সঙ্গী হলো ডলার

শহিদুল তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা গবেষণা ইনস্টিটিউটে পড়েন। একদিন রেলস্টেশনে গিয়ে দেখেন, দুটি কুকুরছানা বেশ কষ্ট পাচ্ছে। স্টেশনে থাকা ছিন্নমূল শিশুরা তাদের খাবার জোগাড় করার চেষ্টা করছে। দেখে মায়া হলো, ছানাগুলোকে নিজের কাছে নিয়ে এলেন শহিদুল। বলছিলেন, ‘আলাওল হলে জায়গা দিয়েছিলাম। কিন্তু যত্নআত্তির নিয়মকানুন তো জানতাম না। অসুস্থ হয়ে ওরা একসময় মারা যায়।’

কিছুদিন বাদে আবার একটি কুকুরছানা নিয়ে আসেন শহিদুল। নাম রাখেন ডলার। শহিদুলের আদর–যত্নে ডলার এখন বেশ বড় হয়েছে। ১৩টি বাচ্চা দিয়েছে। হলের যে ব্লকে শহিদুল থাকেন, সে ব্লকের নাম দিয়েছেন ডলার ব্লক। আর তাঁর নামে বরাদ্দ রুমের নাম ‘ডলার হোম’। শহিদুল এখন যেখানেই যান, পিছু পিছু যায় ডলার। বন্ধুদের আড্ডাতেও সঙ্গে থাকে সে।

মধু পরিবার

হলের এক বড়ভাইয়ের মাধ্যমে একবার জানতে পারেন, কাদায় আটকে পড়েছে একটি বানরছানা। ছানাটিকে উদ্ধার করে সুস্থ করে তোলেন শহিদুল, পরে তাকে ছেড়েও দেন। কিন্তু একবার দলছুট হয়ে যাওয়া বানরকে অন্য বানরেরা আর নেয় না, এটি জানার পর শহিদুল নিজেই ওটার দায়িত্ব নেন। বলছিলেন, ‘বানরটিকে আদর-যত্নে বড় করতে করতে কখন যে মায়ায় জড়িয়ে গেছি, বুঝতে পারিনি। ও আমাদের পরিবারের সঙ্গে মিশে গেছে। করোনার দাপটের সময় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। পুরোটা সময় সে আমাদের বাড়িতেই ছিল। মা-বাবার ঝগড়া হলে বা আমি মন খারাপ করে থাকলে সে বুঝতে পারত। বুঝত, আমাদের মন ভালো নেই। সে-ও খাবার চাইতে আসত না। ওর জন্য আমার অনেক মায়া।’

করোনার বন্ধে একবার খবর পেলেন বড় একটা গাছ কাটার সময় মাটিতে পড়ে গেছে একটা ইগল আর প্যাঁচার ছানা। শহিদুল গিয়ে দেখেন, ছোট বাচ্চারা ইগলছানার একটি চোখ অন্ধ করে দিয়েছে, এখন পেটাচ্ছে। প্যাঁচা আর ইগলটাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান শহিদুল। পরে যেখানেই যেতেন শহিদুল, তাঁর কাঁধে বসে থাকত ইগল আর কোলে বানর। প্রাণীদের নিয়ে শহিদুল তাঁর পরিবারের নাম দিয়েছিলেন ‘মধু পরিবার’।

প্রাণী দুটির ভালোর জন্যই বানর আর ইগলটিকে তিনি চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় দিয়ে এসেছেন। বললেন, ‘সময় পেলেই ওদের দেখতে যাই। ছেড়ে আসতে মন চায় না। মনের ভেতর কেমন যেন করে।’

বাড়াতে চান সচেতনতা

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে বানর ও ইগল নিয়ে গোটা ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়িয়েছেন শহিদুল। কেন? বললেন, ‘আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছি যে ওরা কারও শত্রু নয়। চাইলে ওদের বন্ধু হওয়া যায়।’এ সচেতনতা আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান শহিদুল। পড়াশোনা শেষে বন্য প্রাণী নিয়ে গবেষণা করতে চান।

এরই মধ্যে অজগর, মেছোবাঘ, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, বেজিসহ আরও নানা প্রাণী উদ্ধার করে সেগুলোকে বনে ছেড়ে দিয়েছেন শহিদুল। কিছু প্রাণীকে চিড়িয়াখানায় হস্তান্তর করেছেন। শহিদুলের বাবা ফরিদ আহমেদ বাঁশখালীতে কৃষি কাজ করেন। তাঁর একটা চায়ের দোকানও আছে। মা মোকাদ্দেস বেগম সংসার সামলান। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে শহিদুল দ্বিতীয়।