সংকটেই থাকল আফগানিস্তান

আফগানিস্তানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছিল, তা এখন আর নেই। প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই স্বপদে বহাল থেকে পূর্ণ মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে গেছেন। দেশের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের আগেই তাঁকে জয়ী বলে ঘোষণা করেছে! এ ব্যাপারে অবশ্য মূল ভূমিকাটা রাখলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ। কারজাইয়ের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের ওই ঘোষণা দেওয়ার এক দিন আগে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নাম প্রত্যাহার করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি নির্বাচন প্রতিহত করতে বা এর বিরোধিতার ব্যাপারে সমর্থকদের কোনো প্ররোচনা দেননি। বরং বলেন, ‘দেশের কল্যাণেই আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের প্রতিও তিনি সমর্থন জানান।’রাজনৈতিক বাধা টপকে হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্টের পদে বহাল থাকলেই যে আফগানিস্তানে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, এমনটি আশা করার কারণ নেই। বরং তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যমান সংকট থেকে দেশ কতটুকু উতরাতে পারবে, সেটাই বিবেচ্য। আফগানিস্তানে সহিংসতা দিন দিন গুরুতর আকার ধারণ করছে। এর মূলে আছে তালেবান জঙ্গিদের তত্পরতা। তাদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো খুবই পরাস্ত করছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীকে। বেশির ভাগ সংঘর্ষে বেঘোরে প্রাণ দিচ্ছে ন্যাটোর সেনারা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কারজাইকে কোমরবেঁধে লড়তে হবে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, জঙ্গি দমনে কারজাই যত না তত্পর, তার চেয়ে বেশি উত্সাহী নিজ স্বার্থ হাসিলে।এ কথা সবাই জানে যে কারজাইয়ের মূল ভরসা পশ্চিমা শক্তি। জঙ্গি দমন অভিযানে তাঁর খুঁটির জোর ইঙ্গো-মার্কিন জোট। সঙ্গে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী পশ্চিমা দেশ রয়েছে। এই শক্তির ছায়াতলে বসে তিনি বেআইনি কাজে লিপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে আফিমের ব্যবসা। তবে পরোক্ষভাবে জড়িত আছে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। আফগানিস্তানের রুক্ষ পার্বত্যাঞ্চলে আফিম চাষ নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই সেটা চলে আসছে। আর এই মাদকদ্রব্যের ব্যবসায় তালেবান জঙ্গিদের জড়িত থাকার অভিযোগও পুরোনো। সম্প্রতি এ ব্যাপারে নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীতে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে অবৈধ আফিম ব্যবসার সন্দেহভাজন খলনায়ক হিসেবে হামিদ কারজাইয়ের ভাই আহমেদ কারজাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তাঁকে সরাসরি ‘ঠগ’ বলে অভিহিত করা হয়।অনেক বিশ্লেষকের মতে, চার দশকের বেশি সময় আগে ভিয়েতনামের প্রশাসনকে হাতের পুতুল বানাতে যুক্তরাষ্ট্র যে চাল চেলেছিল, আফগান প্রশাসনকে নিয়েও তাদের একই খেলা চলছে। ১৯৬৩ সালে ভিয়েতনামের ভেতর যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা ছিল, আফগানিস্তানে যেন তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ওই সময় কিউবা সংকট নিয়ে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বেশ বেকায়দায় পড়েন। বিষয়টি আড়াল করতে ভিয়েতনাম সংঘর্ষের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে জড়িয়ে যান। এতে মুখ্য ভূমিকা রাখে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ওই সময় ভিয়েতনামে ঢোকার ক্ষেত্রে কেনেডির জন্য মোক্ষম মাধ্যম ছিলেন এনগো দিন দিয়েম। সায়গনে সিআইয়ের খাস লোক ছিলেন তিনি। ওই নগরের পুরো কর্তৃত্ব ছিল তাঁর হাতে। অপরাধ জগতে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেন দিয়েম। বিশেষ করে মাদকদ্রব্যের ব্যবসায়। দেশ ও বিদেশ দুটি ক্ষেত্রেই এ ব্যবসায় হাত পাকান দিয়েম। ক্যাথলিক সমর্থকদের শক্তি তো ছিলই, এর সঙ্গে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী, স্থানীয় অপরাধী এবং পতিতালয় ও মদের কাঁচা টাকায় মজবুত অবস্থান গড়ে নেন তিনি। দিয়েম বরাবরই তাঁর ক্ষমতার ডালপালা ছড়াতে সচেষ্ট ছিলেন। স্থনীয় জনমনে একদিকে তিনি যেমন ত্রাস সৃষ্টিতে সমর্থ হন, তেমনি নিরাপত্তাব্যবস্থাও নিজের শক্ত মুঠোয় রেখেছিলেন। কাজেই দিয়েমকে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে শক্ত খুঁটি গাড়ার অবলম্বন হিসেবে বেছে নেয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামে দিয়েম তাঁর ক্ষমতাকে যতই পোক্ত করুন না কেন, উত্তর ভিয়েতনামের মানুষ দিয়েমের বিরুদ্ধে জোরালো জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কেনেডি তখন টের পান, ভিয়েতনামে শেকড় গাড়তে হলে সেখানকার মানুষের মন জয় করতে হবে, সে ক্ষেত্রে দিয়েমের মতো ব্যক্তিকে সমর্থন করলে উদ্দেশ্য সফল হবে না। কিন্তু এ ব্যাপারে সিআইএর সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য দেখা দেয়। ওই সময় এশিয়ায় সিআইএর প্রধান ছিলেন এডওয়ার্ড ল্যান্ডসডেল। দিয়েমকে ক্ষমতায় বসানোর ব্যাপারে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করেন। একপর্যায়ে দিয়েমকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার ব্যাপারটি ল্যান্ডসডেলের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তা সভায় দিয়েমের জন্য সার্বিক সহযোগিতা আদায়ে আদাজল খেয়ে লাগেন তিনি। তবে শেষতক কেনেডি অনুধাবন করেন, ভিয়েতনাম বিষয়ে সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে দিয়েমকে সরিয়ে দেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো হবে। ওই সময় ভিয়েতনামে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি ক্যাবট লজকে তিনি দিয়েমের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে নিষেধ করেন। শিগগিরই মার্কিন সেনা কমান্ডারদের সহযোগিতায় দিয়েমের সামরিক কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান ঘটান। ১৯৬৩ সালের নভেম্বরে নিহত হন দিয়েম। অভ্যুত্থানের পর সায়গনের পুরো চিত্র পাল্টে যায়। বিভিন্ন অপরাধীকে নিয়ে গড়া দিয়েমের নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে। উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করা নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। এই বিরোধ ক্রমে বাড়তে থাকে। এই সুযোগে উত্তর ভিয়েতনামের নেতারা সায়গনের কর্তৃত্ব দখল করেন। ভিয়েতনামে নয়া শাসনাধীনে দেশের পরিস্থিতি খারাপ থেকে গুরুতর আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি একপর্যায়ে সিআইএর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দিয়েমের মতো আজ্ঞাবহ ব্যক্তি খুঁজে নিতে ব্যর্থ হয় তারা। সাম্প্রতিক ঘটনায় আফগানিস্তানে ভিয়েতনামের পুরোনো সেই চিত্র যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানে নিযুক্ত একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। তিনি ম্যাথিউ হো। জাবুল প্রদেশে সিনিয়র সিভিলিয়ান রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করেন তিনি। চার পৃষ্ঠার পদত্যাগপত্রে মাথিউ উল্লেখ করেন, ‘আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কৌশলগত লক্ষ্য আমি বুঝতে পারিনি। এ ব্যাপারে আমার আস্থাও নেই।’ আফগানিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে পরিকল্পিত ভবিষ্যত্ কৌশল নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। বর্তমানে আফগানিস্তান নিয়ে যেসব মার্কিন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, এর মূলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। পরিকল্পনা অনুযায়ী যেসব কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছে, এ ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনে বিভেদ দেখা দিয়েছে। এসব কৌশলের মধ্যে একটি বড় বিষয় হচ্ছে আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা বাড়ানো। এখানে প্রশ্নটা হচ্ছে, তা আকারে কত বড় হবে এবং সেনা মোতায়েনের ধরনটা কী হবে। আর সেনা মোতায়েন করলেই যে সহজে সহিংসতার অবসান ঘটবে তা নয়। বরং একদিকে জঙ্গি দমন, অন্যদিকে কারজাইয়ের স্বজনদের অপরাধ জগতে বিচরণ ঠেকানো—দুদিক সামলানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারজাইয়ের স্বজনদের বেআইনি কর্মকাণ্ড সংবাদমাধ্যমে অবশ্যই প্রকাশ পাবে। এতে একদিকে তিনি যেমন দেশ ও বিদেশে বিরাগভাজন হবেন, তেমনি তাঁর সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। কারজাইয়ের স্বজনদের অপরাধ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র তত্পর হলে তিনি তা ভালোভাবে নেবেন বলে আশা করা যায় না। এতে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে কারজাইয়ের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা নাও পেতে পারে। কাজেই আফগান-সংকট সহজে কাটবে না বলে আশঙ্কা রয়েছে।