ছোটবেলায় যখন স্কুলের নতুন বই পেতাম, খুব যত্ন করে সেগুলোতে মলাট লাগিয়ে সেলাই করে দিতেন আপনি। আমি নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পেতে বইগুলো নাকের কাছে নিয়ে অনুভব করতাম আপনার আদরের ওম! পৃথিবীর সেরা, ‘আব্বা’ নামের ব্র্যান্ডের ঘ্রাণে মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রাখতাম নিজেকে।

যখন বাজার থেকে ফিরতেন, চকলেট এনে আমার হাতে দিয়ে সবাইকে ভাগ করে দিতে বলতেন। তখন এতসব বুঝতাম না। এখন বুঝি, আমাকে আপনি কীভাবে দায়িত্ব নেওয়া ও ভাগাভাগি করা শিখিয়েছিলেন। আপনার শেখানো সেই দায়িত্ববোধ আমার জীবনে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

আব্বা, আপনার সঙ্গে দারুণ এক মজার স্মৃতি আছে আমার। তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। আপনি আমাদের দুই বোনকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। চিড়িয়াখানায় বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। গাধার খাঁচার কাছে গিয়ে আপনি আমার নাম ধরে বললেন, একটা গাধা। হঠাৎ এমন কথায় আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা। পরে যখন বুঝলাম আমার সামনে একটা গাধা দাঁড়িয়ে—কী যে হেসেছিলাম সবাই।

আব্বা, আপনি ছিলেন উদার মনের আর শিক্ষানুরাগী একজন মানুষ। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, একজন মুক্তিযোদ্ধা আপনি। ১৯৭৬ সালে নিজেদের জায়গায় আমার দাদির নামে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ওই বিদ্যালয়ের পেছনে আপনি জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই। আমি অবাক হতাম, মানুষ যখন আপনাকে এসব কাজের জন্য ‘পাগল’ বলতেন। আমার নিজেরও মনে হতো, এতটা নিঃস্বার্থভাবে এমন কাজ কেউ করে নাকি! এখন আমি পেশার খাতিরে জেন্ডার সমতা বা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করি। প্রায়ই ভাবি, আজ থেকে প্রায় ৪৬ বছর আগে আপনি এই ভাবনাটি ভেবেছেন। কতটা আধুনিক ছিলেন আপনি। এমনকি স্কুলগামী ছাত্রীদের অভিভাবক হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে দেখেছি আপনাকে। আপনি সব সময় এলাকার বখাটে ছেলেদের শাসন করতেন, যেন মেয়েদের বিরক্ত করতে না পারে।

আব্বা, এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমার লেখাপড়া, ক্যারিয়ার সবকিছুতেই আপনি ভীষণ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আপনার ইচ্ছাতেই গ্রাম থেকে আমার ঢাকায় আসা। এমনকি আপনি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দিতে দেননি। তখন অনেক মন খারাপ হয়েছিল। এখন ভাবি, আপনার সেই দৃঢ় সিদ্ধান্ত আমার জীবন গোছাতে কতটা ভূমিকা রেখেছিল।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় আমার চাকরি করাটা আপনার পছন্দ ছিল না আব্বা। চেয়েছিলেন, আমি যেন সরকারি চাকরিজীবী হই। সেটা হতে পারিনি। তবে মায়ের কাছে শুনেছি, আপনি মানুষের কাছে গর্ব করে বলেন, ‘আমার বড় মেয়ে এখন অনেক ভালো চাকরি করে।’

আব্বা, জীবনের প্রয়োজনে নিজের পরিবার নিয়ে দূরে থাকি। এক-দুই বছর পর পর দেখা পাই আপনার। কত কথা যে বলি। শুধু কখনো বলা হয়নি, আব্বা আপনাকে কতটা মিস করি। সেই ভালোবাসার কথাগুলো মলাটবন্দী হয়েই আছে এখনো।

আব্বা, আপনি ভোজনরসিক। তাই বাসায় মজার কোনো খাবার রান্না করলে আপনার কথা খুব মনে পড়ে। ইচ্ছা করে আপনার পাতে তুলে দিই নিজের হাতের রান্না করা কোনো পদ। পাশে বসে দেখি, আপনি তৃপ্তির সঙ্গে খাচ্ছেন। কিন্তু সেটা সম্ভব হয় না।

আমাকে ছোটবেলায় আদর করে অন্য একটা নামে ডাকতেন। অনেক বছর ধরে আর ডাকেন না। জানি না, কোনো চাপা কষ্ট বা অভিমান মলাটবন্দী হয়ে আছে কিনা আপনার মনে।

আজ এই লেখার মাধ্যমে বলি, ‘আপনাকে ভালোবাসি আব্বা। অনেক ভালোবাসি।’

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন