ষাটের দশকে বগুড়ার চিনক ও লাচ্ছা সেমাইয়ের সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় ঈদকে কেন্দ্র করে সেমাই তৈরি হলেও এখন বছরজুড়েই সেমাই তৈরি হচ্ছে। অর্ডার মতো কারখানা থেকে ট্রাকে ভরে সেমাই যাচ্ছে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম। ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের সিংহভাগ সেমাইয়ের জোগানদাতাই বগুড়া।

আশির দশকে লাচ্ছা উৎপাদনে নাম কামায় আকবরিয়া ও এশিয়া সুইটস। এশিয়া সুইটসে দুই দশকের বেশি সময় ধরে লাচ্ছা তৈরি করছেন আবদুল কাদের। গল্পে গল্পে আবদুল কাদের বলেন, ১৪ বছর বয়সে এশিয়া সুইটসের লাচ্ছার কারখানায় কাজ শুরু করি। তখন এই ফ্যাক্টরির প্রধান কারিগর ছিলেন ইকবাল হোসেন, তাঁর সহকারী হিসেবে আমার এই কাজে হাতেখড়ি।’

২০০২ সালে এই কারখানায় প্রধান কারিগরের দায়িত্ব পান কাদের। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে আরও ১৩ জন কারিগর কাজ করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় লাচ্ছার স্বাদে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এখন তাঁরা ডালডা লাচ্ছা ও এশিয়া ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা তৈরি করছেন। বাজারে ডালডায় ভাজা লাচ্ছার দাম কেজি প্রতি ২৬০ আর ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা ১ হাজার টাকা।

সেমাইয়ের নাম চিকন

চল্লিশের দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে কয়েকজন কারিগর এসে বগুড়া শহরতলির চারমাথা-গোদারপাড়া এলাকায় চিকন সেমাই বানানো শুরু করেন। গোদারপাড়ার কারিগরদের সঙ্গে কাজ করতেন বেজোড়া এলাকার কয়েকজন। এর মধ্যে শ্যাঁওলাগাতি গ্রামের দুলু মিয়া তাঁর এলাকায় প্রথম চিকন সেমাই তৈরি শুরু করেন। তাঁর হাত ধরে এই এলাকার শাহের আলী, খোকা মিয়া, জাবেদ আলীসহ অনেকেই চিকন সেমাই তৈরির পেশায় জড়ান। অল্প দিনেই বেজোড়া এলাকার আরেক নাম হয়ে যায় ‘চিকন সেমাইপল্লি’।

default-image

বগুড়ার চিকন সেমাই কারিগরদের মধ্যে জনপ্রিয় বেজোড়া গ্রামের মাকসুদা বেগম। তিনি বলেন, ‘বেজোড়া, ঘাটপাড়া, শ্যাঁওলাগাতি, কালসিমাটি, শ্যামবাড়িয়া, রবিবাড়িয়াসহ আশপাশের ৮ থেকে ১০টি গ্রামের নারীদের হাতে প্রায় ৫০ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চিকন সেমাই। এই সেমাইয়ের খ্যাতি দেশজুড়ে। এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এ সেমাই।’

সরেজমিনে দেখা যায়, চিকন সেমাই তৈরির শতাধিক কারখানার অধিকাংশ কারিগরই নারী। কেউ ময়দার খামির বানাতে ব্যস্ত, কেউ বিদ্যুৎ বা হস্তচালিত সেমাইকলে খামির ঢালতে ব্যস্ত। কেউবা কলে তৈরি সেমাই রোদে শুকাতে দিচ্ছেন।

চিকন সেমাই কড়াইতে ভেজেও বিক্রি হয়। শুকনা সেমাই একসময় খাঁচিতে ভরা হয়। প্যাকেটজাত করেও বিক্রি হয় সুস্বাদু চিকন সেমাই।

রোজার এক–দেড় মাস আগে থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে চিকন সেমাইয়ের ফরমাশ আসতে শুরু করে। ঈদ উপলক্ষে গড়ে দুই মাস কারখানায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি চিকন সেমাই ১০০ থেকে ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

সব মিলে শেষ মুহূর্তে সেমাই তৈরি ও বাজারজাত নিয়ে দারুণ ব্যস্ত এখন বগুড়া। কারও দম ফেলার ফুরসত নেই। দিন শেষে চাহিদামতো জোগান দিতে পারলেই না বজায় থাকবে তাদের খ্যাতি ও যশ।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন