করোনাকালের স্থবিরতা কাটিয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। গতি ফিরে পেয়েছে ১৭৫ একরের বিশাল প্রাঙ্গণ। গাছগুলোতে নতুন পাতা। বিশ্ববিদ্যালয়ও নতুন শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখর। ডায়ানা থেকে শুরু করে ঝাল চত্বর, বটতলা থেকে মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব, মফিজ লেক, মুক্ত বাংলা, পেয়ারাতলা, প্যারিস রোড—আড্ডায় মেতেছেন শিক্ষার্থীরা।

সেই আড্ডায় কান পেতে বোঝা গেল, বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে। কোনো কোনো বিভাগে নতুন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়ার আয়োজন চলছে। কোথাও আবার সিনিয়রদের বিদায় দিতে চলছে র‍্যাগ ডের প্রস্তুতি। ক্যাম্পাসের ক্লাব ঐক্যমঞ্চের উদ্যোগে চলছিল বইমেলা ও ক্লাব ফেস্ট। একাত্তরের চিঠি নিয়ে অভয়ারণ্যের আয়োজন কিংবা বটতলায় ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের যুদ্ধবিরোধী পোস্টার ও চিত্র প্রদর্শনী, ঘুরে ঘুরে চোখে পড়ল সবই।

খেলাধুলার ঐতিহ্য

খেলাধুলায় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সুনাম আছে বেশ। আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ভলিবলে নয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইবি। অ্যাথলেটিকেও আছে নানা অর্জন। দেশে-বিদেশে শিক্ষার্থীরা পুরস্কার পেয়েছেন বহুবার। আইন ও মুসলিম বিধান বিভাগের ছাত্রী ফাহিমা খাতুন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়। ২০২২ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় ফুটবল সিরিজে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মেহেদী হাসান। এ ছাড়া আন্তবিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন সক্রিয় আছেন বেশ কজন শিক্ষার্থী।

গবেষণায় সাফল্য

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগের মধ্যে অন্তত ৩০টি বিভাগে এখন গবেষণার কাজ চলছে। বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোতে গবেষণার হার অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি। জীববিজ্ঞান অনুষদের জৈবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল বিভাগে চলছে যুগোপযোগী বেশ কিছু গবেষণা। এই বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে জৈবসার, সল্ট টলারেন্স, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, আর্সেনিকের ওপর গবেষণা করে সফলতা পেয়েছেন। চলমান আরও গবেষণা প্রকল্পের সফলতার বিষয়েও আশাবাদী বিভাগের শিক্ষকেরা।

জৈবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামালের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকর্ম অনেক বেড়েছে। শিক্ষকদের আন্তরিকতায় শিক্ষার্থীরা এখন গবেষণায় আরও আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

ক্যাম্পাসে সক্রিয় ৪০ ক্লাব

করোনার দীর্ঘ বন্ধের পর ক্যাম্পাসের ক্লাবগুলো পুরোদমে সরব হয়েছে আবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ৪০টির বেশি সংগঠন কাজ করছে। তারুণ্য, ক্যাপ, ঐক্যমঞ্চ, বুনন, রক্তিমা, ডিবেটিং সোসাইটি, আবৃত্তি আবৃত্তি, কনজ্যুমার ইয়ুথ বাংলাদেশ, ইবি চলচ্চিত্র সংসদ, সাহিত্য সংসদ, অভয়ারণ্য, ইয়াস বাংলাদেশ, লণ্ঠন, তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, আইটি সোসাইটিসহ অনেক সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি আয়োজিত হলো ক্লাবফেস্ট। সেখানে নিজেদের কার্যক্রম তুলে ধরে ২৩টি সংগঠন। ক্যাপ নামের সংগঠনটি বেশ কয়েক বছর ধরে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক করে আসছে। সেবামূলক কাজে সক্রিয় আছে তারুণ্য, বুননসহ আরও কয়েকটি সংগঠন। পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কয়েকটি সংগঠন।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে

ইবিতে লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষার্থীরা অনেকেই বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে লেখাপড়া শেষ করে লন্ডনে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন ইবির প্রাক্তন ছাত্র মোহাম্মদ আলী। এখন তিনি অস্ট্রেলিয়ার একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

অনেকে বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও চীনে গেছেন। প্রতিবছরই বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসনের নানা পদে চাকরি পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আগের তুলনায় অনেকটা এগিয়েছে। পড়াশোনা, খেলাধুলা ও গবেষণায় আমরা আরও জোর দিচ্ছি।’ শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে শিক্ষকেরা নিয়মিতই সভা করেন বলে জানান তিনি।