তরুণরাই প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি

গ্রামীণফোন ও ইউএনডিপি বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী মাস্টারক্লাসের আয়োজন করেছে। এখানে অংশ নিয়েছেন গ্রামীণফোনের ইনহাউজ স্কিল একাডেমী 'গ্রামীনফোন এক্সপ্লোরের' ৬০ জন তরুণ। ‘গেট ফিউচার রেডি’র মাস্টারক্লাসের বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপির রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সুদীপ্ত মুখার্জি। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ফারহানা হোসেন।

ইউএনডিপির রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সুদীপ্ত মুখার্জি

সুদীপ্ত মুখার্জি জানান, তিনি তরুণদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ ছাড়েন না। কেননা, এটা তাঁকে খুশি রাখে। সুদীপ্ত মুখার্জি তাঁর প্রেজেন্টেশনকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগে আলোচনা করেছেন অন্তর্ভুক্তিকরণ, বৈচিত্র্যের সাধারণ ধারণা নিয়ে। এরপর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কেস নিয়ে আলাপ করেছেন। কোন প্রতিষ্ঠানে কোন বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রয়োজন, সেই বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। কারা তরুণ? সেই বিষয়ও উঠে এসেছে তাঁর উপস্থাপনায়। ২০৩০ সালের ভেতর টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় সচেষ্ট হবে বলে বিশ্বের ১৯৩টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। সেই বিষয়ও ছিল আলোচনায়।

যেকোনো প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বড় বৈষম্য লৈঙ্গিক। তবে এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে এগিয়ে । ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নারী নেতৃত্বের প্রধানমন্ত্রিত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে বাইরে আবার এর প্রতিচ্ছবি কম। মন্ত্রিপরিষদে মাত্র ৮ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। আর পার্লামেন্টে ২০ শতাংশ। অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও মাত্র ৩৮ শতাংশ নারীর বিপরীতে রয়েছেন ৬২ শতাংশ পুরুষ। এর একটা বড় অংশ এসেছে পোশাকশিল্প খাত থেকে।

নানা ধরনের বৈষম্য

লিঙ্গ ছাড়াও বৈচিত্র্যের বিভিন্ন খাতের ভেতর রয়েছে বর্ণ, ধর্ম, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন, জাতীয়তা, সামাজিক মর্যাদা, ভাষা, বয়স, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, রাজনৈতিক মতাদর্শ ইত্যাদি। নারী, গ্রাম্য নারী, গ্রাম্য আদিবাসী নারী, বিকলাঙ্গ গ্রাম্য আদিবাসী নারী...এমন যদি হয়, তাহলে সমাজের অন্য অংশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ প্রতিটি বৈচিত্র্যের ধাপে আরও বেশি করে চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। প্রতিটি প্রজন্মের মধ্যেও নানা ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। কর্মক্ষেত্রে সমতা বলতে সব মানুষ একই মানদণ্ডে সুযোগ–সুবিধার জন্য বিবেচিত হবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ম্যানেজমেন্টে এ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে বলে বোঝানো হয়। খুব সাধারণভাবে উদাহরণ দেওয়া যাক, ঢাকা শহরের একজন পুরুষের কথা ভাবুন। তার একটা গাড়ি আছে, তাঁকে সকালে পরিবারের জন্য রান্না করতে হয় না। তাঁর আসার পথে সিগন্যালে পড়তে হয় না।

অন্যদিকে একজন নারী যাঁর ব্যক্তিগত ট্রান্সপোর্ট নেই, তিনি শহরের এমন এলাকায় থাকেন, যেখান থেকে অফিসে আসার পথে তাঁকে নিয়মিত যানজটে পড়তে হয়। পাবলিক বাসে চড়ে আসতে হয়। আর বাসার সবার জন্য রান্না করে গুছিয়ে আসতে হয়। অথচ অফিস চায় দুজনে যেন একই সময়ে অফিসে প্রবেশ করে। এ ক্ষেত্রে অফিস থেকে সবাইকে বাস বা গাড়ির সার্ভিস দিয়ে কিছুটা বৈষম্য কমানো যায়। সবাইকে লাঞ্চ করানোর ব্যাপার থাকতে পারে। বেবি কেয়ার সেন্টার দিয়েও বৈষম্য কমানো সম্ভব। নামাজের জায়গা রাখা উচিত। যিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, তাঁর জন্য বিশেষ শৌচাগার প্রয়োজন। নারীর নিরাপত্তায় সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স রাখতেই হবে। নারী আর পুরুষের জন্য যদি সমানসংখ্যক শৌচাগার না থাকে, তার মানে হচ্ছে, ওই প্রতিষ্ঠান ধরেই নিয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানে নারী আর পুরুষের সংখ্যা সমান হবে না।

সমতা, বৈচিত্র্য আর অন্তর্ভুক্তিকরণ

সমান আর সমতার ভেতর ব্যাপক পার্থক্য আছে। সমানের ক্ষেত্রে সবাইকে একই রকম ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু সমতা বলে যে প্রত্যেকে কমবেশি আলাদা। আর প্রত্যেকেই তাঁদের সেই বৈচিত্র্যের সঙ্গে মানানসই সুযোগ আর আচরণ দাবি করেন। বৈচিত্র্য আর সমতা একটা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিকরণকে নিশ্চিত করে না। বৈচিত্র্য হলো সবাইকে পার্টিতে নিমন্ত্রণ করা। আর অন্তর্ভুক্তিকরণ হলো পার্টিতে উপস্থিত সবাইকে সব খাবার, নাচ–গানের সুযোগ দেওয়া। আর সমতা হলো সবাইকে পার্টির সব আয়োজনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেই অনুযায়ী সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর

অংশগ্রহণকারীরা

(অংশগ্রহণকারীদের কিছু প্রশ্নের উত্তরের আঙ্গিকে এই অংশ সাজানো হয়েছে)

করোনায় নারীর ওপর প্রভাব: করোনা ব্যাপকভাবে লিঙ্গবৈষম্য বাড়িয়েছে। সারা বিশ্বেই বাল্যবিবাহ, নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে। নারী শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সংখ্যাও অনেক বেশি। করোনায় পুরুষের চেয়ে নারীর চাকরি হারানোর হার বেড়েছে। এমনকি অনেক নারী স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন। তরুণেরাও চাকরি হারিয়েছেন।

পরিবারে অন্তর্ভুক্তিকরণ: সব ক্ষেত্রে কালচার সেনসিটিভ হওয়া জরুরি। একজন নারী, তিনি যে অসুবিধাগুলোর ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, তিনি নিশ্চত করবেন, অন্য কারও ক্ষেত্রে যেন এ রকম না হয়। তিনি তাঁর মেয়েকে সেসব স্বাধীনতা দেবেন, যেসব তিনি পাননি। প্রত্যেককে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করার কোনো বিকল্প নেই। আপনি যে পরিবর্তন চান, সেটা নিজে শুরু করুন।

শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হবে কীভাবে: ডিজিটাল বৈষম্য বাড়ছে। তার অন্যতম ভুক্তভোগী প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা। তাদের অনেকেরই ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট কানেকশন, স্পিড, প্রযুক্তিজ্ঞান নেই। সে জন্য অনেক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে। তৃতীয় লিঙ্গ, বৈষম্য দূরীকরণ—এসবের ক্ষেত্রে আইন, কার্যকরণ এগুলো সরকারি–বেসরকারি, ব্যক্তিগত উদ্যোগে করতে হবে। সামাজিক সহনশীলতা বাড়াতে হবে।

ওপেন ডোর ম্যানেজমেন্ট পলিসি: যে কেউ অফিসের যেকোনো প্রান্তে যে কারও কাছে গিয়ে তাঁর বক্তব্য, প্রতিবাদ বা সমস্যার কথা জানাতে পারেন, তেমন ব্যবস্থা রাখতে হবে। উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দরজা সবার জন্য খোলা রাখতে হবে। সবার কথা শুনতে হবে। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবার জন্য সমান সুযোগের দরজা খোলা রাখতে হবে।

সারমর্ম

* প্রতিষ্ঠানে সব লিঙ্গের, বয়সের, শ্রেণির, জাতির, বর্ণের, ধর্মের, রাজনৈতিক মতাদর্শের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
* অফিসে বেবি কেয়ার সেন্টার খুলতে হবে। নামাজের স্থান রাখতে হবে। সবার চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
* সবাইকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
* ওপেন ডোর ম্যানেজমেন্ট পলিসি থাকতে হবে।
* স্যানিটেশন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে।
* মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।