করোনাকালের ফ্যাশনধারা

বিজ্ঞাপন
default-image

অবরুদ্ধ বন্দিদশায় অদ্ভুত মন খারাপ; তা সত্ত্বেও অতিমারীর নানামুখী প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে নিজেকে সুস্থ আর পরিপাটি রাখার চেষ্টায় নিরত ভুবনবাসী। সুখের কথা, এর মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে যাপনের নতুন ধারা। এই ধারা বহমান সারা বিশ্বেই। এখানে যেন পুব-পশ্চিম এক সুতায় গাঁথা। বাংলাদেশও হাঁটছে একই পথে। মৌলিক পোশাকেই ফ্যাশনেবল করে তোলার চেষ্টা করছে সবার; বিশেষত তরুণদের। 

যাপনে সব সময়ই বিম্বিত সমসময়। সেই ধারায় প্রভাবিত ফ্যাশন ট্রেন্ড। করোনাকালেও এর ব্যত্যয় ঘটছে না, বরং বিশেষজ্ঞরা বতর্মানকে সমান্তরালে তুলনা করছেন বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ের সঙ্গে। কারণ, সেই চল্লিশের দশকে সামান্য উপকরণেই মানুষ যেমন নিজেদের পরিপাটি রেখেছে, তেমনি ডিজাইনাররাও দেখিয়েছেন সৃজননৈপুণ্য। তখনই সৃষ্টি হয়েছে ক্রিস্তিয়ঁ দিওরের ‘নিউ লুক’।

বন্দিজীবনের ফ্যাশন ট্রেন্ড
বন্দিজীবনে মানুষ নিজেকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি বিষণ্নতাকে প্রশ্রয় না দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে মন ভালো হয় এমন সব হালকা রঙের প্রতি অনুরক্ত থেকে মৌলিক পোশাকেই নিজেকে ফিট আর ফ্যাশনেবল রাখার চেষ্টা করেছে। এ জন্য বেশি বিক্রির তালিকায় আছে লেগিংস, অ্যাকটিভওয়্যার, সাইক্লিং শর্টস, সোয়েটশার্ট, শর্টস, ট্যাংটপ, প্যান্ট আর ঢিলেঢালা পোশাক। আর জিনস আছে স্বমহিমায়।

পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকায় করোনাকালে সাইক্লিং শর্টসের বিক্রি ১২ শতাংশ ও সোয়েটশার্টের বিক্রি ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে ট্র্যাকপ্যান্টের বিক্রি সবচেয়ে বেশি ৪০ শতাংশ বাড়ায় এটাকেই বলা হচ্ছে চলমান সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ট্রেন্ড। ভেলভেটের মতো নরম আর আরামদায়ক কাপড়ের চাহিদা দুই মহাদেশেই এখন তুঙ্গে। আমেরিকায় এর বিক্রি বেড়েছে ১৩ শতাংশ।

কেবল পোশাক নয়, জুতার ক্ষেত্রেও বেশ পরিবর্তন লক্ষণীয়। হাইহিলের চাহিদা একেবারে তলানিতে। দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে অফিস করতে হওয়ায় ড্রেস শুর বিক্রিও কমেছে ৭০ শতাংশ। এমনকি লোফারও নেই চাহিদার তালিকায়। এই সময়ে বরং নরম আর আরামদায়ক স্লিপারের প্রতি ঝুঁকেছে সবাই। এমনকি নানা ধরনের ক্রকসের প্রতি অনুরাগ লক্ষ করা গেছে। বিশেষত ফার দেওয়া ক্রকস মেয়েদের বেশি পছন্দের।

রঙে রোমান্টিকতা
মন ভালো রেখে নিজেকে চাঙা রাখার পাশাপাশি রঙের মধ্য দিয়েই রোমান্টিকতাও খুঁজেছে মানুষ। খুঁজছে স্মৃতিমেদুর হওয়ার উপলক্ষ। কোভিড–উত্তর সময়েও সেটা বজায় থাকছে। অবশ্য কোভিডকালে নিরপেক্ষ রঙের প্রতি পক্ষপাত ছিল লক্ষ করার মতো। চোখের আরাম, মনের ফুল্লতা প্রদানকারী সব রং যেমন প্যাস্টেল, ধূসর, খাকি, বেইজ পেয়েছে অগ্রাধিকার। ইউরোপে খাকি ৫ শতাংশ আর আমেরিকায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপে বেইজের চাহিদা বেড়েছে ৮ শতাংশ। তবে আগলমুক্তির পর চাহিদা বাড়ছে প্রিন্টের। আর এর পরিমাণ ২১ শতাংশ।

পশ্চিমের পাঁচালি
ইউরোপ আর আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইউরোপ কিছুটা সামলে উঠলেও এখনো বেসামাল আমেরিকা। এরই মধ্যে অবশ্য খুলছে দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, অফিস। পথে নামা মানুষের পরিধেয়েও তাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তন।
করপোরেট সংস্কৃতিতে সিলিকন ভ্যালির ক্যাজুয়াল ট্রেন্ড প্রভাব ফেলেছে আগেই। টাই ব্লেজার এখন ব্যাকবেঞ্চার। জন্ম নিয়েছে নতুন ক্যাজুয়াল করপোরেট ট্রেন্ড। হুডির সঙ্গে ব্লেজার, সোয়েটপ্যান্টের সঙ্গে সিল্কি টপের গাঁটছড়াই এখন নিউ নরমাল।

প্রতিশোধের ব্যয়
চলমান অতিমারির উৎসভূমি চীনে সংক্রমণ শেষে, নতুন স্বাভাবিক সময়ে ব্র্যান্ড পোশাক আর অ্যাপেল স্টোরগুলোয় দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন। বিশেষজ্ঞরা অমিতব্যয়িতার এই ঝোঁককে আখ্যায়িত করছেন ‘রিভেঞ্জ স্পেন্ডিং’ বা প্রতিশোধের ব্যয় হিসাবে। অধিক ব্যয়ে বিত্তবান চৈনিকরা পেতে চাইছেন মুক্তির স্বাদ।

default-image

ফ্যাশনে স্বাস্থ্যবিধি
সুরক্ষাবিধি এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাস্ক পরা এখন অত্যাবশ্যক। এ জন্যই নকশার নান্দনিকতায় মাস্ক রূপান্তরিত ফ্যাশনের নতুন অনুষঙ্গে।

উদ্ভাবনের অবকাশ
রুদ্ধদিনে পোশাকের ওমে পাওয়া প্রশান্তির মাঝেও ছিল শঙ্কা। এ জন্যই বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনে গুরুত্ব পেয়েছে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া, সর্বোপরি জীবাণু প্রতিরোধী কাপড়। আগামীর পোশাক হবে এসব কাপড়ে।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
বৈশাখের পর রোজার ঈদ পেরিয়ে কোরবানির ঈদ। উদ্যাপনের তিনটি বড় উপলক্ষ সত্ত্বেও মানুষ মেতে উঠতে পারেনি। প্রথম দুটোয় ছিল গৃহবন্দী। এবার তাও কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। যদিও শঙ্কা পিছু ছাড়েনি। যদিও এই সময়ে ট্রেন্ডে তেমন করে কিছু চোখে পড়ছে না, বরং এখানেও সেই পশ্চিমা বাতাস। আটপৌরে পোশাকে ফ্যাশনেবল রাখার চেষ্টা। ট্র্যাকসুট আর ক্যাজুয়াল প্যান্টের সঙ্গে টি-শার্ট, ক্যাজুয়াল শার্ট; মেয়েদের লেগিং, সালোয়ার কিংবা প্যান্টের সঙ্গে টপ বা কামিজ, কখনো শার্ট। মিক্স অ্যান্ড ম্যাচের প্রয়াস এখানেও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অবশ্য ব্যতিক্রম আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাককে। পাঞ্জাবি আর শাড়ি তাই এত কিছুর মধ্যেও জায়গা করে নিয়েছে।

অতঃপর
আবিশ্বের ফ্যাশন অনুরাগীরা অবরুদ্ধতা থেকে মুক্তজীবনে ফিরতে উদ্গ্রীব হলেও অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে টেকসই, পুনর্ব্যবহারযোগ্য আর পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনকে। এই ধারায় হয়েছে মিনিমালিজমের ধারণা। করোনাকালে এটাই বোধ হয় বৈশ্বিক ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন