বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এমন সময় আমাদের এক সহযাত্রী বললেন, ‘গতবার সালমান বলে একটি ছেলে আমাদের নৌকা চালাতে চালাতে চমৎকার গান গেয়েছিল, বলেছিল পরেরবার এলে ওদের বাড়িতে গিয়ে মায়ের হাতের রান্না খেতে।’ আমাদের সঙ্গে প্রথম আলোর আলোকচিত্রী আনিস মাহমুদ আছেন। স্থানীয় ভাষায় পাশের নৌকার মাঝিকে আনিস বললেন, ‘সালমানকে চেনো নাকি?’ ছেলেটি লজ্জিত মুখে জানাল, সে–ই সালমান। সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠল কোমরে বাঁধা সালমানের মুঠোফোন। ‘জি স্যার?’ এ পাশ থেকে কথা বলছেন আমাদের সহযাত্রী, ‘তোমার ফোন নম্বর তো আমি সেফ করে রাখছিলাম, কিন্তু তোমার চেহারা পাল্টে গেছে।’ সালমানের সলজ্জ হাসি, ‘কাজ নাই কাম নাই, মনে হইছে স্যার, আপনারা দুইজন ছিলেন, ছবি আঁকেন, ওই পাশের ঘাট দিয়া ঢুকছিলাম।’

আমি সুযোগ নিলাম, ‘সালমান আজকে গান শুনাবে না?’

সালমান অনুমতির জন্য আনিসের দিকে তাকিয়ে বলে, গান গাইলে আওয়াজ হবে, পরিবেশ নষ্ট হবে। ভাই রাগ হবে।

আনিস জানাল অবিবেচক পর্যটকেরা উচ্চ স্বরে যন্ত্রের গান বাজিয়ে রাতারগুলের এই নিসর্গ সৌন্দর্য নষ্ট করে। তাই শব্দের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন। কিন্তু সালমান তো গাইবে খালি গলায়। তাই অনুমতি মিলল, ‘ছোট করি গাও।’

আশ্চর্য হলাম সালমানের এই পরিবেশের প্রতি মমতায়। আনুগত্যে। এবার বুঝলাম নৌকা চালাতে চালাতে কখনো কখনো গাছের গোড়ায়ৌ পানির খালি বোতল পেলে সালমান কেন নৌকায় তুলে নিয়েছে। আনিসদের এই পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনে সে–ও যে একজন স্বঘোষিত কর্মী!

নৌকা দুটিকে একটু পাশে ভিড়িয়ে সালমান গাইল শাহ আবদুল করিমের গান—‘আমার মাটিরও পিঞ্জিরায় সোনার ময়না…’। জলাবনে নোঙর করা নৌকা, ওপরে নীল আকাশ, পানির ফাঁকে ফাঁকে হিজল–করচ গাছের সারি, আমরা কয়েকটি প্রাণী ছাড়া রাতারগুলে তখন কোনো জনমানব নেই, সালমানের গলায় অসাধারণ গান আমাদের আবেগ আপ্লুত করে তুলল।

default-image

রাতারগুলে আমি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে সবে ভর্তি হওয়া আমার ছেলে এই প্রথমবার এসেছি। এত দিন আমার কাছে রাতারগুল মানেই প্রথম আলোর প্রথম পাতায় আনিস মাহমুদের সেই চোখে লেগে থাকা ছবি (২০১২ সালের পর্যটন দিবসে ছাপা হয়েছিল), যার পর থেকে সাধারণ পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ে রাতারগুল ভ্রমণে। তার আগে হয়তো অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণপিপাসু দু–চারজন ঘুরে গেছেন। যেমন রাকিব কিশোর ঘুরে গিয়ে লিখেছিলেন ‘নকশা’য়। আনিসের সঙ্গে এই জলাবনের যে কি নিবিড় যোগাযোগ, তা আরও স্পষ্ট বুঝলাম সেদিন। ফেরার পথে দেখি একদল তরুণ নৌকা নিয়ে ঘুরছে। তাদের মাঝি আঙুল তুলে আনিসকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই প্রথম আলো ভাই ছবি দিয়া এই জায়গা চিনাইছে।’ আনিসের সহকর্মী হিসেবে গর্ব হলো আমারও।

মাথার ওপর ঠা ঠা রোদ, কেউ কেউ নৌকায় ছাতা খুলে বসেছে, তবু মন চাইছে না ফিরে যাই। বর্ষায় রাতারগুল পূর্ণ রূপে প্রকাশ পায়। কতবার ভেবেছি এই বর্ষায় যাবই যাব, আসা হয়নি। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া…। তবু যে এলাম, যতটুকু পেলাম তাতেই খুশি।

এরই মধ্যে ঘাট থেকে ফোন এল সোনা মিয়ার। যার মাধ্যমে নৌকা ভাড়া করেছি। জানতে চাইল আমরা দুপুরে খাব কি না। তাহলে বাড়ি থেকে রান্না করিয়ে আনবে চালায়। অথবা তার বাড়িতে গিয়েও খেতে পারি। পাশের গ্রামটার নামই রাতারগুল, সেই নামেই এই জলাবন। আমার ছেলে সৃজন আগ্রহী হলো স্থানীয় হাতের রান্না খেতে। বলল, ‘ঝাল করে রান্না হলে খাব। চলো খাই।’ কিন্তু আমরা যাব সাদা পাথর দেখতে। সময়ের হিসাবে মিলবে না। এ যাত্রায় তাই সোনা মিয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো না। কিন্তু ভালো লাগল স্থানীয় পর্যটনের ‘গো লোকাল’ আয়োজনে—নৌকায় ঘোরো, মাঝির গান শোনো, মাটির চুলার রান্না খাও, স্থানীয় মানুষের সঙ্গ পাও।

ঘাটে পৌঁছাতে সালমানদের কষ্ট হলো আবার, যেমনটা শুরুতে হয়েছিল। জলাবনে ঢোকার মুখে এই মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় নৌকা কাদায় ঠেলে নিতে হয় অল্প সময়। বারবার সালমানদের কষ্টের কথা বলছিলাম। ওদের এক কথা, তবু মানুষ এলেই তারা খুশি, এটাই যে তাদের রুজি।

সোনা মিয়ার চালায় ফিরে গাছ–পাড়া ডাব আর চাম্পাকলা খেয়ে গরম উধাও। এবার লক্ষ্য সাদা পাথর। সিলেট শহর থেকে গাড়িতে রাতারগুল ঘাটে এসেছি আধা ঘণ্টায়। সহকর্মী আনিস আর মানাউবি সিংহ ছিল পথপ্রদর্শক। এবার আবার এক ঘণ্টার যাত্রা।

১০ নম্বর ঘাটে গিয়ে আনিস পরিচয় করিয়ে দিল আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। স্থানীয় সাংবাদিক। সাদা পাথর এখন পর্যটকদের নতুন আগ্রহের জায়গা। পিকনিক স্পট হিসেবেও জমে উঠেছে। আমরা নামলাম একটু নিরিবিলি জায়গায়। বেশ কজন তরুণ গলায় ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছেন। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে পাথর সামলে পানিতে নেমে ফটাফট ছবি তুলছেন পর্যটকদের। এই বেকার তরুণদের আলোকচিত্রী পেশায় যুক্ত করেছেন আনোয়ার হোসেন-আনিসরাই। একজন আলোকচিত্রী দৌড়ে এসে আনিসের কাছ থেকে গুরুর পরামর্শও নিয়ে গেল। ক্যামেরা বিকল হয়েছে। সারাবে কোথায়?

default-image

বিকেলের নরম রোদে আমরা ইঞ্জিন নৌকায় করে ধলাই নদের বুক চিরে সাদা পাথরে গিয়ে পৌঁছালাম। যেন পাথুরে বিছানার ওপর পানির স্বচ্ছ চাদর টানা। দূরে নীল পাহাড়। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মতো সারি সারি ছাতা আর কাঠের চেয়ার পাতা। ছেলে আমার এক দৌড়ে সাঁতার কাটতে নেমে গেল। কে থামায় তাকে? আমি হাঁটুব্যথা নিয়েও সতর্কভাবে একটা বড় পাথরের মোড়ায় বসে পা ডোবালাম শীতল জলে। এক আঁজলা শীতল পানি মুখে ঝাপটা দিতেই ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করে দিল! তবে এই পিচ্ছিল পাথরে পা পিছলে দুর্ঘটনাও ঘটেছে অনেক। অতএব সাবধান। ছেলেকেও খুব বেশি দূরে যেতে মানা করা হলো। খরস্রোতা পানির টান! পড়ন্ত বিকেলে ভিজে কাপড়ে ছেলের ঠান্ডা লাগবে ভেবে মায়ের দুশ্চিন্তা আশ্চর্যভাবে দূর করে দিল প্রকৃতি। খানিকটা হেঁটে নৌকায় উঠতে উঠতেই শুকিয়ে গেল কাপড়। তা ছাড়া সাদা পাথর লেখা টি–শার্ট বিক্রি হচ্ছে ঘাটেই। স্যুভেনিরও হলো, শুকনো কাপড় পরাও হলো। এই ঘাটে আছে খাবারের বেশ কয়েকটা হোটেল। হাঁসের মাংস, মুরগির মাংস থেকে ভর্তা–ভাজি–মাছ। নৌকায় ওঠার আগে আমরাও খেয়েছি। ভাড়া করা স্থানীয় গাড়ির চালক নুরুল ছিল সঙ্গে। ওর পরামর্শেই ঝটপট খিদে নিবারণ। তবে এটা ঠিক, রাতারগুলের সালমান বা সোনা মিয়ার বাড়ির রান্না খাওয়ার আফসোসটা থেকেই গেছে মনে। এমনকি পর্যটন মোটেলের বাবুর্চির কম তেলে রান্না করা মিক্সড ভেজিটেবল, গরুর ভুনা মাংস আর চিকেন কাটলেটের প্রশংসা করার পরও সেই আফসোস যায়নি।

আবার আসিব ফিরে। বর্ষার অজস্র জলধারায়। হিজল–করচের দেশে। রাতারগুলে সোনা মিয়ার চালা থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরব। পরিবেশ রক্ষায় আনিস মাহমুদের বনের মোষ তাড়ানোর গল্প শুনব। সালমানের গলায় শাহ আবদুল করিমের গান শুনে গলার কাছের দলা পাকানো কষ্ট গিলে ফেলব। মায়ের হাতের রান্না খাব…

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন