সিগন্যাল প্রসেসিং কাপে বুয়েটের জয়

বাঁ থেকে নাজিবুল হক সরকার, বিস্ময় পাল, অধ্যাপক ড. শেখ আনোয়ারুল ফাত্তাহ, আওসাফুর রহমান, জাবের ইবনে আব্দুল হাকিম
ছবি: সংগৃহীত

‘১০ মে ফাইনাল হলো। এরপর ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলাম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার ফাইনালিস্ট হলেও বুয়েটের দলগুলো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পাচ্ছিল না। এবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি জানার পর তাই আনন্দের সীমা ছিল না। সত্যিই আমাদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে,’ বলছিলেন বিস্ময় পাল।

ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইইই) হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেশাদার প্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট সংস্থা। প্রতিবছর সিগন্যাল প্রসেসিং কাপ নামে একটি প্রতিযোগিতা আয়োজন করে তারা। এ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি দল। ‘টিম সিন্থেসাইজার’ নামের দলটির সদস্যরা হলেন আওসাফুর রহমান, বিস্ময় পাল, নাজিবুল হক সরকার এবং জাবের ইবনে আবদুল হাকিম। আওসাফুর ও বিস্ময় তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের ছাত্র। নাজিবুল ও জাবের পড়ছেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগে। সবাই বুয়েটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। একই প্রতিযোগিতায় বুয়েটের অন্য একটি দল হয়েছে দ্বিতীয় রানারআপ।

কীভাবে পেরোলেন প্রতিযোগিতার ধাপগুলো? বিস্ময় পাল বলেন, ‘ব্যাপারটা আসলে একটু জটিল। আমাদেরকে পাঁচটা কণ্ঠস্বর দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে ছিল কয়েক হাজার নমুনা কণ্ঠ। নমুনাগুলো ছিল কম্পিউটার বা মেশিন দিয়ে তৈরি, তবে অবিকল মানুষের মতো। আমাদের কাজ ছিল এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন প্রোগ্রাম তৈরি করা, যা এই হাজারো কণ্ঠস্বরের মধ্য থেকে ওই পাঁচটা কণ্ঠস্বর আলাদা করতে পারবে। আমরা সফলভাবেই প্রোগ্রামটা তৈরি করতে পেরেছি।’

এবারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১২টি দেশ থেকে ২৩টি দল অংশ নিয়েছিল। প্রতিযোগিতা বেশ বড় পরিসরে হলেও প্রতিযোগীর সংখ্যা কম কেন? উত্তর দিলেন আওসাফুর রহমান। ‘নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে এই প্রতিযোগিতাগুলো হয়। যেমন এবারের প্রতিযোগিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রোগ্রাম তৈরি করতে হয়েছে, যা কণ্ঠস্বর যাচাই করবে। এ বিষয়ে যাদের আগ্রহ, তারাই অংশ নিয়েছে। এ ধরনের প্রোগ্রাম তৈরি করতে অনেক রিসোর্স লাগে, যেগুলো সচরাচর হাতের কাছে থাকে না। আমরা নিজেরাও সব রকম সহযোগিতা পাই না। কম রিসোর্স নিয়েই কাজ করতে হয়। বৈশ্বিক অন্য বড় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতাগুলোতে সব বয়সের প্রোগ্রামার অংশ নেয়। তবে এটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য। এ ছাড়া আইইইইর মেম্বারশিপ, একজন শিক্ষককে সুপারভাইজার হিসেবে দলে রাখাসহ বেশ কিছু মানদণ্ড ছিল। মোটকথা, আইইইইর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য দক্ষতা ও সঠিক ধারণা থাকা জরুরি। প্রচুর সময়ও দিতে হয়। তাই সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও সবাই অংশগ্রহণ করে না।’

দলের সুপারভাইজার হিসেবে সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছেন অধ্যাপক শেখ আনোয়ারুল ফাত্তাহ। বড় বড় দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা বেশ ভালো অর্জন বলে মনে করেন তিনি। মুঠোফোনের ওপাশ থেকে হেসে বললেন, ‘ভালোই লাগে এমন কাজগুলোর অংশ হতে। সুপারভাইজার হিসেবে ১০ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার চেষ্টা করছি। যেহেতু এই প্রতিযোগিতাগুলো আমাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডারের বাইরে, তাই পুরোটাই নিজেদের প্যাশন থেকে করা। দিন নেই, রাত নেই, আমরা সময় পেলেই একসঙ্গে কাজ করি। তাই সুপারভাইজার না হয়ে দলের একটা অংশ হয়ে থাকতেই পছন্দ করি। কাজের নতুন দিকগুলো দেখিয়ে দিই। ওদের সঙ্গে সম্পর্কটাই এমন, রাত তিনটায়ও যদি ওরা নতুন কিছু করে ফেলে, আমাকে তখনই জানিয়ে দেয়। আমিও আমার ইনপুট দিই। আমার মনে হয়, অভিজ্ঞ ও প্যাশনেট কোনো শিক্ষকের সঙ্গে কাজ করা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য লাভজনক। অপার প্রতিভা ও দক্ষতা নিয়ে ওরা হয়তো একটা বৃত্তে ঘুরছিল, তখন একটা চিন্তার জায়গা ধরিয়ে দিলে ওরা অনেক বড় কিছু করে ফেলে। তাই অভিজ্ঞতা আদানপ্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বলতে চাই, শুধু একাডেমিক পড়ালেখায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলে হয়তো একটা জিপিএ আসবে। কিন্তু গবেষণা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত থাকলে জানার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার একটা দক্ষতা জন্মাবে। যেটা যেকোনো শিক্ষার্থীকে অনেকখানি এগিয়ে রাখবে।’

বুয়েটের উপাচার্য সত্যপ্রসাদ মজুমদার বিজয়ী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আশা করি, ভবিষ্যতে তারা বৈশ্বিক গবেষণায় আরও বেশি অবদান রাখবে। তাদের এসব কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে বুয়েট ইতিমধ্যে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (আরআইএসই) সেন্টারের মাধ্যমে স্নাতক পর্যায়ে গবেষণায় অনুদানের পদক্ষেপ নিয়েছে। এই অনুদান স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন দলগত গবেষণা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সাহায্য করবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোয় যোগদান নিশ্চিত করবে।’