বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অবশ্য ঠিকমতো স্বাস্থ্যকর খাবার দাবার না খাওয়া, কায়িক শ্রম হবে এমন খেলাধুলা থেকে দূরে থাকাসহ জীবনযাপনের ধরনে পরিবর্তন আসায় শিশুদের স্থূলতার প্রবণতা বাড়ছিল।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের মধ্যে বেশ হতাশাজনকভাবে যেসব প্রবণতা বাড়ছে, তার একটি স্থূলতা। মহামারির মধ্যে ঘরে বসে থাকা শিশুদের মধ্যে যা ঊর্ধ্বমুখী।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে ল্যানসেটে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শিশুদের মধ্যে স্থূলতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বহাল থাকলে ২০২২ সাল নাগাদ ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরের মধ্যে স্থূলদের সংখ্যা শীর্ণকায় ( উচ্চতা অনুপাতে কম ওজন) শিশু-কিশোরদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। ল্যানসেটের এই সতর্কবার্তার মধ্যে দুই বছরের বেশি সময় ধরে গোটা বিশ্ব করোনার মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে স্থূল শিশুদের সংখ্যা পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্থূল শিশুর ৪৮ শতাংশ এশিয়ায়

default-image

অনেকেই মনে করেন ধনী দেশের শিশুদের ওজন বেশি, গরিব দেশের শিশুরা পুষ্টির অভাবে ভোগে। কিন্তু ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বের পাঁচ বছরের কম বয়সী স্থূল শিশুদের ২৭ শতাংশ আফ্রিকায় আর ৪৮ শতাংশ এশিয়ার। আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলের স্থূলকায় শিশুর সংখ্যা শীর্ণকায় (উচ্চতা অনুযায়ী ওজন কম) শিশুদের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে স্থূল শিশুদের সংখ্যা তরতর করে বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ২০২০ সালে বিশ্বের ৫ বছরের কম বয়সী ৩ কোটি ৯০ লাখ শিশুর ওজন বেশি বা তারা স্থূল। আর ২০১৯ সালে এই বয়সী স্থূল শিশুদের প্রায় অর্ধেকই ছিল এশিয়ার।

শীর্ণকায় ক্ষণস্থায়ী, স্থূলতা নয়

default-image

করোনা মহামারিতে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেছে। এই মহামারি গরিব দেশগুলোতে আঘাত হেনেছে বেশি। সেখানকার পরিবারগুলোকে দৈনন্দিন খাবার জোগাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। অনেকে প্রতি বেলায় খাবার জুটাতেও পারেনি। ফলে ওই সব পরিবারের শিশুদের স্বাভাবিকভাবেই ওজন কমে গেছে। কিন্তু যখনই পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়বে, তখনই একটি শিশু দ্রুত সেই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারে। মহামারির প্রকোপ কমতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে শীর্ণকায় শিশুদের সংখ্যাটিও ক্ষণস্থায়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে স্থূলতার ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ক্ষণস্থায়ী নয়। ছোটবেলার সঠিক খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা ও কায়িক শ্রম না করার প্রবণতা কৈশোরে ও বয়ঃসন্ধিকালেও থেকে যায়। দুই বছরে করোনা মহামারির কারণে ঘরবন্দী শিশুরা এই ভালো অভ্যাস থেকে দূরে সরে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে করোনাকালে তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৮ শতাংশের শারীরিক কর্মকাণ্ড ছিল কম। আর এই বয়সী শিশুদের মধ্য ২০ শতাংশ বেশি মিষ্টি খাবার খেয়েছে।

স্থূলতাকে ব্যক্তির ব্যর্থতা না বলে একটি রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে স্থূলতাকে রোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ধনী দেশের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বেশি থাকে। আর দরিদ্র দেশে এটি মধ্যবিত্তের সমস্যা। যখনই সেসব পরিবারের গড় আয় বাড়তে থাকে, তখনই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণে শিশুরা স্থূলতার দিকে ঝুঁকতে থাকে। যেসব শিশু ছোটবেলায় অনাহারে বা খাদ্যসংকটে ভোগে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব শিশুর দ্রুত ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পরিপাকতন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে এমন হয়। অনেক দরিদ্র দেশই এখন অপুষ্টি ও স্থূলতা ‘দুই ধরনের মহামারিতে’ ভুগছে।

বাংলাদেশে শহরের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতা ৯ গুণের বেশি

করোনার সংক্রমণ শুরুর আগে বাংলাদেশের শিশুদের ওপর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত একটি গবেষণা চালিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন, সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের গবেষকেরা। ১৭ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশনে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।

শিশুদের স্থূল হওয়ার যতগুলো কারণ আছে, তার মধ্যে আছে বেশি ক্যালরির খাবার খাওয়ানো, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পানীয় এবং জাংক ফুড।
সোহেল রেজা চৌধুরী, অধ্যাপক, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের

সেই গবেষণায় বলা হয়, শহরে থাকা কিশোর-কিশোরীদের ২৮ দশমিক ২ শতাংশ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মোটা বা স্থূলতার সমস্যায় ভুগছে। অবশ্য এমন সমস্যা শুধু কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নয়, অন্যদের মধ্যেও রয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২১ সালের বিশ্ব পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৩ শতাংশ স্থূলতার সমস্যায় ভুগছে; অর্থাৎ শহরের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতা দেশের সামগ্রিক গড়ের চেয়ে ৯ গুণ বেশি।

করণীয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শৈশবের স্থূলতার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ককালেও স্থূল, অকালমৃত্যু ও শারীরিক নানা ধরনের অক্ষমতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ছাড়াও স্থূলকায় অনেক শিশুর শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ভাঙা, উচ্চ রক্তচাপ, করনারি রক্তনালির সমস্যা,ডায়াবেটিস ও মানসিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের স্থূল হওয়ার যতগুলো কারণ আছে, তার মধ্যে আছে বেশি ক্যালরির খাবার খাওয়ানো, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পানীয় এবং জাংক ফুড। আরও একটি বড় কারণ, শিশুদের শরীরচর্চার অভাব। কায়িক পরিশ্রমের ঘাটতি। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলার মাঠ থাকা ও খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর বাসায়ও শিশুদের নানাভাবে সক্রিয় রাখতে হবে। খাওয়াতে হবে পুষ্টিকর ও আঁশযুক্ত খাবার।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, নীতিনির্ধারকেরা মিষ্টিজাতীয় পানীয় ও খাবারের ওপর আরও বেশি কর আরোপ করতে পারেন, স্কুলভিত্তিক ব্যায়াম ও পুষ্টিবিষয়ক কর্মসূচি নিতে পারেন। পাশাপাশি স্থূলতাকে ব্যক্তির ব্যর্থতা না বলে একটি রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে স্থূলতাকে রোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন