পারকিনসন্স রোগের নামটি যেমন উচ্চারণে জটিল, তেমনি এর ধরনধারণ ও লক্ষণেও পরিলক্ষিত হয় জটিলতা৷ সাধারণত বার্ধক্যজনিত রোগ ধরা হলেও পারকিনসন্স নামের এই মস্তিষ্কের কার্যকারিতা–সম্পর্কিত রোগটি বিভিন্ন বয়সের মানুষেরও হতে পারে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ষাটোর্ধ্ব মানুষেরই এ রোগ হয়, পুরুষের ক্ষেত্রে পারকিনসন্সে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি। পৃথিবীর অন্তত ১০ মিলিয়ন মানুষ এই পারকিনসন্স রোগে ভুগছে। আমাদের দেশেও বহু বয়োবৃদ্ধ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত কিন্তু সচেতনতার অভাবে ও পারকিনসন্স রোগ সম্পর্কে না জানার কারণে বহু রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

আলোচনার শুরুতে ডা. মো. তৌহিদুল ইসলামকে পারকিনসন্স রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে অনুরোধ করাতে তিনি জানান, পারকিনসন্স আসলে একটি মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগ। সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের এই রোগ হয়ে থাকে এবং এর লক্ষণ খুব ধীরে ধীরে কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে প্রকাশিত হয়। মস্তিষ্কের এই ক্ষয়ের কারণে ডোপামিন ধরনের নিউরোট্রান্সমিটারের অভাব হলেই এই রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়। এ রোগের লক্ষণ শুরু হয় ট্রেমর বা কম্পন দিয়ে। দেহের একদিকে, যেমন হাত–পা কাঁপে এমনটা হয়ে থাকে। মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়, যাকে রিজিডিটি বলা হয়। এরপরই দেখা দেয় ব্রেডিকাইনেশিয়া বা হাঁটার গতি অত্যন্ত কমে যাওয়া। কথা জড়িয়ে যাওয়া বা ভারসাম্যহীনতাও হতে পারে। ভাবলেশহীন মুখভঙ্গি, নাম সই করতে বা লিখতে সমস্যা, রুচিহীনতা, অনিদ্রা, বিষণ্নতা এই ব্যাপারগুলো অবশ্য প্রকৃত লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার আগেই দেখা দেয়।

এরপর অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পারকিনসন্স আসলে একটি নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজ বা মস্তিষ্কের ক্ষয় রোগ।

মস্তিষ্কের কোষগুলো নষ্ট হতে থাকলেই সাধারণত ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগ দেখা দেয়। রোগের কারণ সম্পর্কে বলতে তিনি জানান, খুব নির্দিষ্ট করে এখনো কেউ বলতে পারে না এই রোগ কেন হয়। তবে বংশগত ধারাবাহিকতা, দীর্ঘকাল ধরে রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ (সার, কীটনাশক), মস্তিষ্কে জড় পদার্থের কণা জমা হওয়া ইত্যাদি কারণে পারকিনসন্স হতে পারে। সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোতে পারকিনসন্স রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হলেও গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশেও এখন পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এ ব্যাপারে এখনই জাতীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।

এরপর ডা. মোহাম্মদ সেলিম শাহী এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, পারকিনসন্স সাধারণত বয়স্কদের হলেও বংশগত ইতিহাস থাকলে ৪০–এর নিচে যাঁদের বয়স, তাঁদেরও পারকিনসন্স হতে পারে৷ এর মূল লক্ষণগুলোকে সংক্ষেপে TRAP বলা হয়। ‘টি’ দিয়ে ট্রেমর বা কম্পন বোঝানো হয়। এতে রোগীর দেহের এক পাশ থেকে শুরু হয়ে পরে সারা শরীরে কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ‘আর’ দিয়ে হয় রিজিডিটি বা মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া। ‘এ’ দিয়ে বোঝানো হয় অ্যাকাইনেশিয়া, অর্থাৎ হাঁটাচলা ও সব কাজে অত্যন্ত ধীরগতি পরিলক্ষিত হবে। সর্বশেষ ‘পি’ অক্ষরের অর্থ পশ্চার ইনস্ট্যাবিলিটি, যেখানে রোগী সব অবস্থাতেই একধরনের ভারসাম্যহীনতায় ভুগে থাকেন। এ ছাড়া আরও কিছু লক্ষণ রয়েছে, যেমন ছোট ছোট পদক্ষেপে কুঁজো হয়ে হাঁটা, ঘুমের মধ্যে মাংসপেশিতে টান ধরা ও চিৎকার করা, প্রস্রাব–পায়খানায় নিয়ন্ত্রণ না থাকা ইত্যাদি৷

যদি কোনো বয়স্ক মানুষের এই লক্ষণগুলো থাকে, তবে প্রাথমিকভাবে ধরে নিতে হবে যে তিনি পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত। অবশ্য আরও বিভিন্ন জটিল রোগে এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন আঘাত–পরবর্তী মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ, স্ট্রোক বা টিউমার, থাইরয়েড রোগ ইত্যাদি। এ জন্য কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা জরুরি। উন্নত বিশ্বে এ জন্য নির্দিষ্ট বিশেষায়িত সিটি স্ক্যান পদ্ধতি ড্যাট (DAT) স্ক্যান করা হয়, তাহলে আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে এমআরআই ও সিটি স্ক্যানই করা হয় এ রোগ নির্ণয় করতে। রক্তের হরমোন ও ভিটামিন অ্যানালাইসিস করেও এ ক্ষেত্রে অনেক তথ্য জানা যায়।

আলোচনার এ পর্যায়ে ডা. আবু নাঈম এই রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, ডোপামিনের ঘাটতির কারণে এই রোগ হয় বলে বাইরে থেকে ডোপামিন সরবরাহ করতে হবে৷ এ ক্ষেত্রে সরাসরি ডোপামিন সেবন করতে দেওয়া হতে পারে অথবা ডোপামিন রিসেপ্টরগুলোকে উদ্দীপ্ত করে এমন ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। তবে যেহেতু পারকিনসন্স একটি মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগ, একপর্যায়ে এই ক্ষয় বাড়তে থাকে এবং সে অনুযায়ী ওষুধের ডোজ অ্যাডজাস্ট করতে হয়। আবার দীর্ঘদিন ধরে ডোপামিন সেবনের ফলে কিছু স্নায়বিক সমস্যা তৈরি হয়, যার জন্য আলাদা ওষুধ দেওয়া হয়৷ ডোপামিন যেহেতু একটি প্রোটিন, তাই রক্তে এর কার্যকর শোষণ নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন ওষুধ দরকার হয়৷ তবে একসময় এই ডোপামিন প্রয়োগেও কোনো লাভ দেখা যায় না আর তখন প্রয়োজন হতে পারে সার্জারি। ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন সার্জারির মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় স্টিমুলেটিং নিডল লাগানো হয়, যা বিকল্প উপায়ে ডোপামিনের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করা হয়।

তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই রোগ কখনো সম্পূর্ণ ভালো হয় না। ওষুধ প্রয়োগে লম্বা সময় ধরে লক্ষণগুলো হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে একসময় রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

আলোচনার এ পর্যায়ে ডা. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ওষুধে যখন নিয়ন্ত্রণ হয় না, তখন পারকিনসন্স রোগীদের ক্ষেত্রে সার্জারি প্রয়োজন হয়, যদিও তা খুবই ব্যয়বহুল। সাধারণত আধুনিক ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন সার্জারির মাধ্যমে রোগীর মস্তিষ্কে পেসমেকারের মতো ইলেকট্রোড স্থাপন করা হয়।

ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী এবার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে পারকিনসন্স রোগীদের চিকিৎসাসেবার ব্যাপারে আলোকপাত করেন।

তিনি জানান, ওষুধকেন্দ্রিক সব চিকিৎসাই দেওয়া হয়ে থাকে এ দেশে। সাপ্তাহিক মুভমেন্ট ডিজঅর্ডার ক্লিনিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এই হাসপাতালে সেবা দিয়ে থাকেন। প্রতি সপ্তাহেই ৪০-৫০ জন পারকিনসন্স রোগী আসেন এখানে। এগুলোকে ডোপামিন সাপ্লিমেন্টসহ সব ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় ও বিভিন্ন ব্যায়াম ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভালো রাখার চেষ্টা করা হয়৷ তবে জটিল রোগীদের জন্য ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন সার্জারির ব্যবস্থা করা যায়, সে ব্যাপারে প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু ২০-২৫ লক্ষ টাকা খরচ হওয়া এই ব্যয়বহুল সার্জারি এ দেশের জন্য খুবই কঠিন। তবে এ ধরনের দুটি অপারেশন এই হাসপাতালে আগেও রাষ্ট্রীয় খরচে বিনা মূল্যে করা হয়েছিল৷ এবারও পারকিনসন্স দিবস উপলক্ষে চারটি এরূপ ফ্রি সার্জারি করার পরিকল্পনা আছে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া একেবারে স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেন প্রাথমিক পর্যায়ের ডোপামিন থেরাপি দেওয়া যায়, সে প্রচেষ্টা চলছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পারকিনসন্স চিকিৎসাসেবার প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ প্রোগ্রামের আওতায় দেশব্যাপী চিকিৎসকদের ট্রেনিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। পারকিনসন্স রোগের ওষুধগুলো সারা দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। রোগীর সেবাদানকারী ব্যক্তিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং উপজেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপির সুবিধা রাখা হচ্ছে। এভাবেই একটি সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে দেশের পারকিনসন্স রোগীদেরকে।

ডা. আবু নাঈম এবার পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে যেহেতু পারকিনসন্স রোগীরা প্রায়ই মাংসপেশি রিজিড হয়ে যাওয়ার লক্ষণে ভোগেন, তাঁদের সচল রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অ্যান্টি–অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল খেতে দিতে হবে।

বিষণ্নতা দূর করতে ফিজিওথেরাপিস্ট, কেয়ারগিভার ও সমাজকর্মীদের পারকিনসন্স রোগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন। পারকিনসন্স প্রতিরোধের ব্যাপারে তিনি বলেন, বংশগত পারকিনসন্স আগে থেকেই লক্ষণ বুঝে চিকিৎসার আওয়ায় আনলে জটিলতা কমানো যায়। এ ছাড়া সেকেন্ডারি পারকিনসন্স, অর্থাৎ আঘাত, ট্রমা, টিউমার, ইনফেকশন, স্ট্রোক ইত্যাদি কারণে পরে পারকিনসন্স হওয়া থেকে প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমেই রোগীকে রক্ষা করা যায়।

এরপর ডা. মো. আরিফুল ইসলাম জানান, এ দেশে সেভাবে কোনো পরিসংখ্যান করা হয়নি পারকিনসন্স রোগীদের সংখ্যা সম্পর্কে কিন্তু বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ পারকিনসন্সে আক্রান্ত। এ রোগে সরাসরি মৃত্যু না হলেও পারকিনসন্সে আক্রান্ত ব্যক্তি পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেতে পারেন। গলায় খাবার আটকে চোকিং হতে পারে৷ এসব দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

ডা. মোহাম্মদ সেলিম শাহী এ পর্যায়ে পারকিনসন্স দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরেন। এই রোগ অত্যন্ত প্রাচীন এবং ভারতীয় উপমহাদেশের আয়ুর্বেদ গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে।

১৮১৭ সালে জেমস পারকিনসন্স নামের ইংরেজ শল্যচিকিৎসক রচিত ‘শেকিং প্যালসি’ নামে পারকিনসন্স রোগ নিয়ে প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাঁর জন্মদিনে এই ১১ এপ্রিলে পারকিনসন্স দিবস পালিত হয় বিশ্বব্যাপী। তাঁরই নামানুসারে এই রোগের নামকরণ হয়েছে। এই দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা। অনেকে এ রোগের ব্যাপারে তেমন সচেতন নই এবং এ রোগীদের প্রতি অবহেলা না করে তাঁদের সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অবশ্যকর্তব্য, এই বলে ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী আলোচনা অনুষ্ঠানের উপসংহার টানেন।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন