আইবিএম থেকে বিটসি

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক সাবরিনা। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর করেছেন ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার এলার কলেজ অব ম্যানেজমেন্ট থেকে। তারপর ২০০০ সালে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএমে। ১৩ বছর ১০ মাসের ক্যারিয়ারে শেষতক পৌঁছে যান প্রতিষ্ঠানটির এন্টারপ্রাইজ সিস্টেমস বিভাগের কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স প্রধান পদে। ২০১৫ সালে দেশে ফিরে আসেন সাবরিনা। অনেকেই হয়তো প্রশ্নটা করে, আমরাও করলাম, আইবিএমের চাকরি ছেড়ে দেশে এলেন কেন?

সাবরিনা হাসলেন, ‘এই প্রশ্ন সবাই করে। আসলে আমার স্বামীর ব্যবসা বাংলাদেশকেন্দ্রিক। সব দিক বিবেচনা করে তাই ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে দেশে চলে এসেছিলাম।’

default-image

২০১৫ সালে দেশে আসার পর খেয়াল করলেন, মেয়েকে যেমন খেলনা দিতে চান, তেমন খেলনা বাজারে বিরল। দোকানগুলোয় হয় খুব দামি ‘টয়’ আছে, নয়তো মামুলি প্লাস্টিকের খেলনা। আর দামি–সস্তা যা–ই হোক, সব খেলনাই মূলত পুতুল, পিস্তল নয়তো গাড়ি।

তাহলে কী ধরনের খেলনা খুঁজছিলেন সে সময়?

সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই ঘরে বসে শিশুর মনোজগৎ নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন সাবরিনা। জানতেন, শিশুর বিকাশে ‘নিজে করো’জাতীয় খেলনার গুরুত্ব অসীম। তাই মেয়ে ভারিশা হোসেইনকে দেওয়ার মতো জুতসই খেলনার অভাবটাই তাঁকে ভাবিয়েছিল। ঠিক করেছিলেন, নিজেই খেলনা বানিয়ে বিক্রি করবেন। নানা কারণে ইচ্ছাটাকে তখন বাক্সবন্দী করে রাখতে হয়েছিল।

২০২১ সালে এসে স্বপ্নের ওই বীজ উর্বর ভূমি পেয়ে যায়। সাবরিনার দ্বিতীয় সন্তান জেফার হোসেইনের বয়স তখন চার। তার জন্যও চাই জুতসই খেলনা। কিন্তু বাজারে সৃজনশীল খেলনার অভাব তখনো বর্তমান। সাবরিনা বলছিলেন, ‘ছেলের জন্য খেলনার অভাবটা আমাকে আবার পুরোনো স্বপ্ন নিয়ে ভাবাল। ঠিক করলাম, বিদেশ থেকে খেলনার বিচ্ছিন্ন অংশ এনে অ্যাসেম্বল করে বিক্রি করব। কারণ, হুট করে এখানে সবকিছু তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। সেই থেকে, অর্থাৎ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে বিটসির যাত্রা শুরু।’

খেলনা, বিজ্ঞান ও মনোজগৎ

যাত্রার শুরু থেকেই সাবরিনার খেয়াল ছিল বিটসির খেলনাগুলো যেন কেবলই খেলনা না হয়। চেয়েছেন খেলনার ব্যবসাটা হোক শিক্ষা–প্রযুক্তিভিত্তিক। স্টিম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্টস ও ম্যাথ) বলে একটা শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু আছে সারা বিশ্বে। উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের শেখানোর অনেক উপকরণ তৈরি করা হয় এর ভিত্তিতে।

সাবরিনার ব্যাখ্যা, ‘আমরা আনন্দে বা নির্ভার থাকলেই সবচেয়ে ভালো শিখি। তাই শিশুদের লেখাপড়াটাও এ পদ্ধতিতে হওয়া জরুরি। স্টিম পদ্ধতির মূল কথা সেটাই। এতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, কলা ও গণিত সবই থাকে, তবে আনন্দের মোড়কে। আমার চিন্তা ছিল, বিটসির খেলনাগুলোও যদি এমন হয়, তাহলে খেলতে খেলতেই শিশুরা অজানাকে জানার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠবে।’

যেমন? আপনার খেলনা থেকেই যদি উদাহরণ দেন। সাবরিনা বলেন, ‘আপনি হয়তো শিশুকে বলে দিতে পারেন, চাঁদ কেন এবং কীভাবে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। কিন্তু হাতে–কলমে দেখিয়ে দিলে বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। বিটসির একটা খেলনা আছে পৃথিবী ও চাঁদের ঘূর্ণনপ্রক্রিয়া নিয়ে। যেটা খেলতে খেলতে শিশুরা বুঝে ফেলে, এর পেছনের বিজ্ঞানটা কী। অর্থাৎ স্টিমভিত্তিক ডু ইট ইয়োরসেলফ শ্রেণির খেলনাগুলো শিশুরা নিজেরাই ভাঙে–গড়ে। এতে সৃজনশীলতার বিকাশ হয়। এটা তো জানা কথা, শৈশবে সৃজনশীলতার চর্চা পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রধান চাবিকাঠি। আর খেলনায় লিঙ্গনিরপেক্ষতাও জরুরি বিষয়।’

খেলনায় নয় ছেলে–মেয়ে

বাবার চাকরি সূত্রে নাইজেরিয়ায় কেটেছে সাবরিনার শৈশব। তেমন একটা খেলনা পাওয়া যেত না স্থানীয় বাজারে। তাই সাবরিনা আর তাঁর ভাই হাতের কাছের সবকিছুকেই বানিয়ে ফেলতেন খেলনা। মাঝেমধ্যে দেশে এলে অবশ্য বুঝতেন, ছেলে–মেয়ের খেলনায় বিস্তর ফারাক।

সাবরিনা বলছিলেন, ‘ছেলেবেলা থেকে আমাদের শেখানো হয়, তুমি মেয়ে, তুমি খেলবে পুতুল, পুতুলের ঘর কিংবা হাঁড়িপাতিল দিয়ে। আর ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া হয় গাড়ি নয়তো পিস্তল। এটা ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই চেয়েছি, বিটসির খেলনা হবে লিঙ্গনিরপেক্ষ। বিটসির ওয়েবসাইটে খেয়াল করলে দেখবেন, বয়স ও থিমের ভিত্তিতে ক্যাটাগরি ভাগ করেছি আমরা; খেলনায় কোনো ছেলে–মেয়ে ভেদ রাখিনি। খেলনাগুলো যেন সব শিশুকে সমান আনন্দ দেয়, সঙ্গে উসকে দেয় সৃজনশীলতা।’

এই সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়ে আরও কী ভাবছেন সাবরিনা? দেশে কি এসব খেলনা তৈরি হবে? খেলনায় কি থাকবে দেশীয় ঐতিহ্যের ছাপ? সাবরিনা বললেন, ‘আমারও এটাই চাওয়া। দেশেই সবকিছু করব। তবে এ জন্য সময় ও বিনিয়োগ দরকার।’

আপাতত অনলাইনেই খেলনা বিক্রি করছে বিটসি। ঢাকায় ইউনিমার্টের গুলশান, ধানমন্ডি ও ওয়ারী শাখায় খেলনাগুলো পাওয়া যাচ্ছে ৭৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৭৫০ টাকার মধ্যে। সাবরিনার আশা, দেশেই তৈরি হলে বিটসির খেলনা সব মা–বাবার হাতের নাগালে চলে আসবে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন