চোখজোড়ানো নান্দনিক নকশার এসব অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণে এগিয়ে আসছে র৵াংগস প্রপার্টিজ, শান্তা হোল্ডিংস, শেলটেক, আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক, ক্রিডেন্স, দ্য স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্সসহ দেশের প্রথম সারির কিছু আবাসন প্রতিষ্ঠান। শুধু তা–ই নয়, পর্যাপ্ত আলো–বাতাসের ব্যবস্থা করে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো ও পানির অপচয় রোধ করার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানগুলোর এই চেষ্টা দেশের আবাসন খাতে নতুন ধারা তৈরি করছে।

কয়েকটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা জানালেন, ক্রেতাদের মধ্যে চাহিদা থাকায় অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে সবুজকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন নতুন পরিবেশবান্ধব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ভবনের নকশার সময় থেকেই পরিকল্পনাটি করা হয়। শোবার ঘরসহ অন্যান্য কক্ষে পর্যাপ্ত আলো–বাতাস চলাচলে ৪০–৬০ শতাংশ জায়গা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। জমিতে আগে থেকেই কোনো গাছ থাকলে সেটি রেখেই নকশা করা হচ্ছে। আবার ভবনে কোথায় কোন গাছ লাগানো হবে, সেটি নিয়ে রীতিমতো গবেষণাও হচ্ছে। তাতে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদের কথা চিন্তা করলে এসব প্রকল্প লাভজনক। কারণ, রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় কম। বিদ্যুৎ ও পানির খরচ তুলনামূলক কম। পরিবেশের জন্যও ভালো।

default-image

সবুজ ফ্ল্যাটের গল্প

গুলশানে ৯ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্ক দীর্ঘদিন বেদখল ছিল। ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র আনিসুল হক পার্কটি দখলমুক্ত করে সংস্কারের উদ্যোগ নেন। সংস্কারকাজ শেষে বছর দুই আগে পার্কটি খুলে দেওয়া হয়। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১ হাজার ৭০০টি গাছ রয়েছে।

পার্কটির গাঘেঁষা ৩৫ কাঠা জমির একটি প্লটেই অরা নামে অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প করছে শান্তা হোল্ডিংস। নান্দনিক নকশায় নিচতলাসহ ১৪ তলা ভবনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৪৫। একেকটির আকার ৩ হাজার ৩৫০ বর্গফুট থেকে ৭ হাজার ১০০ বর্গফুট। ভবনের নিচে ভূগর্ভস্থ দুটি তলায় রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।

অরাতে ঢুকতেই খোলামেলা পরিবেশ স্বাগত জানাবে। দোতলা সমান উচ্চতার নিচতলায় থাকবে অভ্যর্থনা কেন্দ্র। অতিথিদের বসার জায়গার পাশাপাশি থাকবে অনেক খোলা জায়গা। আবার ভবনের চারপাশে সবুজ ঘাসের মধ্যে থাকবে হাঁটার ব্যবস্থা। বেশ কিছু গাছও রয়েছে সীমানা ঘেঁষে। ভবন আর সীমানাদেয়ালের মাঝে ছোট মাঠে বাচ্চারা খেলাধুলা করতে পারবে অনায়াসে। ফলে ভবনের বাসিন্দারা বাড়ির চার দেয়ালের মাঝেই একটু দম ফেলার ফুরসত পাবেন।

ভবনের নকশাটি এমনভাবে করা হয়েছে যে বারান্দায় বসলেই চোখে পড়বে পার্কের গাছগাছালি। পাখির কিচিরমিচির আর পার্কের পুকুর প্রত্যেককে প্রশান্তি দেবে। পার্কের কারণে সামনে অনেক খোলা জায়গা। চাইলেই আকাশের বিশালতা কিংবা মেঘেদের খেলাধুলায় ডুব দেওয়ার সুযোগ পাবেন বাসিন্দারা।

ভবনের ওপর তলায় খোলা আকাশের নিচে সাঁতার কাটার জন্য থাকবে অত্যাধুনিক সুইমিংপুল। পাশেই আয়েশ করে গায়ে রোদ মাখার ব্যবস্থাও থাকছে। সাঁতার কেটেই ঘরে ছুটতে হবে না, সুইমিংপুলের পাশেই থাকবে গোসলের জায়গা। এ ছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যায়ামাগার ও পার্টিরুম থাকছে অরায়। একেবারে ওপরের তলার পার্টিরুমে অনায়াসে বাচ্চার জন্মদিন, বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনীর মতো অনুষ্ঠান সেরে নেওয়া যাবে।

জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড কো–অর্ডিনেশন) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই সবুজকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প করছি। সে জন্য জমির প্রায় ৫০ শতাংশ খোলা জায়গা রাখছি। তার মধ্যে ৫ শতাংশে সবুজায়ন করা হয়। প্রতিটি তলায় গাছ থাকে। ছাদেও বাগান করা হয়। ঘরে পর্যাপ্ত আলো–বাতাস নিশ্চিত করতে সেভাবেই নকশা করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কমাতে ভবনের বাইরে ফেয়ারফেস কংক্রিটের দেয়াল দেওয়া হয়।’

ফ্ল্যাট কেনার সময় গ্রাহকেরা আগে শয়নকক্ষ কত বড়, সেটি দেখতেন। আর বর্তমানে তাঁরা ভবনে গাছগাছালি আর খোলামেলা পরিবেশ ইত্যাদিকে প্রাধান্য দেন উল্লেখ করে রফিকুল ইসলাম বলেন, ভবনে সবুজ থাকার কারণে বাসিন্দাদের বসবাস আগের তুলনায় বেশ আরামদায়ক হয়। বাচ্চারাও একটা চমৎকার পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ পায়।

ধানমন্ডি লেকের পাশে লেক প্যানোরমা নামে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ করেছে ক্রিডেন্স হাউজিং। দু–এক মাসের মধ্যে বাসিন্দাদের ফ্ল্যাটটি বুঝিয়ে দেবে প্রতিষ্ঠানটি। ১০ তলা এই ভবনের প্রতিটি তলায় একটি করে ফ্ল্যাট। আয়তন ২ হাজার ৩১৫ বর্গফুট। ভবনের সামনের অংশে একটি ব্যালকনির সঙ্গে বাগানের জায়গা করা হয়েছে। সেই বাগান থেকে কার্টেইন কিপারের মতো গাছ নেমে আসবে। ফ্ল্যাটের প্রতিটি কক্ষেই পর্যাপ্ত আলো–বাতাসের ব্যবস্থা রয়েছে। দুটি শয়নকক্ষ, ড্রয়িংরুম ও খাবারের কক্ষের সঙ্গে থাকছে ব্যালকনি।

লেক প্যানোরমার ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে সামনে তাকালেই চোখে পড়বে ধানমন্ডি লেকের জল আর সারি সারি গাছ। সকালে কিংবা বিকেলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে বারান্দায় বসে প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডাটা বেশ জমবে। আর চাইলেই উপভোগ করা যাবে নীল আকাশে মেঘের ওড়াউড়ি। বর্ষার দিনগুলোর কথা আর নাই–বা বললাম।

লিফটে চড়ে ভবনের একেবারে ছাদ পর্যন্ত যাওয়া যাবে। ছাদেও বাগান হবে। থাকবে বসার ব্যবস্থা। বাসিন্দারা রাতে যেন বারবিকিউ করতে পারেন, সে জন্য আলাদা জায়গা করা হয়েছে। এ ছাড়া ভবনের বাসিন্দাদের বৈঠক করার জন্য আলাদা একটি কক্ষ থাকছে। পাশেই প্রক্ষালন কক্ষ রাখা হয়েছে। হঠাৎ অবাক হয়ে দুই চোখ আটকে গেল, ভবনের ছাদের লেকের দিকে একটি বড় গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই গাছের নিচে বসার ব্যবস্থা আছে। সেখানে বসে পূর্ণিমা রাতে আড্ডা জমাতে পারবেন বাসিন্দারা। কিংবা বিকেলে একটু গাছের ছায়ায় বসে দম নেওয়ার ফুরসত পাওয়া যাবে, সেটি আবার নিজের ফ্ল্যাটে ছাদেই...।

জানতে চাইলে ক্রিডেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জিল্লুল করিম বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই প্রকৃতিকে ভালোবাসে। বাসার নিচে, ছাদে ও বারান্দায় সবুজ থাকলে শহরের যান্ত্রিকতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়ার ফুরসত মেলে। আর সেই সবুজে যদি ফুল ফোটে কিংবা পাখিরা এসে বসে, তাহলে তো ছোট–বড় সবারই মন ছুঁয়ে যায়। সে জন্যই আমরা প্রতিটি প্রকল্পই সবুজকে প্রাধান্য দিয়ে করার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, সবুজকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি আমরা বর্তমানে অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে খোলামেলা পরিবেশ নিশ্চিত করছি। যাতে কক্ষগুলোতে দিনের বেশির ভাগ সময় পর্যাপ্ত আলো–বাতাস পাওয়া যায়। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) কম ব্যবহার করতে হয়। দিনে বৈদ্যুতিক বাতিও কম লাগে।

কয়েক বছর ধরে সবুজ অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে র৵াংগস প্রপার্টিজ। বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে সবুজকে নানাভাবে ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাদের র৵াংকিন পিনগল প্রকল্পে থাকছে ‘মিয়াওয়াকি ফরেস্ট’। প্রকল্পটির বিস্তারিত জানার আগে মিয়াওয়াকি ফরেস্টের বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক। জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকি আশির দশকে শহুরে বাসাবাড়িতে সবুজায়নের একটি নতুন ধারণা দেন। ইট–পাথরের শহরে সবুজের বড় অভাব। এ জন্য আকিরা মিয়াওয়াকি চিন্তা করলেন, বাড়ির ছাদ, বড় বারান্দা কিংবা লবির অব্যবহৃত জায়গায় বিভিন্ন ধরনের গুল্ম গাছ লাগিয়ে বনের পরিবেশ সৃষ্টি করা যাক। এতে বাড়ির তাপমাত্রা যেমন কমবে, তেমনি আবার প্রাকৃতিক পরিবেশও পাওয়া যাবে। সারা বিশ্বে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

র৵াংগস পিনগল প্রকল্পে ১২ তলা ভবনের ছাদে ২ থেকে ৩ মিটার জায়গায় তৈরি করা হবে একাধিক মিয়াওয়াকি বন। এই ছোট জায়গায় থাকবে দেশি গাছগাছালির সমাহার। নিচতলার লবির আশপাশেও এমন ‘বন’ বানানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পুরো ভবনে থাকবে সবুজের সমারোহ।

৩০ কাঠা জমির ওপর র৵াংগস পিনগল প্রকল্পের মোট তিনটি আলাদা আলাদা ভবন থাকছে। প্রতি ভবনের প্রতি ফ্লোরে থাকবে দুটি করে ফ্ল্যাট। ভবনগুলোর চারপাশ খোলামেলা থাকবে। থাকবে বাহারি গাছগাছালির সমাহার। প্রতিটি ভবনের পশ্চিম পাশের পুরো দেয়ালে ফার্ন-গুল্মজাতীয় গাছ লাগানো হবে। এ ধরনের গাছ কীটপতঙ্গ ধ্বংস করে। এতে মশা-পোকামাকড়ের উপদ্রব থাকবে না। এ ছাড়া নিচতলা ও দোতলার লবি, কমিউনিটি স্পেসের বিভিন্ন কোনায় গাছপালা লাগানো হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের বাইরের ট্যারেস ও কার্নিশ থেকে ঝুলবে লতাজাতীয় গাছ। মোটকথা, ভবনজুড়েই থাকবে খণ্ড খণ্ড সবুজের সমারোহ।

অন্যান্য সুযোগ–সুবিধাও কম থাকবে না। নিচতলা ও দোতলা হবে অনেকটা পাঁচ তারকা হোটেলের লবির মতো। সেখানে অতিথি বসার ব্যবস্থা থাকবে। কফি শপ, জিম, টেনিস কোর্ট, সুইমিংপুল—সবই থাকবে। চাইলে ছোটখাটো অনুষ্ঠানও করা যাবে। মাটির তলার বেসমেন্টে থাকবে গাড়ি পার্কিং এলাকা। ফ্ল্যাটের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বারান্দার মতো কিছু থাকবে না। বদলে প্রতিটি ফ্ল্যাটে থাকবে ট্যারেস বা উঠান। এতে পরিবারের সদস্যরা চাইলে একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতে পারবেন। কক্ষগুলোতেও থাকবে বৈচিত্র্য।

জানতে চাইলে র‌্যাংগস প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশিদ রহমান বলেন, ‘ঢাকায় একসময় প্রচুর সবুজ ছিল। নানা কারণে সেই সবুজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। সবুজকে আবার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে তিন–চার বছর আগে থেকে সচেতনভাবে পরিবেশবান্ধব অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিই আমরা। কারণ, সবুজ আমাদের জীবনের অংশ। সবুজের মধ্যে বসবাস করলে মানুষের মন কোমল হয়।’

মাশিদ রহমান আরও বলেন, ‘সবুজ অ্যাপার্টমেন্ট করার জন্য বিদেশ থেকে স্থপতি নিয়ে আসছি আমরা। প্রচুর গাছপালা থাকার কারণে ভবনে বাইরের চেয়ে ভেতরের তাপমাত্রা ১–২ ডিগ্রি কম রাখা যায়। কোথায় কোন গাছ লাগালে সুবিধা মিলবে, সেটি নিয়েও গবেষণা করছি। যেমন আমরা ভবনে একধরনের বিশেষ গাছ লাগিয়েছি, যাতে ফ্ল্যাটের ভেতর মশার উপদ্রব কমেছে।

জমি ১০ কাঠার বেশি হলে এমন প্রকল্প করা যায়

আলমগীর শামসুল আলামিন, সভাপতি, রিহ্যাব

বড় কোম্পানিগুলো উন্নত দেশের মতো পরিবেশ রক্ষা করে আধুনিক আবাসন প্রকল্প করার চেষ্টা করছে। নতুন এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। জমির আকার যখন ১০ কাঠা বা তার বেশি হয়, তখন এমন প্রকল্প সহজে করা যায়। তবে ঢাকার অধিকাংশ জমিই আড়াই, তিন বা পাঁচ কাঠা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পেও অধিকাংশ প্লটের আকার তিন ও পাঁচ কাঠা। তাই সরকার যদি পরিকল্পনা করে বড় আকারের জমি আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারে, তাহলে পরিবেশবান্ধব আবাসন প্রকল্প আরও ব্যাপক হারে হবে। এটি হলে ঢাকা আবার বসবাসের জন্য মানবিক হয়ে উঠবে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন