গৃহস্থালি কায়দাকানুন শেখানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল সত্যিকারের বাড়ির এই ক্ষুদ্র রূপ। ব্যবহার্য আসবাব, তৈজস, ঘরের নানা সামগ্রী বা সে অর্থে যেকোনো জিনিসই অবিকলভাবে, তবে ছোট আকৃতিতে বানালে তাকে মিনিয়েচার বলা হয়।

default-image

১৭ শতকের শেষ দিকে এই মিনিয়েচার শিল্পের কদর খুব বেড়ে গেল। তাই তখন ডলহাউসগুলো প্রদর্শনের জন্যই তৈরি হতে লাগল। একেকটি ধনী পরিবারের বিশাল ভিক্টোরিয়ান ম্যানশনের রেপ্লিকা ডলহাউসরূপে সাজানো থাকত সে বাড়ির হলরুমে। কখনোবা এর সুরক্ষায় ব্যবহৃত হতো দরজা বা ডালা। তখন এগুলোকে বলা হতো ক্যাবিনেট হাউস। তবে ১৯০০ সালের মাঝামাঝি প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে গেল। তখন খেলনা পুতুল বা অন্যান্য খেলনার মতো প্লাস্টিক ব্যবহার করে ডলহাউস তৈরি হতে থাকল। শিশুদের মধ্যে এই খেলাঘর সারা বিশ্বেই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আমাদের দেশেও ডলহাউসের প্রতি সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেরই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে বিভিন্ন ডিজাইনের ডলহাউসের ছবি দেখা যাচ্ছে অনায়াসে।

দেশেই কাস্টোমাইজড ডলহাউস

default-image

অর্ডার নেওয়ার পর প্রতিটি শিশুর চাহিদা অনুযায়ী আলাদাভাবে শুধু তার জন্যই ডলহাউস তৈরি করেন আনিকা নূর। এই খেলাঘরগুলোর কাঠামো তৈরি করতে ৫ মিমি আর আসবাবের ক্ষেত্রে ৩ মিমি পরিমাপের প্লাস্টিক উড ব্যবহার করা হয়। মিনিয়েচারের আসবাব, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, যেমন ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এমনকি ওয়াশরুমের সামগ্রীও সযত্নে তৈরি করেন তিনি। তবে অনেক সময় বিভিন্ন প্রিন্টেড স্টিকার ও রেডিমেড মিনিয়েচার সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাচ্চাদের উপযোগী নন–টক্সিক উপকরণ ব্যবহার করা, যাতে তা থেকে কোনো রকম দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্যঝুঁকির অবকাশ না থাকে।

ডলহাউসের রকম বুঝে দরদাম

default-image

এ দেশে অনলাইনের মাধ্যমে বা দু–একটি বিশেষায়িত দোকানে মানসম্পন্ন ডলহাউস কেনা যায়। তবে সেগুলোর ন্যূনতম দাম ১০ হাজার। আবার কিছু খেলনার দোকান ও অনলাইন শপ কম দামে চীন থেকে আমদানি করা কিছু ডলহাউস দিচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সেগুলোর কাঠামো প্লাস্টিকের র‍্যাকের মতো হওয়ায় খেলতে গিয়ে ঠিক সেই আমেজ পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ২ ফুট উচ্চতার একরঙা মৌলিক কিছু ডলহাউস আনিকা ১ হাজার ৮০০ টাকাতেও বিক্রি করছেন। আবার বহুতল ম্যানশন হাউসের আদলে বানানো, সুইমিংপুল বা খুঁটিনাটি আসবাব নিয়ে নয়নাভিরাম লাইটিংয়ের ডলহাউসগুলোর দাম তিন হাজার থেকে শুরু। সুইমিংপুলে পানির বদলে বাচ্চাদের প্রিয় নিরাপদ স্লাইম ব্যবহার করা, ফেল্ট বা গ্লিটারড পেপার দিয়ে ফার্নিচারের সঠিক লুক আনা, নিরাপদ পলিমার ক্লে দিয়ে বানানো মিনিয়েচার খাদ্যসামগ্রী, উপযোগী লাইটিংয়ের ব্যবস্থার মতো ছোটখাটো বিষয়গুলো অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে খেয়াল রাখা হয় এখানে।

থিম অনুযায়ী ডলহাউস

default-image

আজকাল বাচ্চারা টেলিভিশন, ইন্টারনেটের ভিডিও সাইটের বদৌলতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যানিমেশন চরিত্র বা মুভির চরিত্রের বিশাল ভক্তকুলের অন্তর্ভুক্ত। শিশুতোষ অ্যানিমেটেড ছায়াছবি ‘ফ্রোজেন’-এর এলসা, ‘পেপা পিগ’ কার্টুনের আদুরে শুকরছানা পেপা, সুপারহিরো সিনেমাগুলোর চিরচেনা আর জনপ্রিয় স্পাইডারম্যান—ডলহাউসগুলো যেকোনো ফরমায়েশি থিমে সযত্নে তৈরি করেন আনিকা নূর। তবে থিমকেন্দ্রিক ডলহাউস বানাতে গেলে সে ব্যাপারে প্রচুর পড়াশোনা ও গবেষণা করার পক্ষপাতী তিনি। প্রতিটি অ্যাকসেসরি আর আসবাব বা স্টিকার নির্বাচন করার ব্যাপারে সচেতন থাকেন এই ডলহাউসের নির্মাতা। তাই থিমনির্ভর খেলাঘর তৈরিতে তিন সপ্তাহ থেকে মাসখানেক সময় লাগে তাঁর। তবে পেপা পিগ থিমে এত ডলহাউসের ফরমায়েশ আসে তাঁর, যে এখন এগুলো সাইজ ও ডিটেইলিং–ভেদে ৭-১৫ দিনেই পাওয়া যাবে। এই উদ্যোক্তা জানালেন, পেপা পিগ কার্টুন শোয়ের থিমের ডলহাউসগুলোর সবচেয়ে বেশি অর্ডার পান তিনি। থিম অনুযায়ী তৈরি করা ডলহাউসগুলো ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার দিয়ে শুরু। তবে ডিটেইলিংয়ের চাহিদা, খেলাঘরের আকার অনুযায়ী এর দাম সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত পড়তে পারে।

default-image

ছেলেমেয়ে সবার জন্য ডলহাউস

default-image

বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বেই সামাজিক ও পারিবারিক লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার বিষয়টি মাথায় নিয়েই ডলহাউস বানান আনিকা নূর। শৈশব থেকেই লিঙ্গনিরপেক্ষ খেলার সামগ্রী একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ডলহাউস দিয়ে শুধু মেয়েরা খেলবে, ছেলেরা বল বা গাড়ি নিয়ে সময় কাটাবে, এই ব্যাপারগুলো এখন ঘুণে ধরা বাস্তবতাবিবর্জিত ধারণা বলে স্বীকৃত। ছেলেদেরও শৈশবে রান্নাবাটি খেলা, ডলহাউস ইত্যাদি দিয়ে খেলার ব্যাপারে সমান স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। আবার গাড়িপ্রেমী শিশুদের জন্য আনিকা তৈরি করেন অসাধারণ কিছু বহুতল পার্কিং এরিয়া, গ্যারেজ ও কারওয়াশের আদলে খেলাঘর। এয়ারপোর্টের অবিকল মিনিরূপও তৈরি করেছেন উড়োজাহাজপ্রেমী শিশুদের জন্য। তার পেপা হাউসগুলো কিন্তু ছেলে–মেয়েশিশুনির্বিশেষে তুমুল জনপ্রিয়।

default-image

করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ, শিক্ষা, খেলাধুলা সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই গৃহবন্দী শিশুদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসবিহীন সুন্দর সময় কাটাতে এই খেলাঘরগুলো খুবই উপযোগী। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গবেষণায় জানিয়েছেন, এমনিতেই ডলহাউস দিয়ে খেলাচ্ছলে শিশুদের মোটর স্কিলস, সামাজিক দক্ষতা, মনোযোগী হওয়ার প্রবণতা ইত্যাদি ক্ষমতা বহুগুণে বাড়ে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি এই ডলহাউসগুলো স্মার্ট ডিভাইস থেকে লম্বা সময় দূরে রাখছে শিশুদের, জোগাচ্ছে শিক্ষামূলক বিনোদন।

ছবি: আনিকা নূর

লাইফস্টাইল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন