আমের নামে ফ্যাশন ব্র্যান্ড

র ম্যাংগো

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

ভারতের রাজস্থানের ছোট গ্রাম থেকে বেড়ে ওঠা সঞ্জয় গার্গ এক মহৎ উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন নিয়ে ২০০৮ সালে গড়ে তোলেন ‘র ম্যাংগো’ নামে একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড।

হিন্দি মিডিয়াম স্কুল থেকে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্রাফট অ্যান্ড ডিজাইন, তারপর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি, ইন্ডিয়া—এই ছিল সঞ্জয়ের পাঠস্থান। তিনি বলেন, ‘চান্দেরি ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমি বয়নশিল্পীদের সঙ্গে সংযুক্ত হই এবং তারপর আর পাশ্চাত্যে যাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি।’

খুব সাধারণ একটা নাম ‘র ম্যাংগো’কে ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করার পেছনেও রয়েছে বিশেষ কারণ। ২০১০ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলস ইয়াং ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাওয়ার্ড পাওয়া সঞ্জয় তাঁর নিজস্ব দর্শনকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর মতে, অপূর্ণতার মধ্যে সৌন্দর্য বিরাজ করে এবং র ম্যাংগো তাঁর এই দর্শনের জন্য একটা সঠিক রূপক।
র ম্যাংগো সাধারণত শাড়ি, দোপাট্টা, উত্তরীয়, গাউন, চাদর, ফেব্রিক নিয়ে বেশি কাজ করে। চান্দেরি নিয়ে তাদের কাজ বেশ সফলতা অর্জন করেছে। বর্তমানে এই ব্র্যান্ড বেনারসি ও অন্যান্য সিল্ক নিয়ে কাজ করছে।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

ঐতিহ্যের সংমিশ্রণই আদতে র ম্যাংগোর সফলতার কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে সমকালীন ডিজাইনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বয়নশিল্পের সামঞ্জস্য। এই ব্র্যান্ড চাকচিক্যে বিশ্বাসী নয়। উজ্জ্বল রং, শতবর্ষের পুরোনো বয়নশিল্প, ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যময় কারুশিল্পকে সমকালীন ফ্যাশনের ছাঁচে না ফেলে অনবদ্য ভূমিকায় উপস্থাপন করে তারা। আসলে এর উদ্দেশ্য হলো, পরবর্তী প্রজন্ম এমন এক ইকোসিস্টেম চালু করতে পারবে, যেখানে বয়নশিল্পী বা প্রান্তিক কারুশিল্পীরা লাভজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।

ফ্যাশনকে শুধু গ্ল্যামারের মধ্যে আটকে না রেখে স্বাভাবিকভাবেই সবার কাছে পৌঁছে দিতে চান সঞ্জয়। তিনি বিভিন্ন বই, লোকজ গান, ভ্রমণ বা আদি প্রথা থেকে উৎসাহ নেন। র ম্যাংগোর শাড়ি, লেহেঙ্গা, ঘাগরা, স্কার্ট ও কুর্তায় গাঢ় বা তীব্র রঙের ঐতিহাসিক কিছু মোটিফ যেমন গাঁদা ফুল, হাতি, হরিণ, পদ্ম, ময়ূর, বানর বা দৈত্য দেখা যায়, যা তাঁতের সাধারণ পোশাককে অসাধারণ শিল্পকর্মে রূপায়িত করে। হালের বিখ্যাত অভিনেত্রী বিদ্যা বালান, দীপিকা পাড়ুকোন, কঙ্গনা রনৌতের পছন্দের তালিকায় রয়েছে এই ব্র্যান্ড।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

২০১৫ সালে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে দ্য ফেব্রিক অব ইন্ডিয়া নামে র ম্যাংগোর সিগনেচার শাড়িগুলো প্রদর্শিত হয়। মিনিমালিজমে বিশ্বাসী সঞ্জয় গার্গ তাঁর প্রতিটি কাজে ভারতের সাধারণ প্রথা, সংস্কৃতি ও রং সুন্দরভাবে উপস্থাপনে সার্থক হয়েছেন। ল্যাকমে ফ্যাশন উইকেও তাঁর কাজ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

ম্যাংগো

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

তুরস্কের অভিবাসী দুই ভাই ইসাক এন্ডিক ও নাহমান এন্ডিক ১৯৮৪ সালে ম্যাংগো নামের বিখ্যাত ব্র্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন। ফিলিপাইনে এক সফরে পথে আম খান তাঁরা। এরপর তাঁরা দেখেন, সব ভাষায় এই ফলের নামের উচ্চারণ প্রায় একই। এটাই ছিল তাঁদের ব্র্যান্ডের নামকরণের নেপথ্য অনুঘটক। ম্যাংগো ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা স্পেনে। যদিও তাদের সবচেয়ে বেশি স্টোর রয়েছে ইস্তাম্বুল ও তুরস্কে।
বিশ্বব্যাপী ফ্যাশনের নেটওয়ার্ক তৈরির লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে প্রথম ম্যাংগো ওয়েবসাইট চালু হয় এবং ২০০০ সালে তাদের প্রথম অনলাইন স্টোর চালু করে। ধীরে ধীরে আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া ও ইউরোপের প্রায় ১১০টি দেশে ছড়িয়েছে তাদের শাখা। বর্তমানে সাফল্যের সঙ্গে সৃজনশীল ও আকর্ষক ডিজাইনের আউটফিট নিয়ে রাজত্ব করে যাচ্ছে এই ব্র্যান্ড।

প্রতি ঋতুতে ক্রেতাদের পছন্দ, প্রয়োজন ও ট্রেন্ড অনুযায়ী পরিবর্তন করে নারী, পুরুষ ও বাচ্চাদের জন্য পোশাক নিয়ে হাজির হয় ম্যাংগো। তারা মূলত তরুণ প্রজন্মের গ্রাহকদের সন্তুষ্টি কেন্দ্র করে জ্যাকেট, কোট, স্যুট, সোয়েটার, টপস, জেগিংস, শার্ট, ট্রাউজার, ডেনিম জিন্স, স্কার্ট, পোলো শার্ট, ফুটওয়্যার, ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি করে। তা ছাড়া মৌসুম অনুযায়ী নতুন নতুন সংগ্রহ থাকার কারণে ম্যাংগোর গ্রাহকদের কখনো হতাশ হতে হয় না।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

লকডাউন মাথায় রেখে ‘লাইফ ইন ব্লুম’ নামে তারা নতুন সংগ্রহ হাজির করেছে, যেখানে উজ্জ্বল রঙের ফ্লোরাল প্রিন্টের শতভাগ টেকসই গার্মেন্টস কাপড় পাওয়া যাবে। ফোর্বস সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসাক এন্ডিক বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিবেশে সহনশীল দামে ফ্যাশনেবল প্রোডাক্ট তৈরি করি, যা গ্রাহকদের আগ্রহী করে।’

ম্যাংগোর প্রচারণায় টপ মডেল ও বিখ্যাত হলিউড স্টার নাওমি ক্যাম্পবেল, ইভা হার্জিগোভা, ডাকোতা জনসনকে দেখা যায়। ইনস্টাগ্রামে তাদের ১১.৪ মিলিয়ন ফলোয়ার ও ফেসবুকে এক কোটি ফ্যান রয়েছে। এত জনপ্রিয়তার কারণ হলো, ম্যাংগোর মানসম্পন্ন প্রোডাক্ট এবং সমন্বিত ব্র্যান্ড ইমেজ।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

গ্রাহকের পছন্দ অনুসারে সঠিক সময়ে সঠিক পোশাক স্টোরে হাজির করা এবং পরিবেশ দূষণ রোধে কার্যকর ও টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা, পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিংয়ে বিশ্বাসী হওয়া। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য এই ব্র্যান্ডের জন্য রপ্তানি করা হয়। এই ব্র্যান্ডের উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা ও সাফল্যে বাংলাদেশও অংশীদার।