বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

টরন্টো বিমানবন্দর থেকে বেরোতে আমাদের দেরি হচ্ছিল। কারণ, সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট। ওর কাগজপত্র দেখার ব্যাপার বোধ হয় ছিল। বেরোবার পর এমিরেটস এয়ারলাইনসের কর্মীরা লিমুজিন ডেকে দিলেন। আগে থেকেই বলা ছিল, তিনজনের লাগেজ মোটামুটি সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন সাইজের হবে। লিমুজিনের ড্রাইভার বলল, তোমাদের এত দেরি দেখে আমি ভেবেছিলাম তোমরা আর আসবেই না।
টরন্টো বিমানবন্দর থেকে ঘণ্টাখানেক দূরে মুক্তা–সাইফুলের বাড়ি। সাইফুল এখনো ঢাকাতেই চাকরি করেন। মাঝেমধ্যে কানাডা যান। মুক্তা ম্যাজিক জানেন। টরন্টোর পাশের শহর পিকারিংয়ে বাড়ি কিনেছেন। ছেলেকে ভর্তি করিয়েছেন নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে। গত সেপ্টেম্বরেই সে, সাফওয়ান, প্রথম ডর্মে যাচ্ছে। মা চোখ মোছেন আর ছেলের জন্য খাবার নিয়ে ডর্মে যান। মেয়ে রাহিনা স্কুলে যায়, স্কুলের সে লিডার হয়ে গেছে, সকালবেলা স্কুলের মাইক্রোফোনে ঘোষণা পাঠ করে। কী বলবে, তার নিজেকেই আগের রাতে লিখে নিয়ে যেতে হয়!
মুক্তার বাড়ি বড়; নিচতলায় লিভিং রুম, ডাইনিং, কিচেন; পেছনে লাউ-কুমড়ার বাগান, আঙিনা; দোতলায় গোটা চারেক শোবার ঘর। বেসমেন্ট ভাড়া দিয়ে ওদের মর্টগেজের টাকা উঠে যায়। আমরা দোতলার একটা ঘর দখল করি।

নিউইয়র্ক থেকে উড়াল দিয়ে আমাদের মেয়ে পদ্য চলে আসে। পদ্য কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে মাস্টার্স পড়ছে। আমি বলেছিলাম, চাকরিবাকরি পাওয়া যায়, এমন কোনো সাবজেক্ট নাও; মেয়ে জবাব দিয়েছে, তুমি তোমার মা–বাবার কথা শোনোনি, আমিও আমার মা–বাবার কথা শুনব না। ক্রিয়েটিভ রাইটিংই পড়ব। আচ্ছা বেশ।

কানাডার দ্বিতীয় দিনেই মুক্তা আমাদের নিয়ে চললেন নায়াগ্রা দেখাতে।
মুক্তা আমার দেখা ফাস্টেস্ট ড্রাইভার। সুযোগ পেলেই ১৩০ কিলোমিটারে স্পিড তোলে। আমি আল্লাহকে ডাকি। মুক্তা কাউকে ভয় পায় না। সাইফুলকে তো নয়ই। তবে তারও ভয়ের জিনিস আছে। মামু। মানে ট্রাফিক পুলিশ। দ্রুত গাড়ি চালানোর জন্য যাঁরা ফাইন করেন। মুক্তা একবার জরিমানা খেয়েছেন, শোধ করেননি, বলেছেন, মামলা লড়ব।
আমরা নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কাছে যাই। গাড়ি পার্ক করে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ভিডিও করি। অসীম সাহসী স্নেহা আর রাহিনা রোপওয়েতে চড়ে।

default-image

নায়াগ্রা আমার গোটা তিনবার দেখা। আমেরিকার দিক থেকে, কানাডার দিক থেকেও। নিচে নদীতে নেমে জাহাজে চড়ে রেইনকোট পরে এই বিশাল অকল্পনীয় জলপ্রপাতের কাছে গিয়ে বৃষ্টিভেজা হয়েও এসেছি আগে। কাজেই নায়াগ্রা দেখার চেয়ে দুপুরে একটা ভালো রেস্তোরাঁয় বসে দুপুরের খাওয়া সারার দিকে আমার বেশি নজর। আমার বিশাল বপু, এটা তো মিশুক নয় যে অল্প জ্বালানিতে চলবে।
স্নেহাকে ওয়াটারলুতে রেখে মেরিনার মেজ বোনের ওখানে, আলবার্টার এডমেন্টনে‍ কয়েক দিন কাটিয়ে আমরা আবার সাইফুলের বাড়ি ফিরেছি। আলবার্টা আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। আমরা সমতলের মানুষ, পাহাড় দেখলে মোহিত হবই। আব্রাহাম লেকের পানির এক অদ্ভুত নীল রং আমাকে এখনো মুগ্ধ করে রেখেছে।

টরন্টোতে ফিরে সবাই যা করে, আমরা তা–ই করলাম। টরন্টোর সেন্ট্রাল আইল্যান্ড যাব বলে ঠিক করলাম। টরন্টোতে আছেন প্রথম আলোর সাবেক সহকর্মী ইকবাল হোসাইন চৌধুরী আর রুহিনা তাসকিন। তাঁরাও এসে যোগ দিলেন। আমরা ফেরির টিকিট কেটে, মুক্তার গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে, অন্টারিও লেকে দ্রুতগতির ফেরিতে ছুটে চললাম আইল্যান্ডের দিকে। ১৫ মিনিটের মতো লাগে। কানাডা লেকের দেশ। অন্টারিও লেক অনেক বড়। যেখানেই যাই, এই এক অন্টারিও লেক আমাদের পিছু ছাড়ে না।

default-image

দুপুরবেলা সবুজ দ্বীপটায় ঘুরলাম। হাঁটলাম। বসে থাকলাম। দুপুরের খাবার খেলাম। এরপর সূর্য যখন ডুবু ডুবু, আবার জলযানে উঠে ফিরে এলাম এই পারে।
এখানে আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দেবে সাইফুলের ছেলে সাফওয়ান। এই এলাকাটা ইকবাল আর রুহিনা তাসকিনের মুখস্থ। ইকবাল এখানে ইউনিভার্সিটিতে ফিল্ম মেকিং পড়ে, সিনেমাওয়ালাদের মূলধারার সঙ্গে যোগ দিয়ে কাজ করে। রাতের টরন্টোতে রেস্তোরাঁয় বসে আমাদের ডিনারটা বেশ হলো। প্রথম আলো টরন্টো রিইউনিয়নটা ভালোই জমল। রেস্তোরাঁটা ছিল আরবীয়। শর্মাজাতীয় খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো।
এবার মুক্তা আর সাইফুল গাড়ি নিয়ে গেলেন ছেলেকে স্টেশন থেকে আনতে। আমার ভীষণ কফির তেষ্টা পেল। রুহিনা বললেন, আমি আর রাহিনা গিয়ে কফি আনি।
যাও।
আমি, ইকবাল আর মেরিনা রেস্টুরেন্টে বসে আছি। এরপর মিনিট যায়, ঘণ্টা যায়, রুহিনা আর ফেরেন না। ইকবাল ঘামছেন আর আমাকে আশ্বাস দিচ্ছেন, রুহিনা তাসকিন এই এলাকার প্রতিটি ইট চেনে। ও হারাবে না।
সাফওয়ানকে নিয়ে সাইফুল আর মুক্তা ফিরে এলেন। রাহিনাকে নিয়ে রুহিনা আর ফিরছেন না। ৮টা থেকে ৯টা বাজল। ৯টা থেকে ১০টা।

মুক্তা গাড়ি নিয়ে চক্কর দিচ্ছে মেয়ের খোঁজে। ইকবাল বউ হারিয়ে কাঁদা উচিত কি না, বুঝতে পারছে না। আমি আর ইকবাল রাস্তার দুই দিকে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজতে লাগলাম।
সাইফুলের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।

ফুটপাতে একদল বাউণ্ডুলে মার্কা তরুণ মাতালের মতো হাঁটছে। বোধ হয় এখনই কোনো বার থেকে বের হলো। ভয়ে আমার বুক কাঁপতে লাগল। ইকবাল অভয় দিয়ে বলে, এটা সেফ সিটি, কোনো ভয় নেই।

ঘণ্টা আড়াইয়েক পরে রুহিনা আর রাহিনা আমার জন্য কফি কিনে ফিরল। তাদের মোবাইলের চার্জ চলে গিয়েছিল এবং টরন্টোর পথঘাট বিশেষজ্ঞ রুহিনা গুগলম্যাপ বিহনে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পরের দিন আমরা গেলাম ব্লু মাউন্টেন। রুহিনা-ইকবালও সঙ্গী হলেন। মুক্তাদের বাড়ি থেকে সোয়া দুই ঘণ্টার ড্রাইভ। মুক্তা গাড়ি চালালে সেটা পৌনে দুই ঘণ্টায় নেমে আসবেই। হেমন্তের সবুজ পাহাড়ের গায়ে ইউরোপীয় স্থাপত্যের ভবন। হাঁটার পথ। নেমেই মনটা ভালো হয়ে গেল। প্রথমেই তো একটা কিছু খেতে হবে। কানাডার বিশেষ খাবার হলো পুটিন। ফ্রেঞ্চফ্রাই আর পনির। কাগজের ঠোঙায় পুটিন নিয়ে আমরা চললাম পাহাড়ের দিকে। রাইড আছে। রোপওয়ের কারে চড়ে পাহাড়ে ওঠাবে। এরপর সেই কার গড়িয়ে পড়বে আঁকাবাঁকাভাবে, রোলার কোস্টারের মতো। ‘উঠব না’ ‘উঠব না’ বলে আমরা ঠিকই উঠলাম। ততটা ভয়ের ছিল না। যদিও মেরিনার আর্তনাদ জঙ্গল আর পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে আমার কানে এসে পৌঁছেছিল।
নিচে নেমে আবারও আমার প্রিয়তম কাজটা করতে গেলাম। রেস্টুরেন্টে বসে খেতে হবে। নিয়ম হলো, ডাবল ভ্যাকসিনের সার্টিফিকেট ছাড়া রেস্টুরেন্টে বসা যাবে না। আমরা একটা খোলা রেস্টুরেন্টেই বসলাম। তাতে দৃশ্যটাও দেখা হলো ভালো। খাওয়াটা জমল আরও ভালো।
দ্রুত ফিরতে হবে। টরন্টো শহরে ভ্যান গঘের ভার্চ্যুয়াল প্রদর্শনী হচ্ছে। জনপ্রতি এক শ বা দেড় শ ডলারের টিকিট কাটা আছে। টরন্টো ডাউন টাউনে কেন্দ্রীয় শিল্পসংস্কৃতি এলাকার গ্যালারিতে ঢুকে পড়লাম আমরা। ইকবাল আর রুহিনা বিদায় নিলেন।
বড় হল রুম। মাঝখানে আমরা কয়েকজন দর্শক বসে আছি। চারদিকের দেয়ালে ভ্যান গঘের চিত্রকর্মগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে। তারারা নড়ছে। স্টারি নাইট। সূর্যমুখী ফুল। কৃষকের ঘর। নারী। ভ্যান গঘের টুপি। যন্ত্রসংগীত চলছে। আমরা ডুবে যাচ্ছি। শিল্পের অবগাহন। ভ্যান গঘ আমার আর মেরিনা, দুজনেরই প্রিয়। সাইফুল নিজে শিল্পসংগ্রাহক।
ভ্যান গঘ কি সত্যি তাঁর কান প্রেমিকাকে কেটে দিয়েছিলেন? আমার কবিতা আছে:
ভ্যান গঘেরর কানের পাশে আমি রাখি আমার মাথাটা
ভাবছি তা পার্শেলে পাঠাব তোমার নিকট
পোস্টম্যান পৌঁছে দেবে ঠিক
মাথা খাও ফেরত দেবে না।

ভ্যান গঘ লিখেছিলেন,
‘যারা বেশি ভালোবাসে, বেশি কাজ করে এবং বেশি অর্জন করে, এবং যা করে তা ভালোবেসে করে, তাই তা ভালোভাবে সম্পন্ন হয়...ভালোবাসা হলো মানুষের হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ এবং মহত্তম জিনিস।’

আমরা ভ্যান গঘের ভালোবাসাময় কাজগুলোয় স্নাত হয়ে বেরিয়ে ভ্যান গঘের চিত্রকর্মের মাস্ক কিনতে লাগলাম।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন