এ জন্যই দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ফ্রেশ টিস্যুর উদ্যোগে কয়েক বছর ধরেই আয়োজিত হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যানসারবিষয়ক বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম। এ বছরেও চলমান ‘ফ্রেশ বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইন ইতিমধ্যেই যাত্রা করেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্রি স্ক্রিনিং সুবিধা নিয়ে। প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ে যাঁদের অস্বাভাবিক রিপোর্ট এসেছে এবং সাধারণভাবেই নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে যাঁদের টেস্ট রিপোর্টে ব্রেস্ট ক্যানসারের আলামত দেখা গেছে, তাঁদের অবশ্যই দ্রুততম সময়ের মধ্যে দ্রুততম নিশ্চিতকরণ নিরীক্ষার পর সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।

স্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে, স্তন ক্যানসারের সব প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থা এখন আমাদের দেশেই রয়েছে। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. সার্জারি, ২. রেডিওথেরাপি, ৩. কেমোথেরাপি, ৪. হরমোন থেরাপি, ৫. টার্গেটেড থেরাপি, ৬. ইমিউনোথেরাপি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, সব ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা একজন রোগীর দরকার হয় না। এটি নির্ভর করবে রোগের বিস্তৃতি, টিউমারের প্রকৃতি বা ধরনের ওপর, যাকে বিশেষজ্ঞরা টিউমার বায়োলজি বলেন।

সার্জারি

অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের মাধ্যমে সার্জারি করা উচিত। বর্তমানে শুধু স্তন ক্যানসারের সার্জারি করেন, এমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও আছেন অনেকে। সার্জন কী ধরনের অপারেশন করবেন, সে সিদ্ধান্ত রোগীর সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়। সম্পূর্ণ স্তন না কেটে ক্যানসারে আক্রান্ত অংশ ফেলে দিয়েও সার্জারি করা যায়।

কেমোথেরাপি

সাধারণত স্যালাইনের মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। কেমোথেরাপির অবশ্যই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকটাই নিরাময়যোগ্য। কেমোথেরাপি অবশ্যই একজন অনকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে করা উচিত। যত্রতত্র কেমোথেরাপি নেওয়া উচিত নয়। কেমোথেরাপি নিলে অনেক ক্ষেত্রে রক্তের লাল কণিকা কমে যায়, যা চিকিৎসা না করালে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। রোগীর প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন খরচের ও ধরনের কেমোথেরাপি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে এখন অনেক ওষুধ কোম্পানিই স্বল্প মূল্যে কেমোথেরাপির ওষুধ নিয়ে কাজ করছে।

রেডিওথেরাপি

মেশিনের মাধ্যমে রেডিয়েশন প্রয়োগ করে এই চিকিৎসা করা হয়। অপারেশনের স্থানে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। এটি ব্যথামুক্ত চিকিৎসাব্যবস্থা। স্তন ক্যানসারের সব রোগীর এ চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। তবে স্তন না কেটে শুধু টিউমার অপসারণ করা হলে রেডিওথেরাপি বাধ্যতামূলক। স্তন ক্যানসার হাড়ে বা ব্রেইনে চলে গেলেও রেডিওথেরাপি দিতে হয়।

হরমোন থেরাপি

এটি মুখে খাবার ওষুধ। সাধারণত ৫-১০ বছর পর্যন্ত এ ওষুধ ব্যবহার করা হয়। বায়োপসির মাধ্যমে হরমোন থেরাপি কার্যকর কি না, জানা যায়। অর্থাৎ সবাইকে হরমোন দেওয়া হয় না।

টার্গেটেড ও ইমিউনোথেরাপি

এগুলো স্তন ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসা। তবে স্তন ক্যানসারের সব রোগীর এই চিকিৎসা দরকার হয় না। এ চিকিৎসাব্যবস্থা আমাদের দেশেই রয়েছে। তবে অনেক ব্যয়বহুল।

আমরা ইতিমধ্যে যেসব ঝুঁকির কথা বলেছি, সেগুলো এড়িয়ে, সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারি। যদি স্তন ক্যানসার হয়েই যায়, তবে সে ক্ষেত্রে আমাদের সূচনায়, অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ ধরা পড়লে ৯৮ শতাংশ রোগীর সুস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অপচিকিৎসার মাধ্যমে বা বিলম্বে উপস্থিত হওয়ার ফলে ভালো ফল কিন্তু পাওয়া যায় না।

সারা বিশ্বে ব্রেস্ট ক্যানসারে মৃত্যু প্রতিবছর ছয় লাখের বেশি। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী ২৩ লাখ নারী ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।

ভয়ভীতি, লজ্জা ও সংকোচ পরিহার করে আমাদের তাই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তের ওপর জোর দিতে হবে। এ ব্যাপারে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনও রয়েছে। এ ছাড়া সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষ ও করপোরেট সংস্থাগুলো আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা ভালো হয়, এতে সন্দেহ নেই। তবে এ দেশেও ব্রেস্ট ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেকেই পুরোপুরি ভালো হচ্ছেন।

বাইরে চিকিৎসার আয়োজন করতে সময় লেগে যায়। তত দিনে সমস্যা বাড়ে। সাধারণত যাঁরা এ রোগে আক্রান্ত হন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ থাকে। কেমো বা রেডিওথেরাপি দেওয়ার সময় এসব রোগও বেড়ে যায়। তখন সহায়ক চিকিৎসাগুলো করা দেশেই সুবিধাজনক। আবার দীর্ঘদিন বাইরে চিকিৎসা নিয়ে সার্জারি করার পর সেটা না শুকাতেই অনেকে দেশে ফেরেন। এতে ইনফেকশন হয়।

সুস্থতা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন