সাফল্য পেতে হলে ভোরে উঠুন

জীবনে সফল হতে হলে সাধনা করতে হয়। কিন্তু পেশাগত জীবনে সেই সাধনা কীভাবে করা সম্ভব? বিজ্ঞান-প্রযুক্তি কিংবা ব্যবসা যে ক্ষেত্রেই সাফল্য চান না কেন আগে জীবনযাপনের ধরনটা বশে আনতে হবে নিজের। জীবনযাপনে গোছাল হওয়ার ক্ষেত্রে খুবই জরুরি একটি বিষয় হলো—আগে ঘুমানো আর আগে জেগে ওঠার অভ্যাস রপ্ত করা। দেখা গেছে, পেশাগত ক্ষেত্রে সফলদের মধ্যে রাত জেগে থাকা বা ‘রাতের পাখি’ কমই আছেন, সফল যাঁরা তাঁরা বেশির ভাগই সকাল সকাল জেগে ওঠা ‘ভোরের পাখি’। এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে এমন ভোরের পাখি হওয়ার ইতিবৃত্ত।
ভোরেই ওঠেন সফল প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা
অনেক সফল সিইও বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাই বলে থাকেন, কর্মজীবনে তাঁদের সাফল্যের নেপথ্যে আছে সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস। জেনারেল ইলেকট্রনিকসের সিইও জেফ ইমেল্ট এবং টুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসি ঘুম থেকে ওঠেন ভোর সাড়ে পাঁচটায়। আর অ্যাপলের সিইও টিম কুক ও পেপসিকোর সিইও ইন্দ্র নুয়ি ঘুম থেকে ওঠেন ভোর সাড়ে চারটায়! ভোডাফোনের সিইও ভিত্তোরিও কোলাও জাগেন ভোর ছয়টায়। এই তালিকাটা এভাবে আরও অনেক দীর্ঘ হলেও দেখা যাবে প্রায় সব প্রধান নির্বাহীই সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার চর্চা করেন।
ঘুম জাগরণের দেহঘড়ি
সকালে ঘুম থেকে ওঠার বিষয়টা এমন নয় যে, চাইলেই যে কেউ কোনো এক সুন্দর সকাল থেকে এই অভ্যাস আয়ত্ত করে ফেলতে পারবেন! কারণ তাঁদের শরীর তাতে অভ্যস্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ মেডিসিন সেন্টারের সহ-পরিচালক নাথানিয়াল ওয়াটসন জানান, মানুষের শরীরের ঘুম জাগরণের চক্র একটা ‘দেহঘড়ির’ কাঁটার ছন্দে চলতে থাকে। মস্তিষ্কের ছোট্ট অংশ ‘সুপ্রাশিয়াসম্যাটিক নিউক্যালস’-এ থাকা এই দেহঘড়িকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘সারকাডিয়ান ক্লক’।
আমাদের ঘুমের ধরন নির্ভর করে মস্তিষ্কের এই অংশের ওপরই। কেননা এটাই শরীরের সারকাডিয়ান ছন্দের জিনগত উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। নাথানিয়াল ওয়াটসন বলেন, বয়স এবং জীবনযাপনের ধরন আমাদের ঘুমানো ও জেগে ওঠার অভ্যাসের অর্ধেকটা নির্ধারণ করলেও বাকি অর্ধেকটা আসলেই আমাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। এ কারণে অনেক মানুষ চাইলেই রাতে আগে আগে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন না। কারণ তাঁদের শরীর সে জন্য প্রস্তুত থাকে না। আর দুঃখজনকভাবে আমাদের দেহঘড়িটাও অফিসের সময়ের মতো সকাল নয়টা-পাঁচটার রুটিন মেনে চলে না।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার সহজ উপায়
একজনকে তার সহজাত ঘুম-চক্র পাল্টাতে হলে নিজের ডিএনএর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এটা কঠিন পরিশ্রমের কাজ হলেও নিয়মিত চর্চায় অবশ্যই তা সম্ভব। নাথানিয়াল ওয়াটসন বলেন, কিছু সহজ বিষয় আয়ত্ত করে এই কঠিন লড়াইয়ে জেতা যায়। এর মধ্যে প্রথমটা হলো আলো নিয়ন্ত্রণ করা—রাতে শোবার ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখা যাবে না, বাইরের আলো ঢুকতে দেওয়া যাবে না আর সকালে ঘরে আলো ঢুকতে দিতে হবে। সকালের সূর্যের রোদ বা প্রাকৃতিক আলোই এ জন্য সবচেয়ে ভালো। তবে, কারও শোবার ঘর যদি এমন হয় যে, সেখানে ভোরের আলো ঢুকতে পারে না, সে ক্ষেত্রে তিনি ঘরে এমন ল্যাম্প ব্যবহার করতে পারেন, যা নির্দিষ্ট সময়ে জ্বলে উঠবে এবং ধীরে ধীরে তার আলো বাড়তে থাকবে।
সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা আসলে এ লড়াইয়ের অর্ধেক। দ্বিতীয় বা লড়াইয়ের বাকি অর্ধেক হলো রাতে সময়মতো ঘুমাতে যাওয়া। কিছু বিষয় মেনে চললে রাতে সময়মতো ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস করাটা সহজ। এ বিষয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক অনিদ্রা দূরীকরণ বিশেষজ্ঞ কেনি পাংয়ের পরামর্শ হলো—বিকালের পর চা-কফি খাওয়া যাবে না, বিকাল-সন্ধ্যায় ব্যায়ামের অভ্যাস থাকলে তা অবশ্যই ঘুমাতে যাওয়ার চার ঘণ্টা আগেই সেরে নিতে হবে এবং সকালে হালকা নাশতা, দুপুরে ভারী খাবার আবার রাতে হালকা খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
প্রাণ আর শক্তির উৎস সূর্যের আলোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারলে আর খাদ্যাভ্যাস ও প্রাত্যহিক কাজকর্মের রুটিন মেলাতে পারলেই ঘুমের সঙ্গে লড়াই করে তাকে বশ মানানো সম্ভব। কিন্তু আরেকটা বিষয় এই ছন্দে ঝামেলা পাকিয়ে দিতে পারে, সেটা হলো হাল দুনিয়ায় আমাদের প্রযুক্তিনির্ভরতা। বর্তমান সময়ে অনিদ্রার রোগীদের একটা বড় অংশেরই প্রধান সমস্যা মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ বা টেলিভিশনের ওপর নির্ভরতা। এসব যন্ত্র নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো ছড়ায় যা খুবই শক্তিশালী। ফলে শোবার সময় হলে শোবার ঘরে কোনোভাবেই এমন কোনো যন্ত্র চালিয়ে রাখা যাবে না। টেলিভিশন বা কম্পিউটার বন্ধ করার পরও মনিটরের ছোট্ট আলোটাও নিভিয়ে নিতে হবে। এই আলো ঘুমের জন্য খুবই ক্ষতিকর।