মা, তুমি আমার দেখা সবচেয়ে বিস্ময়কর নারী। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। যে তুমি আগে কখনো ঢাকা শহর দেখোনি, বিদ্যুৎ–বাতি দেখোনি, সেই তুমি একা একা প্লেনে চড়ে হাজার মাইল দূরে, স্বামীর কাছে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলে! তুমি কি জানো যে তোমার তখনকার জীবন নিয়ে একটা সিনেমা হয়? কারণ, যে রাতে তোমার জন্মভূমিতে পাকিস্তানি আর্মি হামলা করে মানুষ মারছিল, ঠিক সেই রাতে ওই জালিমদের মাটিতেই তুমি জন্ম দিয়েছিলে তোমার প্রথম সন্তানকে!

তোমার স্বজনদের রক্তের ওপর দিয়ে দেশ যখন স্বাধীন হয়ে গেল, তখন তুমি স্বামী-সন্তান নিয়ে পাকিস্তানের জেলখানায়। ভয়াবহ সেই সময় ছিল দুই বছরের বেশি! ভয় পাওনি মা? আমার মনে হয় তোমার খুব একটা ভয় করেনি। আর এই জিনগত বৈশিষ্ট্য আমরা ভাইবোনেরাও পেয়েছি, তবে খুব বেশি না। তবে তোমার যে গুণ সবচেয়ে বেশি আমরাও পেয়েছি, তা হলো নতুন কিছু জানার প্রচণ্ড ইচ্ছা। তোমার মতো বই পড়ুয়া মানুষ খুব কম দেখেছি মা। হাজার মাইল দূরের দেশ সুইডেনে তোমার বাংলা বইয়ের যে বিশাল লাইব্রেরি তুমি বানিয়েছ, তা যে কাউকে চমৎকৃত করবে।

তোমার পরিশ্রম করার ক্ষমতাও আমাকে বিস্মিত করে মা। বছরের পড় বছর ধরে এত এত আত্মীয়স্বজনের যন্ত্রণা কীভাবে সহ্য করেছ, ভেবে অবাক হই। কত কত মানুষের পাশে থেকে তাঁদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছ, সেটা দেখলে নিজেকে বকা দিতে ইচ্ছা করে। তোমার সন্তান হয়েও কারও জন্য কিছু করতে পারিনি ভেবে। আজ চুয়াত্তর বছর বয়সে এসেও তুমি যেভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে চলো, অদ্ভুত কিন্তু! কীভাবে পারো মা? এত প্রাণশক্তি কোথা থেকে আসে তোমার?

তোমার প্রিয় প্রথম সন্তানকে হারিয়েও ভেঙে পড়োনি। হাজার ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে যখন সব গুছিয়ে স্থির হয়ে বসেছ, ঠিক তখন হারালে স্বামীকে। তারপরও তুমি দুর্বল হওনি। এখন যখন তোমাকে দেখি—একা একা বাজার করছ, হাসপাতালে যাচ্ছ, এমনকি একা একা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছ, তখন আসলেই খুব অবাক হই। মা তুমি কি ইংরেজি ও সুইডিশ ভাষা পুরোপুরি বুঝতে পারো? নইলে কী করে এসব করো?

শৈশবে তোমাকে যে কী বোকা ভাবতাম! ভাবতাম ফ্যাশন-ট্যাশন কিচ্ছু বোঝো না! মনে আছে, স্কুলে যাওয়ার সময় তুমি থুতনিতে ধরে রাজ্জাক আঙ্কেলের মতো এক পাশে সিঁথি করে চুল আঁচড়ে দিতে। বাইরে বেরিয়েই চুল এলোমেলো করে ফেলতাম। বন্ধুরা দেখার আগেই। ভাবতাম তুমি একটা ‘খ্যাত’। কিচ্ছুই জানো না। কিচ্ছুই বোঝো না। কিন্তু আজ আমার সেই বন্ধুদের অনেকেই বলে, তুমি নাকি সুপার স্মার্ট একজন।

তোমাকে কোন ভাষায় ধন্যবাদ দেওয়া যায়, সেটা আজও খুঁজে পাইনি। তা ছাড়া তোমাকে কোন কোন কারণে ধন্যবাদ দেব, সেটাও আলাদা করতে পারি না। আমার সবটাই তো তুমি। তোমার গর্ভে জন্ম নিয়েই আমি ধন্য। তবু মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে এবং প্রার্থনাও করি, যেন তোমার জিনের প্রভাবটা একটু বেশি পাই। ভালো থেকো মা। এমনি হাসিখুশি থেকো।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন