সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল

কুষ্টিয়া জেলার গ্রাম লক্ষ্মীপুর। আলোচনায় এসেছে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যার কারণে। দৌলতপুর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে ২২ দিনে মারা গেছেন ১২ জন। এই গ্রামের স্বজন হারানো একজনের শোকগাথা এখানে।

হারিয়েছেন স্বামীকে, দুই মেয়েকে নিয়ে আশানূর খাতুনের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিতই
ছবি: প্রথম আলো

৫ জুলাই দুপুরের কথা। খাবার খেয়ে আমার স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিক শহরে গেল। কুষ্টিয়া এলজিইডিতে রোড রোলারের চালক সে। বলে গেল, বেতন নিয়েই বাড়ি ফিরবে। বিকেল হতেই ফোন বেজে উঠল। ওপাশে তার থরথর কণ্ঠ। জানাল, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। ডান হাতের কবজি ভেঙে গেছে।

কুষ্টিয়াজুড়ে তখন করোনার বিধিনিষেধ। আমাদের দুই মেয়ে। একজনের বয়স নয় মাস, অন্যজনের আট বছর। তাদের বাড়িতে রেখেই ছুটলাম কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা শেষে জানানো হলো, দ্রুত অস্ত্রোপচার করাতে হবে। শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ৬ জুলাই অস্ত্রোপচার করানো হয়। এরপর বাড়ি ফিরে যাই।

কিন্তু তখন দৌলতপুর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের পরিস্থিতি ভালো নয়। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঠান্ডা-জ্বরে আক্রান্ত। এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে মানুষ মারা যেতে লাগল। মনের ভেতর ভয় আর আতঙ্ক বাসা বাঁধল। আবু বক্করের জ্বর এল। শরীর দুর্বল হতে থাকল। একে হাত ভাঙা, তার ওপর জ্বর, ওদিকে গ্রামের মানুষের মৃত্যুসংবাদ। ভীতিকর পরিস্থিতি যেন।

জ্বর কমছিল না। ১৬ জুলাই মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে করোনার নমুনা দেওয়া হলো। জানা গেল, আবু বক্কর করোনা পজিটিভ। দুশ্চিন্তা আর বিপদ যেন ঘিরে ধরল আমাকে। কোলে আমার ছোট শিশু। তার জন্য চিন্তা হচ্ছে। চিন্তা হচ্ছে আমার নিজের জন্যও। তত দিনে জমানো ২১ হাজার টাকা শেষ। ধারদেনা করে আরও ৫০ হাজার জোগাড় করে চিকিৎসার শুরু চলছিল।

মিরপুর হাসপাতালে কয়েক দিন থাকার পর আবু বক্করের শরীরের অক্সিজেনের মাত্রা নিচে নামতে থাকল। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিলেন, কুষ্টিয়া করোনা হাসপাতালে নিতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। হাতের অপারেশনে যতটা না ভয়, তার চেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিল করোনাকে। স্বামী আবু বক্কর বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। ঢাকায় নেওয়ার জন্য বলেছিল। কিন্তু টাকার অভাবে কিছুই করতে পারছিলাম না।

২২ জুলাই দ্রুত কুষ্টিয়া করোনা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ২৫ জুলাই দুপুরে নিজ হাতে দুপুরের খাবার খাওয়াই। এরপর বিকেলে হঠাৎ চলে গেল না-ফেরার দেশে।

তার মৃত্যুর পর আকাশ যেন ভেঙে পড়ল মাথার ওপর। সংসারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। সেই যে এইচএসসি পড়ার সময় ২০০১ সালে বিয়ে হয় আমার। বিয়ের ১২ বছর পর আমাদের সন্তান হয়। এখন দুই মেয়েশিশু। তাদের নিয়ে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারাক্ষণ চিন্তা হয়। আড়াই শতক জমির ওপর টিনের চালার ছোট্ট একটা ঘর ছাড়া কিছুই নেই আমাদের। মেয়ে দুটোকে কীভাবে মানুষ করব, সামনে কী অপেক্ষা করছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।

অনুলিখন: তৌহিদী হাসান, কুষ্টিয়া