বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

টাকা চাওয়ার তিন দিন পর মা আমার হাতে তুলে দিলেন তাঁর সোনার নোলক, বিয়ের সময় পাওয়া। বললেন, ‘এটা বিক্রি করে বই কিনিস।’

গেলাম গয়নার দোকানে। দোকানদার বললেন, ‘নোলকটাতে তেমন সোনা নেই, খাদ বেশি। তা ছাড়া কালচে হয়ে গেছে।’ অবশেষে বিক্রি করলাম ২৮০ টাকায়। সেই টাকায় আমি বই কিনেছি।

তখন বুঝতে পারিনি কী বিক্রি করে দিলাম। পরে আবার ফিরে গিয়েছিলাম সেই দোকানে। দোকানদার বলেছিলেন, নোলক গলিয়ে অন্য গয়নায় যুক্ত করে ফেলেছেন, ফেরত পাওয়ার আর উপায় নেই। এরপর কত নির্ঘুম রাত যে কেটেছে সেই নোলকের কথা ভেবে।

এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছি, বৃত্তি পেয়েছি। টুকটাক সব কাজ বাদ দিয়ে মন দিয়েছিলাম পড়ালেখায়। কিন্তু তাতে পরিবারের আয় কমে গেল, সংসারে অভাব গেল বেড়ে। একদিন পড়তে পড়তে শুনলাম, বাংলাবান্ধা দিয়ে ভারত থেকে যে পাথর আসে, সেখানে আমার মা যাবে পাথরশ্রমিকের কাজে। যে মা আমার গাড়িতে চড়তে পারে না, অসুস্থ হয়ে যায়; সে কিনা এতটা পথ পাড়ি দিয়ে যাবে শ্রমিকের কাজ করতে! ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল।

তবু আমাকে পড়ালেখা করাতে মা তাঁর শীর্ণ দেহটাকে টেনে নিয়ে গেছে কাজে। বুকে-পেটে জ্বালাপোড়া হলে ক্লিনিকের দেওয়া ফ্রি অ্যান্টাসিড মুখে পুরে, লো প্রেশার নিয়েই পাথর ভেঙেছে, কাজ থামায়নি।

আমি বুঝতে পারি মা। পাথুরে ধুলায় তোমার শ্বাস নিতে বড় কষ্ট হয়েছে। কিন্তু তোমার ইচ্ছাশক্তির কাছে তো এসব কষ্ট তুচ্ছ। চৈত্র-বৈশাখের তপ্ত দুপুরেও তুমি আমার জন্য পাথর ভাঙার কাজ করেছ। তোমার রুগ্‌ণ হাঁটু যখন বিশ্রাম চেয়েছে, মাংসপেশি যখন ব্যথায় আর নড়তে চায়নি, তখনো ব্যথানাশক খেয়ে তুমি কাজ করে গেছ। বোড়াগাড়ীর শনিবারের হাট থেকে যে একটা পুরোনো শাড়ি কিনেছিলে, সেই শাড়িতে যে কতগুলো সেলাই পড়েছে, তা আমি ভালোই জানি মা।

আজ এই কৃষ্ণপক্ষের ঝিঁঝি ডাকা নিশুতি রাতের নামে শপথ করছি, তোমার ঘামের মূল্য আমি দেব। তোমার ছেঁড়া শাড়ি, তলা ক্ষয়ে যাওয়া মেহেরুন স্যান্ডেল, কালচে খাদওয়ালা নোলকের দাম আমি দেব। দেখে নিয়ো, তোমার ছেলে হারবে না।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন