খরা ও পানির অভাব রুখতে

এক যুগেরও বেশি সময় বৃষ্টি হয় না। এলাকার অন্যতম পানির উত্স নদীটি তাই নিষ্প্রাণ। এ কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার চাষবাস। কৃষির পাশাপাশি লোকজনের নিত্যব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত পানিও মিলছে না। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মারে ডার্লিং নদী-অববাহিকার এমন দশায় তাই দেশটির বিশেষজ্ঞদের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড়। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনসহ নানা কারণে দেশের এক-সপ্তমাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ওই নদীটি এখন ভয়াবহ পানিশূন্যতায় ভুগছে। যে প্রবাহ বর্তমানে রয়েছে তা অনেক সময় সাগর পর্যন্ত যেতে যেতেই শেষ হয়ে যায়।এ অবস্থায় নদীর পানির ওপর চাপ কমানোর জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পানির প্রবাহ তেমন একটা বাড়ানো যায়নি। নদীর উজানে বিশাল যেসব জলাধার রয়েছে, সেগুলোতে এখনো পানির সংকট চলছে। গত আগস্টের শেষ দিকে এক হিসাবে দেখা গেছে, নদী এলাকার কয়েকটি শহরের জলাধারে পানির পরিমাণ ভয়াবহ রকমের কম। ভিক্টোরিয়া রাজ্যের পাইকিস ক্রিক জলাধারের কথাই ধরা যাক। ওই জলাধারের পানির ধারণক্ষমতা দুই হাজার ২০০ কোটি লিটার। অথচ ওই সময় বিশাল ওই জলাধারটির মাত্র আড়াই শতাংশ পূর্ণ ছিল। এ কারণে রিসাইকেল (পুনর্ব্যবহারযোগ্য) করে পানির ব্যবহার ও বিকল্প উপায় নিয়ে গবেষকেরা কাজ করেছেন। পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়েও তাঁরা বিস্তর চিন্তা করছেন। কথায় আছে, ঠেকায় পড়ে শেখা। এ কথা অস্ট্রেলিয়ার মারে ডার্লিং নদী নিয়ে গবেষণাকারীদের জন্য শতভাগ খাটে। বিশেষজ্ঞরা সংকটে পড়ে পানির সুষম বণ্টন ও ব্যবহারের নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। দীর্ঘদিনের চরম খরায় বিপর্যস্ত মানুষজনের জন্য তাঁরা উদ্ভাবন করেছেন বিভিন্ন পদ্ধতি ও যন্ত্র। এভাবে বিশ্বের পানিপ্রযুক্তি উত্পাদনের অন্যতম বড় উত্স হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া।অস্ট্রেলিয়ান ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার অ্যান্ড্রু স্পিয়ারস বলেন, খরা-পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূ-উপরিভাগের পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পানির অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রসাধনের দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হচ্ছে। ব্রিসবেন শহরে পাঁচ বছর আগে দৈনন্দিন কাজে বছরে মোট পানির ব্যবহার হতো দুই লাখ ৫৬ হাজার লিটার। সেখানে এখন পানির ব্যবহার কমিয়ে এক লাখ ২৮ হাজার লিটারে আনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শৌচাগারে পানি সাশ্রয়ী বিশেষ ধরনের ফ্লাশ ব্যবহারের জন্য জনগণের মধ্যে প্রচার চালানো হচ্ছে। এতে কাজও হচ্ছে।মেলবোর্নে সেচপ্রযুক্তির বড় প্রস্তুতকারক কোম্পানি রুবিকন সিস্টেমের প্রধান নির্বাহী ডেভিড অজটন বলেন, আমাদের কোম্পানির একটি বড় লক্ষ্য ছিল কৃষিক্ষেত্রে পানির অপচয় রোধ করে কীভাবে এর সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা যায়, সে রকম যন্ত্র উদ্ভাবন করা।’ তিনি আরও জানান, বিশ্বের মুষ্টিমেয় দেশ ছাড়া অনেক এলাকাতেই কৃষিক্ষেত্রে পানি সরবরাহের সময়ই এর বেশির ভাগ অপচয় হয়ে যায়। আমাদের কোম্পানি পানির সেই অপচয় রোধে আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় ভিক্টোরিয়ার ছয় হাজার কিলোমিটার খালকে প্রযুক্তিগত সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। ওই খাল থেকে কমপক্ষে ১০ হাজার খামারে পানি সরবরাহ করা হয়। এখন আধুনিক পদ্ধতিতে পানি বণ্টনের কারণে সেখানে ৯০ ভাগ পর্যন্ত পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। রুবিকন তাদের প্রযুক্তি বাইরের দেশেও বিক্রি করছে। অজটন বলেন, চীনে দুটি এবং ভারতে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে রুবিকন কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রেও রুবিকন এ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইউরোপের কয়েকটি দেশেও রুবিকন অনেক আগে থেকেই কাজ করছে।ওয়াটার ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপ নামের আরও একটি কোম্পানি কৃষিপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তারা মূলত পানির বিকল্প উেসর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা ব্যবহার করা পানির পুনর্ব্যবহার নিয়ে কাজ করে। এডিলেইডে তাদের যে পানি রিসাইক্লিং প্রকল্প রয়েছে, তা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়। মেলবোর্নের পাশে অপর একটি কোম্পানি হলো বাটলার মার্কেট গার্ডেনস। বিশাল এই কোম্পানি পানি রিসাইকেল করে ব্যবহার করে। মূলত লেটুস পাতা ও এশিয়ান সবজি উত্পাদনের পর তারা সেগুলো অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় সুপার মার্কেটে সরবরাহ করে। হাজার হাজার মণ সবজি ধোয়ার কাজে তারা রিসাইকেল করা পানি ব্যবহার করে। কোম্পানির কর্মকর্তা রিক বাটলার বলেন, ‘আগে আমি সবজি ধোয়ার কাজে খাবার পানিই ব্যবহার করতাম। এ জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে গড়ে ৮০ হাজার লিটার পানি লেগে যেত। এখন রিসাইকেল করা পানি ব্যবহারের কারণে বিশাল অঙ্কের অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। এ জন্য আমরা ট্রাইপ্যাক্স কোম্পানির পানি রিসাইকেল যন্ত্র ব্যবহার করছি।’ট্রাইপ্যাক্স কোম্পানির বিপণন ও বিক্রয় প্রতিনিধি জুলি টেইলর বলেন, ‘বাটলার কোম্পানির জন্য আমরা যে প্রযুক্তির নকশাটি করেছি, তা কিন্তু নতুন কোনো উদ্ভাবন নয়। অতীতেও এ ধরনের যন্ত্র আমরা বানিয়েছি। কিন্তু তখন এর চাহিদা কম ছিল। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় খরার কারণে পানি সাশ্রয়ের বিষয়টি জোরেশোরে উঠে আসছে। তবে বিশ্বের অনেক দেশেই পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো কোনো বড় রকমের উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এর কারণ হলো, তারা এখনো অস্ট্রেলিয়ার মতো সংকটে পড়েনি। জলবায়ু যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাতে খুব শিগগিরই বিশ্বের অনেক দেশ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকটে পড়বে। ঘোরতর বিপদে পড়ার আগেই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’